কেউ দ্বিধা কাটিয়েছেন। কেউ এখনও কাটাতে পারেননি শত অনুরোধেও। আবার কেউ কিছুটা অপ্রত্যাশিত ভাবেই এসে যোগ দিয়েছেন লোকসভার বিদ্রোহী তৃণমূলী সাংসদদের মঞ্চে। সব মিলিয়ে গত কয়েক দিনের ‘অপারেশন লোটাস’-এর পর সূত্র জানাচ্ছে, অন্তত কুড়ি জনের সই-সহ চিঠি স্পিকারের কাছে পাঠানোর জন্য চূড়ান্ত। বিদ্রোহী তৃণমূল শিবির বুধবার রাতে দাবি করেছে যে, চিঠি কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায় পৌঁছে গিয়েছে। অন্য দিকে, স্পিকারের সচিবালয় জানাচ্ছে, এখনও তা আসেনি। রাজনৈতিক শিবিরের মতে, সামান্য বিলম্ব হলেও আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়ে যাবে বিদ্রোহীদের তরফে।
বিদ্রোহী শিবির থেকে জানানো তথ্য অনুযায়ী, চিঠিতে গত কাল এবং আজ সই করেছেন সায়নী ঘোষ, ইউসুফ পাঠান, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়রা। এর আগে সই ছিল মালা রায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায়, জুন মালিয়া, মিতালি বাগ, দেব অধিকারীদের। কুড়ি জন আছেনই, বাড়তেও পারে। সূত্রের খবর, নতুন সংযোজন হতে চলেছেন প্রতিমা মণ্ডল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এ দিন এনডিএ-র বৈঠকের পরে রাতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে যান। এই বাড়িতেই সোমবার বিদ্রোহীরা প্রথম বৈঠক করেছিলেন। এ দিন শুভেন্দুর সঙ্গে সায়নী-মালা-মিতালি-ইউসুফের পাশাপাশি প্রতিমা মণ্ডলও ছিলেন বলে সূত্রের দাবি। সুতরাং তিনিও বেড়া টপকালেন বলে মনে করা হচ্ছে। আদি তৃণমূলে এখনও অবধি খাতায়-কলমে আছেন— অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌগত রায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মহুয়া মৈত্র, সাজদা আহমেদ, কীর্তি আজাদ।
প্রবীণ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিদ্রোহী তালিকাভুক্ত হবেন অচিরেই, এমন দাবি করছে বিদ্রোহী শিবির। সূত্রের বক্তব্য, শরীর একটু সুস্থ হলেই তিনি দিল্লি আসবেন এবং তালিকায় সই করবেন। অন্য দিকে সুদীপের দাবি, “আমি নেত্রীর সঙ্গেই আছি। দল ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবিনি। তবে আসন্ন লোকসভা অধিবেশনে উপস্থিত থাকব।” প্রসঙ্গত গত বছর বাদল অধিবেশনের সময় ভিডিয়ো বৈঠকের মাধ্যমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হঠাৎই অসুস্থ সুদীপের জায়গায় অভিষেকের নাম লোকসভার নেতা হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। তার পর গত এক বছর তাঁকে বিশেষ আসতে দেখা যায়নি। মমতাই সুদীপকে বলেন ‘সুস্থ না হয়ে’ দিল্লি যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সুদীপ আজ জানিয়েছেন, দিল্লি গিয়ে অধিবেশনে যোগ দেওয়ার মতো সুস্থতা তাঁর রয়েছে। তবে চলতি পালাবদলের পর লোকসভার নেতার পদটি তিনি ফিরে পেতে চান কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট দেননি তিনি।
অন্য প্রবীণ সাংসদ সৌগত রায় বারবার অতীতে অভিযোগ করেছেন তাঁকে লোকসভার বিতর্কে বলতে না দেওয়া নিয়ে। তাঁকে বিজেপি শিবির বারবার যোগাযোগ করা সত্ত্বেও তিনি এখনও বিদ্রোহী-সঙ্গে যাওয়ার কথা ভাবছেন না। সৌগতর কথায়, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে যে দলের প্রতীকে জিতেছি, তা ছেড়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিজেপি এখনও আমার কাছে অনুরোধ করে যাচ্ছে। বড় পদ দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিল।” কেন সেই প্রস্তাবে সাড়া দিলেন না? সৌগতর জবাব, “আজ পর্যন্ত সাড়া দিইনি। রাজনীতিতে যে দিনের কথা সে দিন পর্যন্তই বলা যায়। কী হবে তা দেখা যাবে।” বিজেপি সূত্রের খবর, একমাত্র মহুয়া মৈত্রকে যেন না নেওয়া হয় বা সেই প্রস্তাব না দেওয়া হয়, সে ব্যাপারে বিশেষ নির্দেশ রয়েছে একেবারে শীর্ষ পর্যায় থেকে।
অন্য দিকে তৃণমূল সূত্রে জানানো হয়েছে, প্রত্যেক বিদ্রোহী সাংসদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল, বোঝানোর চেষ্টাও করা হয়েছিল। বিদ্রোহীদের একাংশের বক্তব্য, বোঝানোর বিষয়টি আগে করলে ভাল হত। তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাগালও পেতেন না বলে অভিযোগ। শতাব্দী রায়ের কথায়, “দীর্ঘ সংগ্রামের পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দল তৈরি করেছেন। তার জন্য আজও তাঁকে সম্মান করে মানুষ। কিন্তু কী ঘটছে চারপাশে, তা তিনি বুঝতে পারেননি। তিনি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বোঝাতে পারেননি জীবনযাপনের ধরন বদলাতে হবে। তিনি জনচরিত্র ভাল করেই বোঝেন। কিন্তু তা-ও মানুষ অভিষেক সম্পর্কে কী ভাবছে, ধরতে পারেননি।” নতুন মুখ্যমন্ত্রীর কাজের প্রশংসাও করেন শতাব্দী।
বিদ্রোহীরা চিঠিতে লিখছেন যে, তাঁরা এনডিএ-কে সমর্থন করে ‘ব্লক’ তৈরি করতে চাইছেন। তবে চিঠিটি প্রকাশ্যে বা সংবাদমাধ্যমের সামনে আনা হয়নি। ফলে তাতে ঠিক কী চাওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোষ্ঠী তাই বারবার ‘চিঠি কোথায়’ বলে আওয়াজ তুলছে, বিষয়টির আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। চিঠি পেয়ে স্পিকার কী সিদ্ধান্ত নেন, তা দেখে তার পর আইনি পদক্ষেপের কথা ভাববে তারা। তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্য, বিদ্রোহীরা যে চেষ্টা করছেন তা বেআইনি, ধোপে টিকবে না। একটি সংসদীয় দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন কোনও ব্লক তৈরি হতে পারে না লোকসভায়।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে