গাঁধী পরিবারকে কোণঠাসা রাখতে বিজেপির হাতে নতুন অস্ত্র নরসিংহ রাও

মৃত্যুর একযুগ পর, জাতীয় রাজনীতিতে কোণঠাসা কংগ্রেসের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে ফিরে এলেন পামুলাপার্তি বেঙ্কট নরসিংহ রাও!

Advertisement

অগ্নি রায়

নয়াদিল্লি শেষ আপডেট: ২৯ জুন ২০১৬ ১৯:৪১
Share:

মৃত্যুর একযুগ পর, জাতীয় রাজনীতিতে কোণঠাসা কংগ্রেসের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে ফিরে এলেন পামুলাপার্তি বেঙ্কট নরসিংহ রাও!

Advertisement

সম্প্রতি প্রাক্তন এই প্রধানমন্ত্রীর ৯৫তম জন্মদিনের (২৮ জুন) ঠিক মুখে প্রকাশিত বিনয় সীতাপতির লেখা ‘হাফ লায়ন’ গ্রন্থটি এক দিকে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ অবিশ্বাসের ইতিহাসকে সামনে নিয়ে এসেছে। অন্য দিকে নরেন্দ্র মোদী তথা বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বের হাতে অস্ত্রও তুলে দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

প্রকাশ্য নির্বাচনী জনসভা থেকে বিভিন্ন সাক্ষাত্কার— সর্বত্র কংগ্রেসের পরিবারতন্ত্রকে আক্রমণ করে কার্যত রাহুল গাঁধীর কর্তৃত্বকে খর্ব করতে চাইছেন নরেন্দ্রভাই মোদী। বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব এ কথাই প্রচারের মুখ করেছে যে গণতন্ত্রের নামে পরিবারতন্ত্রেরই পুজো করে গিয়েছে কংগ্রেস। বাইরের নেতাদের হয় সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, নতুবা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে।

Advertisement

নরসিংহ রাওয়ের ডায়েরি এবং ব্যক্তিগত কাগজপত্র থেকে গবেষণা করে যে বইটি লেখেছেন বিনয় সীতাপতি, তা মোদীর এই আক্রমণকেই কার্যত পুষ্ট করছে। আর এই বিতর্কের প্রেক্ষাপটেই গতকাল সকালে নরসিংহ রাওয়ের জন্মদিনের সকালে প্রধানমন্ত্রী টুইট করে প্রশংসা করেছেন প্রাক্তন এই প্রধানমন্ত্রীর। মোদী লিখেছেন, “নরসিংহ রাওয়ের জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই। এক সঙ্কটজনক সময়ে তিনি দেশের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্ব একইসঙ্গে উল্লেখযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ।” একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী (সে তিনি যে দলেরই হোন না কেন) শুভেচ্ছা জানাবেন, এটা স্বাভাবিক সৌজন্যের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু রাজনৈতিক সূত্রের বক্তব্য, এ ক্ষেত্রে বিষয়টি নিছকই সৌজন্য নয়, বরং সৌজন্যের আড়ালে রাজনীতি। নরসিংহ-সনিয়াকে ঘিরে চলতি বিতর্কে একটু তা দেওয়া! বেশ কিছু দিন ধরেই নেহরু–গাঁধী পরিবারের বাইরের কংগ্রেস নেতাদের বিচ্ছিন্ন করে দেখা এবং দেখানোর এক কৌশল নিয়ে চলছেন মোদী। এর আগে বল্লভভাই পটেল, মদনমোহন মালব্য, লালবাহাদুর শাস্ত্রী প্রশংসা কুড়িয়েছেন মোদীর। মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধীকেও আপন করে নিয়েছেন বিজেপি নেতৃত্ব। দলীয় সূত্রের বক্তব্য, কংগ্রেসের পরিবারতন্ত্রকে আক্রমণ করে কার্যত সনিয়া-রাহুলকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করাই এর উদ্দেশ্য। বিজেপি-র এই ‘কৌশল তালিকায়’ এবার ঢুকে পড়লেন রাও-ও।

আরও পড়ুন- সুপারিশ মঞ্জুর মন্ত্রিসভায়, মোটা বেতন বাড়ছে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের

কী রয়েছে নরসিংহ রাওকে নিয়ে নতুন করে উত্তাপ তৈরি করা এই বইয়ে? কী ভাবছেন এর লেখক তথা রাজনৈতিক গবেষক বিনয় সীতাপতি?

“নরসিংহ রাওয়ের পরিবারের সদস্যরা সম্পূর্ণ সাহায্য না করলে এই বই লেখা সম্ভব হত না। তাঁর ব্যক্তিগত চিঠি, কাগজপত্র, ডায়েরি, তত্কালীন গোয়েন্দা রিপোর্ট- সবই তাঁরা আমার সামনে খুলে দিয়েছেন কোনও রাখঢাক না করেই। কোনও সেন্সরশিপ করা হয়নি। ফলে তাঁর সম্পর্কে অজানা অনেক তথ্যই জানা গিয়েছে”, আনন্দবাজারকে বললেন বিনয়। বইতে দেখা যাচ্ছে, পরবর্তীকালে মনমোহন সরকারের মন্ত্রিসভার বহু সদস্যই নরসিংহ রাও প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ধরনা দিতেন ১০ নম্বর জনপথ রোডে। কান ভারী করতেন সনিয়ার। অন্য দিকে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দফতরের প্রতি তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছিল, সনিয়ার বাসভবনে কারা যাতায়াত করছেন, তাঁদের সাপ্তাহিক তালিকা তৈরি করে তাঁকে জানানোর!

বাবরি মসজিদ ভাঙার ১২ দিন পর গোয়েন্দা বাহিনীর একটি রিপোর্ট বলছে, ‘ডিসেম্বরের ৭ তারিখ থেকে ১৪ তারিখের মধ্যে শ্রীমতি সনিয়া গাঁধীর বাসভবনে গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের মধ্যে রয়েছেন অর্জুন সিংহ, দিগ্বিজয় সিংহ, এনডি তিওয়ারি, মাধবরাও সিন্ধিয়া, অজিত যোগী এবং অহমেদ পটেল। সনিয়ার সঙ্গে আলোচনায় এই নেতারা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকার সমালোচনা করেছেন।” প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ৯৩ সাল পর্যন্ত নরসিংহ রাও প্রত্যেক সপ্তাহে এক বার সনিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। সেই বৈঠক বন্ধ হয়ে গেল। বাবরি মসজিদ ভাঙার পর সনিয়া গাঁধী ঘটনার চরম নিন্দা করে বিবৃতি দেন। তাতে নরসিংহ রাওকে নাম করে দায়ী না করা হলেও, যে যা বোঝার তা বুঝে নেন। সেই তিক্ততা চরমে ওঠে ৯৫ সালে। সনিয়া গাঁধী বিশ্বাস করতে শুরু করেন, রাজীব হত্যার তদন্তে ঢিলে দিচ্ছেন নরসিংহ রাও। তিনি এ বিষয়ে নিজের ক্ষোভ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠিও লেখেন। নরসিংহ চেষ্টা করেও সনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে পারেননি। বরঞ্চ নটবর সিংহকে তিনি জানিয়েছেন, “আমি সনিয়া গাঁধীকে এক হাত নিতেই পারি। কিন্তু সেটা চাইছি না। ওঁর অনেক পরামর্শদাতা আমার নামে সনিয়ার কান ভারী করছে। আমার প্রতি সনিয়ার আচরণ আমার স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে।”

তাত্পর্যপূর্ণভাবে, এই বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর নিঃশব্দ কংগ্রেস শীর্ষ নেতারা। মজার ব্যাপার হল, যে নটবর সিংহ নরসিংহ রাওয়ের বিরোধিতা করে এনডি তিওয়ারি-র হাত ধরেছিলেন, সেই নটবরই বইটি সম্পর্কে সপ্রশংস। নরসিংহ রাওকে ‘পণ্ডিত’ হিসাবে বর্ণনা করে তিনি বলেছেন, ‘ইতিহাস তাঁর প্রতি সদয় হয়নি।’

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
Advertisement
Advertisement
আরও পড়ুন