গ্যাস-সঙ্কট মেটাতে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরান হরমুজ় প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার কারণে ভারতে রান্নার গ্যাসের (এলপিজি) দাম বেড়েছে। সেই সঙ্গে টান পড়েছে জোগানেও। এই পরিস্থিতিতে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বইয়ের ২০ শতাংশ হোটেল এবং রেস্তরাঁ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালিক-সংগঠন ‘আহার’। দেশের আরও কয়েকটি শহরেও এমনটা ঘটতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে ইতিমধ্যেই। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মঙ্গলবার পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিংহ পুরী এবং বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছেন।
এলপিজি সঙ্কটের মোকাবিলায় কেন্দ্র শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস)-র ঘরোয়া ব্যবহারে ছাড়পত্র দিতে পারে বলে সোমবার সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছিল। জানানো হয়েছিল বুকিং নিয়ম বদলের কথাও। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রভাব থেকে গৃহস্থালি ক্ষেত্রের গ্রাহকদের রক্ষা করতে মোদী সরকার যে কৌশলগত পরিকল্পনা রূপায়ণে সক্রিয় হয়েছে, তার অঙ্গ হিসাবেই এই পদক্ষেপ। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস সংস্থা ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন (আইওসি) মঙ্গলবার জানিয়েছে, এলপিজির ঘরোয়া (গৃহস্থালি ক্ষেত্র) ব্যবহারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। অগ্রাধিকার পাবে হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো সংস্থাগুলিও।
এ ছাড়া কোন কোন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রকে এলপিজি সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তা পর্যালোচনার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির একটি কমিটি গড়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন আইওসি কর্তৃপক্ষ। তেল বিপণন সংস্থাগুলির (ওএমসি) তিন জন এগ্জ়িকিউটিভ ডিরেক্টর (ইডি) নিয়ে ওই কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটি হোটেল, রেস্তরাঁ এবং অন্যান্য শিল্পের আবেদন পর্যালোচনা করবে এবং যোগ্যতা, প্রয়োজনীয়তা এবং পণ্যের প্রাপ্যতার ভিত্তিতে গ্যাস বিতরণ করবে। তেল এবং গ্যাস বিকল্প পথে আমদানির দিকে নজর দিচ্ছে দেশীয় সংস্থাগুলি। বাড়ানো হচ্ছে উৎপাদনও।
বিকল্প উৎসের সন্ধানে রাশিয়া, আমেরিকা ছাড়াও দক্ষিণ আমেরিকা ও পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সংস্থাগুলির সঙ্গে ইতিমধ্যেই কথা বলেছে তেল সংস্থাগুলি। দেশে চাহিদার প্রায় ৮৮ শতাংশ পেট্রোপণ্যই আমদানি করে ভারত। তার প্রায় ৫০ শতাংশ আসে ইরান ও ওমানের মধ্যেকার হরমুজ় প্রণালী দিয়ে, ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েতের মতো দেশ থেকে। আবার ভারতে তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি হয় এই প্রণালীর মাধ্যমে। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো দেশ থেকে তা কেনা হয়। রাশিয়ার তেল কেনার জন্য গত বছর ভারতীয় পণ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক চাপানোর পরে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিতে বেশি করে নজর দিয়েছিল ভারত। কিন্তু এখন যুদ্ধের জেরে ইরান হরমুজ় প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ জারি করায় সমস্যায় পড়েছে নয়াদিল্লি।
হরমুজ় প্রণালী দিয়েই এলপিজির চাহিদার ৬২ শতাংশ আমদানি করে ভারত। ভারত বছরে প্রায় ৩ কোটি ১৩ লক্ষ টন এলপিজি ব্যবহার করে। তার মধ্যে ৮৭ শতাংশ গৃহস্থালি খাতে এবং ১৩ শতাংশ বাণিজ্যিক খাতে (হোটেল, রেস্তরাঁ, শিল্প ইত্যাদি)। ভোটার এবং সাধারণ পরিবারের সুরক্ষার জন্য সরকার গৃহস্থালির রান্নার গ্যাসকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে বাজারদর-নির্ধারিত সিলিন্ডারের উপর নির্ভরশীল বাণিজ্যিক খাত তীব্র সরবরাহ সঙ্কটে পড়েছে। মঙ্গলবার ‘ইন্ডিয়া হোটেলস অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশন’ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সঙ্কট মোকাবিলায় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক শোধনাগারগুলিকে পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের উৎপাদন কমিয়ে এলপিজি উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। মজুতদারি এবং কালোবাজারি রোধ করতে গৃহস্থালি ক্ষেত্রের ব্যবহারকারীদের জন্য এলপিজি রিফিল বুকিং চক্র আগের ২১ দিন থেকে বাড়িয়ে ২৫ দিন করা হয়েছে। হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড (এইচপিসিএল) একটি বিবৃতি জারি করে বলেছে যে, ভূ-রাজনৈতিক বিঘ্ন উল্লেখযোগ্য হলেও উৎপাদন বাড়ানোর জন্য পদক্ষেপ করা হচ্ছে।