ছবি : সংগৃহীত।
রান্নায় স্বাদ না জমলে, তাকে চলতি কথায় অনেকে বলেন ‘আঝালা’। আঝালা তরকারি, আঝালা মাংসের ঝোল মানে তা অত্যন্ত হালকা স্বাদের। কম তেলমশলা দেওয়া। শিশুপাচ্য। ‘ঝাল নয়’ বোঝাতেই শব্দটি তৈরি, কিন্তু অধিকাংশ সময়ে মশলাহীন বোঝাতেও তা ব্যবহৃত হয়। কারণ, এ দেশের যে কোনও রান্নায় (পায়েস-মিষ্টি ছাড়া) মশলা হিসাবে ঝাল থাকা জরুরি। ঝাল কেউ কম খেতে পারেন, কেউ বেশি। কিন্তু ঝাল একেবারে না থাকলে ভারতীয় রান্নার স্বাদ এবং গন্ধ, দুই-ই জমে না। নিদেন পক্ষে ফোড়ন হিসাবেও গরম তেলে একটি শুকনো লঙ্কা দেওয়া চাই। তার গন্ধেই তরকারির স্বাদ পাল্টে যায়। তবে সেই শুকনো লঙ্কারও নানা রকমফের আছে। প্রত্যেকের স্বাদ এক নয়, গন্ধও এক নয়, রং এক নয়, এমনকি ঝালও এক রকমের নয়। সব রান্নায় সব ধরনের শুকনো লঙ্কা ব্যবহার করাও যায় না। আবার শুধু শুকনো লঙ্কা বদলে রান্নার স্বাদে ভোলবদল আনা যেতে পারে।
কী ভাবে বুঝবেন?
রান্নার শখ থাকলে আর মশলার চরিত্র জানা থাকলে স্বাদ-গন্ধ নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা যায়। ভারতে লঙ্কার অন্তত ২০০ রকমের প্রজাতি রয়েছে। সব লঙ্কা থেকে শুকনো লঙ্কা তৈরি হয় না। ভারতে যত রকমের শুকনো লঙ্কা হয়, তার মধ্যে ভারতীয় রান্নায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় মূলত সাতটি। সেই সাত শুকনো লঙ্কাকে চিনে নেওয়া যেতে পারে।
১. কাশ্মীরি লঙ্কা
এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর উজ্জ্বল লাল রং। যে কোনও রান্নায় এই লঙ্কা দিলে তার রং খুলে যায়। এমনিই দেখতে ভাল লাগে। আর খাবারের স্বাদ তো শুধু জিভে নয়, তাকে পঞ্চেন্দ্রিয়ে অনুভব করতে হয়। দেখনদারি তাই যে কোনও ভাল রান্নার অন্যতম শর্ত। কাশ্মীরি লঙ্কা নিঃসন্দেহে সেই শর্ত পূরণে সাহায্য করে। যাঁরা ঝাল খেতে বিশেষ পারেন না, তাঁদের জন্য এই লঙ্কা উপযুক্ত। কারণ, এই লঙ্কার ঝাল অত্যন্ত মৃদু। পাশাপাশি, এতে হালকা মিষ্টি ও ফলের মতো সুগন্ধ থাকে। তন্দুরি খাবার, রোগন জোশ বা যে কোনো তরকারিরতে টকটকে লাল রঙ আনতে হলে এর ব্যবহার হয়।
২. গুন্টুর লঙ্কা
পশ্চিমবঙ্গীয়রা রান্নায় যে লঙ্কা ব্যবহার করেন, তা আসে মূলত গুন্টুর থেকে। গুন্টুর হল অন্ধ্রপ্রদেশের একটি শহর। আর অন্ধ্রপ্রদেশর হল ভারতের ‘লঙ্কা ক্ষেত্র’। ভারতের যে মোট লঙ্কা উৎপাদন তার অর্ধেকেরও বেশি চাষ হয় অন্ধ্রপ্রদেশে। আর গুন্টুরের লঙ্কার খ্যাতি তার ঝালের তীব্রতার জন্য। এর গন্ধ এবং স্বাদ, দুই-ই খানিক কড়া। বাঙালি রান্না তো বটেই, বিভিন্ন দক্ষিণ ভারতীয় রান্না এবং আচার-চাটনিতেও এই লঙ্কা ব্যবহার হয়।
