বাংলার মিষ্টি নিয়ে ‘রাঙামাটি নামে এক ওয়েবসাইটের উদ্বোধনে ব্রাত্য বসু। —নিজস্ব চিত্র
বেঙ্গালুরুতে বসে বাঙালি ঝোল-ঝোল সর রাবড়ির জন্য প্রাণটা হাঁকপাঁক করছিল কিংশুক মিত্রের। কলকাতায় বোনের কাছে হোয়াট্স অ্যাপে একটু হা-হুতাশ করতেই চমক!
দিন তিনেকের মধ্যে বিকেলে পেল্লায় থার্মোকলের বাক্স আরটি নগরের ঠিকানায় এসে ‘ল্যান্ড’ করল। খুলতেই মোটা প্লাস্টিক কনটেনারের মধ্যে ‘সিল’ করে রাখা মহার্ঘ রাবড়ি। তরতাজা, ড্রাই আইসে মোড়া। অনলাইন বরাতের ভিত্তিতে বোন অনায়াসে দাদাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন, পরম আকাঙ্ক্ষার বস্তুটি।
কুয়ালা লামপুরে কর্মরত তরুণ ঘোষ বিয়ের পরে কলকাতা থেকে ফেরার সময়ে একটা কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন। ও-দেশে নিজের রিসেপশনে খাস উত্তর কলকাতার নরমপাক জলভরা নিয়ে যাবেনই। বিশেষ ধরনের প্লাস্টিক কনটেনারে গাদাগাদি না-করে শ’চারেক সন্দেশ প্যাক করা হল। উড়ানে বাড়তি ওজনের দাম দিয়ে নতুন বর কার্গোয় মিষ্টি নিয়ে চললেন। মালয় দেশে রিসেপশনে সন্দেশ দুর্দান্ত হিট।
এমনটা যে ঘটতে পারে, কয়েক বছর আগেও সেটা অবিশ্বাস্য ছিল। এই অনলাইন কেনা-বেচা ও মিষ্টির যুগোপযোগী প্যাকিংয়ের দৌলতে অনেক অসম্ভবই সম্ভব হচ্ছে। আমেরিকা থেকে মেয়ে ভবানীপুরের দোকানে যোগাযোগ করে বলছেন, বারাসতে বৃদ্ধ বাবার জন্মদিনে ‘বার্থ ডে মেসেজ’ লেখা সন্দেশের কেক পাঠিয়ে দিতে হবে। কলেজের রিইউনিয়নের জন্য প্রবাসী প্রাক্তনী ঢালাও মিষ্টি পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এ-সব অর্ডারও অনলাইন সারা হচ্ছে।
কিন্তু বই বা শাড়ির মতো মিষ্টি নিয়ে বিমানে যাতায়াত বা দেশে-বিদেশে সরবরাহ করাটা মুখের কথা নয়। রসালো চ্যাটচেটে খাবার বিমানে ‘কেবিন লাগেজ’ হিসেবে অনুমোদিত নয়। এক কালে কলকাতার পুরনো বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বেষ্টনীর চৌকাঠ পেরোনোর আগে রোজই গাদাগাদা মিষ্টি বাজেয়াপ্ত হতো। মিষ্টির রসে রীতিমতো চটচট করত ওই তল্লাট। এখনও বচ্ছরকার ছুটিতে বেঙ্গালুরু-মুম্বইয়ে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময়ে তার মনপসন্দ মিষ্টি সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়াটা প্রবীণ মা-বাবার জন্য মহা ঝকমারি। বিমানবন্দরে নিরাপত্তাকর্মীরা বেঁকে বসায় মিষ্টি উড়োজাহাজে তুলতে ব্যর্থ হয়ে অনেকেরই চোখ ফেটে জল এসেছে। অনলাইন কেনা-বেচার যুগে এই ছবিটা কিছুটা হলেও পাল্টাতে চলেছে।
মিষ্টিকে সফরের উপযুক্ত করার উপযোগিতা অবশ্য প্রায় আট দশক আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন বাংলার এক দূরদর্শী মিষ্টি-স্রষ্টা। কৃষ্ণচন্দ্র দাশ তথা কে সি দাশ তখনই পুত্র সারদাচরণকে ডেকে বলেন, রসগোল্লা দেশে-বিদেশে পাঠানোর প্রযুক্তি বার করতে। রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের ছাত্র সারদাচরণ মাথা খাটিয়ে রসগোল্লার টিন বার করেন, যার ভিতরে অন্তত ছ’মাস তাজা থাকবে বাঙালির প্রিয় রসের গোলক। পরে আরও কেউ কেউ রসগোল্লা টিনে ভরেছেন। এবং প্রবাসে কর্মস্থলে ফেরার সময়ে টিন-বন্দি রসগোল্লা বাঙালির ভ্রমণসঙ্গী হয়েছে।
