গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
মৌখিক ভাবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পক্ষে সায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ মঙ্গলবার মুসলিম নারীদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত একটি মামলায় তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, শরিয়তি আইন বাতিল করা হলে আইনি শূন্যতার সৃষ্টি হবে। তার বদলে সংসদে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি পাশ হওয়া অবধি অপেক্ষা করাই মঙ্গল। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেছেন, ‘‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধিই সমাধান।’’
১৯৩৭ সালের শরিয়ত প্রয়োগ আইন অনুযায়ী, পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে মহিলারা পুরুষের তুলনায় কম অংশ পান। এই বৈষম্যের বিরোধিতা করেই একটি মামলা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। আবেদনদারী পৌলমী পাভিনি শুক্লর তরফে সওয়াল করছিলেন আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ। তখনই সুপ্রিম কোর্ট বলে, আইনটি বাতিল করার পরিবর্তে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সংসদের বিচক্ষণতার উপরে নির্ভর করা বেশি যুক্তিযুক্ত হবে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ছাড়াও বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি আর মহাদেবন।
বেঞ্চ এ দিন প্রশ্ন তোলে, যদি শরিয়ত আইন বাতিল করা হয়, তা হলে মুসলিমদের উত্তরাধিকার কোন আইনের অধীনে পরিচালিত হবে?এর উত্তরে প্রশান্ত জানিয়েছেন, সে ক্ষেত্রে ভারতীয় উত্তরাধিকার আইনের মতো ধর্মনিরপেক্ষ আইন প্রযোজ্য হতে পারে। তিনি মেরি রায় বনাম কেরল মামলার উল্লেখ করেন। লেখিকা অরুন্ধতী রায়ের মা মেরি সিরীয় খ্রিস্টান নারীদের সমান উত্তরাধিকার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে ওই মামলায় সফল হন এবং তার ফলে ত্রিবাঙ্কুর খ্রিস্টান উত্তরাধিকার আইন, ১৯১৬ বাতিল হয়। প্রধান বিচারপতি তখন বলেন, ‘‘ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন কি মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য? কোনও আইন বাতিল করলে একটি শূন্যতা তৈরি হয়। সংস্কারের জন্য অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে আমরা হয়তো এখন যা পাওয়া যাচ্ছে সেটুকুও কেড়ে নিতে পারি।’’
বিচারপতি বাগচী এর পর বলেন, ‘‘আপনি উত্তরাধিকার নিয়ে কথা বলছেন। কিন্তু সারা দেশে কি এক পুরুষ-এক নারী বিবাহের নীতি বাস্তবায়িত হয়েছে? আমরা কি ব্যক্তিগত আইনের অধীনে থাকা সব বহুবিবাহকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪-এর বিরোধী বলে ঘোষণা করতে পারি? এই সব ক্ষেত্রে আমাদের আইনসভা বা সংসদের বিচক্ষণতার উপরেই নির্ভর করতে হবে।’’ তিনি এ-ও মনে করিয়ে দেন, বম্বে হাই কোর্টের রায়ের কথা, যেখানে বলা হয়েছে ব্যক্তিগত আইন বা ‘পার্সোনাল ল’ সাংবিধানিকতার কষ্টিপাথরে বিবেচিত হবে না।
এর জবাবে প্রশান্ত বলেন, সংবিধানের রক্ষক হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট অন্য সমস্যা দেখিয়ে কোনও নির্দিষ্ট বিষয়ে রায় দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারে না। মামলাটিকে একটি সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানোর জন্য অনুরোধ জানান তিনি। প্রশান্ত বলেন, আদালত এর আগে তিন তালাকের মতো মামলায় ধর্মীয় ভাবে সংবেদনশীল বিষয়েও হস্তক্ষেপ করেছে। ২০১৭-য় সুপ্রিম কোর্টেরই সায়রা বানু মামলার রায়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, উত্তরাধিকার বা সম্পত্তি বণ্টন কোনও অপরিহার্য ধর্মীয় অনুশীলনের অংশ নয়। ফলে এর সঙ্গে ধর্মাচরণের স্বাধীনতার কোনও সম্পর্ক নেই।
প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন করেন, আইনজীবী কি আদালতকে শরিয়ত আইন বাতিল করে কার্যত নতুন আইন প্রণয়ন করতে বলছেন? এর উত্তরে প্রশান্ত বলেন, আদালত দু’টি পথ নিতে পারে। হয় মুসলিম নারীদের ভারতীয় উত্তরাধিকার আইনের আওতায় আনা অথবা শরিয়ত আইনের উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিধানগুলিকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪-এর পরিপন্থী ঘোষণা করা। শেষ পর্যন্ত আদালত মামলাটি আবারও তালিকাভুক্ত করতে সম্মত হয়েছে এবং আবেদনে আরও কিছু বিকল্প পথ যোগ করে সেটি সংশোধন করার জন্য প্রশান্তকে সময় দিয়েছে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে