এল নিনোর কারণে দেশে বৃষ্টির ঘাটতি! — ফাইল চিত্র।
সারা দেশের বেশির ভাগ জায়গাতেই জুলাইয়েও বৃষ্টি হতে পারে স্বাভাবিকের চেয়ে কম। একটু আধটু নয়, প্রায় ৯৪ শতাংশ। এমন পূর্বাভাসই দিয়েছে ভারতীয় মৌসম ভবন (আইএমডি)। আবহবিদদের মতে, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর কার্যকলাপে বাদ সাধতে পারে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ স্রোত এল নিনো। টুঁটি চেপে ধরতে পারে বর্ষার। সে কারণে জুনের পরে জুলাইয়েও দেশে বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
মৌসম ভবন জানিয়েছে, দেশে দীর্ঘ সময় ধরে জুলাই মাসে গড়ে (এলপিএ) যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়, তার চেয়ে ৯৪ শতাংশ কম বৃষ্টি হতে পারে এ বছর। ১৯৭১ থেকে ২০২০ সালে দেশে জুলাই মাসে গড়ে বৃষ্টি হয়েছে ২৮০.৪ মিলিমিটার। তার চেয়ে চলতি বছর জুলাই মাসে ৯৪ শতাংশ কম বৃষ্টি হতে পারে।
চলতি বছর জুন মাসেও স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হয়েছে দেশে। ৩৯ শতাংশ কম। ১৯০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত যতগুলি জুনে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হয়েছে, তার নিরিখে চলতি বছরের জুন পঞ্চম। এ বার মৌসম ভবন পূর্বাভাস দিল যে, জুলাই মাসেও দেশে বৃষ্টির ঘাটতি দেখা যাবে। মধ্য, পশ্চিম এবং উত্তর ভারতের বড় অংশে বৃষ্টি হতে পারে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই কম।
তবে কিছু অংশে আবার বৃষ্টির ঘাটতি হবে না। মৌসম ভবনের পূর্বাভাস, ভারতের উত্তর-পশ্চিম, পূর্ব-মধ্য এবং পূর্ব উপদ্বীপিয় অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হবে। বাকি দেশের তুলনায় উত্তর-পূর্ব ভারতেও বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে জুলাইয়ে।
এই আবহে জুলাইয়েও বৃষ্টি কম হলে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তবে আবহবিদেরা আশার আলো দেখছেন চলতি সপ্তাহের পূর্বাভাসে। বঙ্গোপসাগরে শুক্রবার নাগাদ নিম্নচাপ অঞ্চল তৈরি হতে পারে। তার প্রভাবে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে বেশ কিছু জায়গায়। মরসুমি অক্ষরেখাও কিছুটা দক্ষিণে সরে গিয়েছে। তার জেরে উত্তর এবং মধ্য ভারতে বৃষ্টির পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
অস্ট্রেলিয়ার ব্যুরো অফ মেটিওরোলজি (বিওএম) জানিয়েছে, বর্ষার দ্বিতীয় পর্যায়ে, অগস্ট-সেপ্টেম্বরে বর্ষার শক্তি বৃদ্ধি পেতে পারে। ভারত মহাসাগরীয় দ্বিমেরুকরণ বা ডাইপোল (আইওডি)-এর প্রভাবে সেই ইতিবাচক ঘটনা হতে পারে। তবে তা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। পূর্বাভাস অনুসারে, জুলাইয়ে বৃষ্টির অতটা ঘাটতি হলে কৃষিকাজ, জল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তার প্রভাব খুব ভাল হবে না।
এল নিনো কী
কয়েক বছর অন্তর প্রশান্ত মহাসাগরে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখী যে বাতাস সাধারণত উষ্ণ জলকে ইন্দোনেশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে দেয়, সেই বাতাস হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে উষ্ণ জল আবার পূর্ব দিকে ফিরে আসে এবং দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল ঘেঁষে বইতে থাকে। এই স্রোতের প্রভাবে মধ্যপ্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ অংশ উষ্ণ হয়ে ওঠে। বইতে শুরু করে উষ্ণ স্রোত। একেই বলে এল নিনো। স্প্যানিশ শব্দ ‘এল নিনো’-র অর্থ ‘ছোট্ট ছেলে’। শত শত বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকার মৎস্যজীবীরা প্রশান্ত মহাসাগরে এই অস্বাভাবিক স্রোত লক্ষ্য করেছিলেন। স্রোতের নামকরণও করেছিলেন তাঁরা।
প্রতি বছর এল নিনোর কারণে যে খরা হবে, তা নয়। তবে কোনও দেশের বৃষ্টিপাতে প্রভাব ফেলতে পারে এল নিনো। সে ভারতীয় উপমহাদেশে মেঘ তৈরির ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সে কারণে ঘাটতি হতে পারে বৃষ্টির। অতীতের পরিসংখ্যান থেকে দেখা গিয়েছে, যে বছর এল নিনো তৈরি হয়েছে, সে বছর ভারতে বর্ষা দুর্বল হয়েছে। চলতি বছর বর্ষা খাতায় কলমে প্রায় নির্ধারিত সময়ে প্রবেশ করলেও বৃষ্টি হয়নি। তার জেরে ইতিমধ্যে কৃষিকাজে প্রভাব পড়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর এই সময়ে যে পরিমাণ খারিফ শস্য বোনা হয়েছিল, তার চেয়ে চলতি বছর ২৩ শতাংশ কম হয়েছে। সে কারণে চলতি বছর ডাল, তুলো, সয়াবিন, ধানের ফলন প্রভাবিত হতে পারে।