৩. বেড়গি লঙ্কা
কর্নাটকের লঙ্কা। এই লঙ্কা স্বাদে-গন্ধ এবং দর্শনেও কাশ্মীরি লঙ্কা এবং গুন্টুর লঙ্কার মাঝামাঝি। আকারে গুণ্টুর লঙ্কার মতো দীর্ঘ। তবে খোসা মসৃণ বা তৈলাক্ত চরিত্রের নয়। কাশ্মীরি লঙ্কার খোসা যেমন কুঁচকে থাকে, কর্নাটকের বেড়গি লঙ্কার খোসাও তেমনি কোঁচকানো। ঝাল বেশি নয়। খুব কমও নয়। তবে বেড়গি লঙ্কার বিশেষত্ব এর স্মোকি ফ্লোভার বা ধোঁয়াটে সুগন্ধে। রান্নায় দিলে তা স্বাদে বাড়তি মাত্রা যোগ করে।
৪. মাথানিয়া লঙ্কা
রাজস্থানের এই লঙ্কার রং গাঢ় লাল। তবে ঝাঁঝ খুব কড়া নয়। কাশ্মীরি এবং বেড়গি লঙ্কার থেকে বেশি, কিন্তু গুন্টুর লঙ্কার থেকে কম ঝাল এই লঙ্কার স্বাদে খানিক টক এবং মিষ্টি ভাবও রয়েছে। রাজস্থানের যোধপুরের মাথানিয়া অঞ্চলের এই লঙ্কা ব্যবহার করা হয় রাজস্থানের বিখ্যাত ‘লাল মাস’ বানাতে। এ ছাড়া কের সাংরি, বিভিন্ন আচার, এমনকি দৈনন্দিন কিছু রান্নাতেও এই লঙ্কা ব্যবহার করা হয়। সুন্দর লাল রঙের জন্য এই লঙ্কাকে বলা হয় রাজস্থানের ‘লাল বাদশাহ’।
৫. মুন্ডু বা গুন্ডু লঙ্কা
তামিলনাড়ুর রামনাদ এবং তুতিকোরিনে চাষ হয় এই লঙ্কার। দেখতে ছোট এবং গোল চেরির মতো। তাই একে গোল মিরচি বা বুলেট মিরচিও বলা হয়। এর আরও একটি নাম বোরিয়া মিরচি। সব মশলারই নিজস্ব এসেনসিয়াল অয়েল থাকে। গুন্ডু লঙ্কায় সেই তেলের মাত্রা খানিক বেশিই। রং মেরুন ঘেঁষা লাল। ঝাল মাঝারি থেকে একটু বেশির দিকে। তবে সেই ঝাল জিভ ছোঁয়ার পরে দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এই লঙ্কার গন্ধ সুন্দর। এটি মূলত দক্ষিণ ভারতীয় রান্নার ফোড়ন হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হয়। আবার গুজরাতি এবং কিছু উত্তরভারতীয় রান্না, যেমন ডাল, কারিতেও এটি ফোড়ন হিসাবে ব্যবহার করার চল আছে।
৬. তেজা লঙ্কা
নামেই বোঝা যায় তেজ। গাঢ় লাল রং, খোলা ঈষৎ কোঁচকানো এবং আকারে খানিক ছোট এবং সরু। তবে ঝাল অত্যন্ত তীব্র। জিভে ঠেকালেই কান গরম করে দেওয়ার মতো। এই লঙ্কাও ফলে অন্ধ্রপ্রদেশের গুন্টুরেই। তবে গুন্টুর লঙ্কার থেকেও বেশি ঝাঁঝ এর। চাহিদাও বিশ্বজোড়া। বিভিন্ন দেশের ‘হট সস’ তৈরির জন্য এই লঙ্কার বহুল ব্যবহার হয়। ভারতে বেশি ঝাল বিশিষ্ট শুকনো লঙ্কার মধ্যে এটি অন্যতম।
৭. কাঁথারি লঙ্কা
আকারে ছোট। খুব বেশি হলে ২-৩ সেন্টিমিটার। তবে ঝাঁঝে মারাত্মক। এর তীব্রতা তেজা লঙ্কার সমান সমান। ‘ধারালো’ বললে ঠিকঠাক বর্ণনা হয়। সঙ্গে খানিক সাইট্রাস জাতীয় ফলের মতো এবং খানিক মাটির গন্ধ মিশে রয়েছে।