সম্প্রতি কে সি দাশের রসগোল্লা অনলাইন অর্ডারের ভিত্তিতে আমেরিকায় পাঠাতে এগিয়ে এসেছে আমাজন সংস্থা। কিন্তু বাংলার অন্য মিষ্টির বরাতে শিকে ছেঁড়েনি। আমাজনের বিজনেস ডেভলপমেন্ট ম্যানেজার আশিক আলি বলছিলেন, ‘‘আসল সমস্যা হল, বাঙালি মিষ্টির বড্ড সুখী শরীর। মহীশূরপাক, বম্বে হালওয়া, বরফি, লাড্ডু অনেক দিন ভাল থাকে। কিন্তু একমাত্র রসগোল্লা ছাড়া, অন্য বাঙালি মিষ্টি দেশে-বিদেশে পাঠানো কঠিন। এক দিনের বদলে দু’দিন লাগলেই হয়তো মিষ্টি টকে গেল!’’ ঠিক এখানেই অসাধ্যসাধনের চেষ্টায় সামিল কয়েক জন। তাঁরা ওয়েবসাইটে অনলাইন অর্ডার নিচ্ছেন। কয়েকটি ক্যুরিয়র সংস্থার সঙ্গে গাঁটছড়াও বেঁধেছেন। বলরাম মল্লিকের দোকানের কর্ণধার সুদীপ মল্লিকের কথায়, ‘‘এখন মাটির হাঁড়িতে দই পর্যন্ত প্যাকিংয়ের কসরতে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে।’’ রিষড়ার ফেলু মোদক মুম্বই-আমদাবাদে বিয়েতে রাবড়ি পাঠিয়েছে। কর্ণধার অমিতাভ মোদকের পরিকল্পনা, ‘‘বোঁদে, ছানার মুড়কিতেও কী ভাবে টাটকা স্বাদ রাখা যায়, তার চেষ্টা করছি।’’ আন্তর্জাতিক ফুড ব্র্যান্ডের ‘নাইট্রোজেন ফ্লাশড প্যাকিং’ বা দুধের তরল মিষ্টি বরফের মতো জমিয়ে পাঠানোর প্রযুক্তি রপ্ত করারও চেষ্টা চলছে।
ভিন্রাজ্যে যাওয়ার আগে বাক্সবন্দি হচ্ছে মিষ্টি।
কেসি দাশের কর্তা ধীমান দাশের দাবি, অন্য মিষ্টির ‘শেল্ফ-লাইফ’ বাড়িয়ে প্যাকিংয়ের কিছু নতুন কৌশল নিয়ে বেঙ্গালুরুতে তাঁদের ল্যাবরেটরিতেও নিরীক্ষা চলছে। নকুড়-কর্তা পার্থ নন্দী বলছিলেন, মিষ্টি সরবরাহ করার নিজস্ব পরিকাঠামো তাঁরা ক্রমশ গড়ে তুলছেন। বিমানবন্দরে ইতিমধ্যেই ‘বিশ্ব বাংলা’-ব্র্যান্ডের ছায়ায় ‘ডিউটি ফ্রি’ মিষ্টির দোকান হয়েছে বাঞ্ছারামের। সে-সব মিষ্টি বিমানে নিয়ে যাওয়া যায়। কর্তা শুভজিৎ ঘোষ অনলাইন অর্ডারের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বাজার ধরতে চাইছেন।
দেশ-বিদেশের বাঙালিদের চেনা বেশ কয়েকটা অনলাইন পোর্টালের কর্তারাও মানছেন, শুধু পুজো-ভাইফোঁটা নয়! কলকাতা বা বাংলার মিষ্টির খোঁজখবর প্রবাসী বাঙালিরা বছরভরই করে থাকেন। নারকোল নাড়ু থেকে ক্ষীরকদম, জয়নগরের মোয়া থেকে মরসুমি নলেন গুড়— চাহিদার শীর্ষে। বাংলা লাইভ ডটকম বা ৩৬৫ অরেঞ্জেস সংস্থা-র মতো কেউ কেউ ভিন রাজ্যে মিষ্টি পাঠায়, বিশেষ অর্ডারের ভিত্তিতে।
দেশান্তর তো হল! কিন্তু বাংলার ভিতরে জেলায় মিষ্টি পাঠানোটা এখনও বেশ কঠিন। মিষ্টি-কারবারিদের বক্তব্য, ক্যুরিয়র সংস্থাগুলো ওই তল্লাটে যেতে সময় নেয়। তত দিন মিষ্টি খাঁটি থাকার গ্যারান্টি কে দেবে?