আমি ছোটবেলা থেকে ধ্রুপদী নৃত্যে তালিম নিয়েছি। নানা ধরনের নৃত্যশৈলী, গতি, ব্যাকরণ, ছন্দের সঙ্গে আমার বেড়ে ওঠা। ভারতীয় নাট্যশাস্ত্রে চার ধরনের অভিনয়ের কথা বলা হয়। আঙ্গিক, বাচিক, সাত্ত্বিক ও আহার্য। আহার্য অভিনয়কে মূলত দৃশ্যমান বাহ্যিক দিক বলা যেতে পারে। সহজ ভাবে বুঝতে গেলে, পোশাক, গয়না, মেকআপ ইত্যাদির মাধ্যমে চরিত্রের রূপ ফুটিয়ে তোলা। আমার আজকের বিষয় গয়না বা আভরণ। আমরা যখন সাজগোজ করি, পোশাকের সঙ্গে সঙ্গে মন দিয়ে গয়নাও কিন্তু বেছে নিই। একটা সঠিক গয়না কোনও সংলাপ ছাড়াই একজন মানুষের বা চরিত্রের অনেক গল্প বলে দেয়। আভরণের কল্পনার পাখা মেলার এই প্রবণতা থেকেই তৈরি হয় হরেক রকম ফ্যাশন স্টেটমেন্ট।
সেকেলে গল্পে আর ঢুকছি না। দিদিমা, ঠাকুমাদের গয়নার বাক্স খুলে বসলে কলামের পর কলাম চলতে থাকবে। আমি আজ বলি এখনকার গয়না, এখনকার কাজের কথা। হরেক মেটিরিয়াল, হরেক ডিজাইন, হরেক প্যাটার্ন, মনোহারী কিউরেশন। নজর ফেরানো দায়। আর কোনও গয়নাই কি তার রূপকারকে বাদ দিয়ে সম্ভব? শিল্পেই তো শিল্পীর পরিচিতি, সম্মান, আদর, প্রাপ্তি। একটা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন মানুষের পথ চলার গল্প, লড়াইয়ের গল্প, জীবনের গল্প। ফ্যাশন কলাম লেখার ঝুলি নিয়ে বেরিয়ে আদতে আমি মানুষ খুঁজি, যাঁদের ছোঁয়া ছাড়া গল্প অসম্পূর্ণ।
হাওড়ার মেয়ে নন্দিনী গুপ্ত। আসলে বেনারসের মানুষ। জন্ম কলকাতাতেই। ছেলেবেলার মধুর মসৃণ তেমন কোনও স্মৃতি নেই। অত্যাচারিত শৈশব থেকে বাঁচতে, বাবাকে ছেড়ে মায়ের হাত ধরে বেরিয়ে আসা। সঙ্গে দাদা। অতি কষ্টে দিন গুজরান। মা-ই সন্তানদের বড় করেন, লেখাপড়া শেখান। নন্দিনী নানা ধরনের কাজ করে মাকে সাহায্য করার চেষ্টা করতেন। নন্দিনী নিজের গয়না নিজে বানিয়ে পরতেন। পোশাক ডিজ়াইন করার সাধ থাকলেও, সাধ্য ছিল না। তাই মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে তার গয়নার ব্যবসার শুরু। ফুটের ধারে মাকে সাহায্য করা দিয়ে যে চলা শুরু হয়েছিল নন্দিনীর, সেই সহজ পথেই আজও তাঁর গয়নার বিকিকিনি। ফুটের ধারে টেবিলে আর ছোট্ট চিলতে স্পেসে তাঁর গয়নার আখড়া। হ্যাঁ, আজ ফেসবুক পেজ, ইন্সটাগ্রাম, ইনফ্লুয়েন্সারদের একাহাতে সামলাচ্ছেন। ব্রান্ড নেম ‘ন্যাঞ্জি’স রেয়ার ফাইন্ডস’। বড়বাজার থেকে মাল কিনে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, আজ সারা ভারতের নানা শহর থেকে বেছে বেছে পছন্দের গয়না সংগ্রহ করেন তিনি। দিল্লি, জয়পুর, বেনারস, দক্ষিণ ভারত, ওড়িশা এবং আরও নানা প্রত্যন্ত এলাকার শিল্প আজ তাঁর এক ছাদের তলায়। নিজেও বানান কিছু কিছু, তবে আজ সময়াভাব। সিলভার রেপ্লিকা জুয়েলারি, আফগানি, টিবেটান, পিতল, স্টিল হরেক রকম ধাতুর নানা কিসিমের নকশা। দুল, আংটি, হার, মাথার কাঁটা , পায়ের মঞ্জীর— কী নেই! আর সবটাই খুব সাধ্যের মধ্যে। “ না, আমার ছেলেবেলা নিয়ে আমার কোনও আক্ষেপ নেই। সব পরিস্থিতি থেকে শিক্ষালাভ করেছি। আর আমি আজ যতটুকু সাফল্য লাভ করেছি, সবটাই আমার মায়ের জন্য। শুধু আমার পরিশ্রমে কিছুই হত না, যদি আমার মায়ের জীবনবোধ, আদর্শ আমার মধ্যে সঞ্জাত না হত।”
নন্দিনীর এই মাটি-ছোঁয়া দৃঢ় বিশ্বাস আর আকাশছোঁয়া এগিয়ে চলার অনন্য জেদ ঝলমলিয়ে ওঠে তাঁর প্রতিটি আভরণে।