ব্যস্ত কলকাতায় এক টুকরো ‘মন্নত’! সৌজন্যে শাহরুখ খানের পত্নী গৌরী খান। গ্রাফিক— আনন্দবাজার ডট কম।
পেল্লায় দরজাটা খুলতে মনে হল জায়গাটা রেস্তরাঁ নয়, আদ্যোপান্ত সাজানো গোছানো ফিল্মের সেট। প্রকাণ্ড হল, উঁচু ছাদ থেকে ঝুলন্ত স্ফটিকের ঝাড়লণ্ঠন। উঁচু পিলারের ভরে মেজ়ানাইন দালান। সেখান থেকে দু’পাশে হালকা বেড় নিয়ে নেমেছে দু’সারি সিঁড়ি। যেন ওই ঝাড়বাতির নীচে মখমলের গদি মোড়া সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে এখনই অমিতাভ বচ্চন লাল চোখে তাকাবেন শাহরুখ খানের দিকে। জানিয়ে দেবেন, পছন্দের বৌমা ঘরে না আনলে পিতা-পুত্রের সম্পর্ক শেষ! অবশ্যই তেমন কিছু হল না। ঘোর কাটতে কানে এল বোনচায়নার প্লেটে তামা রঙের চামচ-কাঁটার টুংটাং শব্দ। অ্যাকোউস্টিক গিটারের নেপথ্য সুর। ঝাড়বাতির মধু রঙের আলোয় ডুবে থাকা রেস্তরাঁয় ধীরে ধীরে দানা বাঁধতে শুরু করেছে ব্যস্ততা।
জায়গাটি রবীন্দ্রসদন থেকে ৭-৮ মিনিটের হাঁটাপথ। রেস্তরাঁর নাম ‘লা সোয়ারে’। এখানকার কাঁটা চামচের রং থেকে হাত মোছার ন্যাপকিন এমনকি, মেঝেতে পাতা রং জ্বলে যাওয়া কার্পেটটিও সাজিয়েছেন শাহরুখ খানের স্ত্রী অন্দরসজ্জাশিল্পী গৌরী খান। সম্ভবত এই প্রথম কলকাতার কোনও রেস্তরাঁ গৌরীর শিল্পভাবনায় সাজল। আর হয়তো সে জন্যই রেস্তরাঁর মূল ভাবনার বাইরে কিছুটা হলেও বলিউডি বিশালত্ব নজর কাড়ল। যদিও গৌরী খুব সন্তর্পণে প্রাচুর্যকে মুড়েছেন আভিজাত্যের সঙ্গে। যে কারণে এ রেস্তরাঁর কোনও কিছুই উচ্চকিত নয়। এখানে এলে মনে হবে, চামচ থেকে বসার টেবিল, চেয়ার, ওয়ালপেপার, টেবিল ল্যাম্প সব কিছুই খুব সহজে মিশে গিয়েছে পরস্পরের সঙ্গে। যেন অনেক দিন এ ভাবেই ছিল। শুধু নজরে পড়েনি।
গৌরী খুব সন্তর্পণে প্রাচুর্যকে মুড়েছেন আভিজাত্যের সঙ্গে। ছবি: সংগৃহীত।
রেস্তরাঁ মানে খাওয়াদাওয়া। তবে এ ধরনের রেস্তরাঁয় মানুষ শুধু পেট ভরাতে আসেন না। আসেন একটু অন্য ধরনের পরিবেশ উপভোগ করতে। সেই ভাব এবং ভাবনা পুরোমাত্রায় রয়েছে ‘লা সোয়ারে’-তে। এ রেস্তরাঁর মূল ভাবনা ইউরোপের এক দেশের সংস্কৃতি থেকে নেওয়া। তবে সে দেশ ইংল্যান্ড নয়। ফ্রান্স। দক্ষিণপূর্ব ফ্রান্সের যে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল কেতাদুরস্ত জীবনযাপনের জন্য বিখ্যাত, যে অঞ্চলের কান, মোনাকো, সেন্ট টোপাজ় শহর জনপ্রিয় বিলাসবহুল বেড়ানোর জায়গা হিসাবে, সেই ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরার সংস্কৃতিই এ রেস্তরাঁর দেওয়ালে দেওয়ালে। মাঠা-সাদা রঙের উপরে কয়লা-কালো রঙে আঁকা আবছা রিভিয়েরার ছবি দিয়ে তৈরি এ রেস্তরাঁর ওয়ালপেপার। আবার সেই একই জলছবির দেখা মেলে উঁচু সিলিংয়ের নীচে সাজানো ইউরোপীয় পাবের ধাঁচের ছোট ছোট টেবিলে রাখা ল্যাম্পশেডের গায়েও।
ঝাড়বাতিটি নিভিয়ে দেওয়া হলে ওই টেবিল ল্যাম্পের আলো নিঃসন্দেহে মায়াবী আবছায়া তৈরি করবে টেবিলের চারপাশে। ছবি: সংগৃহীত।
দরজা খুললেই প্রথমে যে চত্বরটি চোখে পড়বে, সেটি ‘ক্যাজ়ুয়াল সিটিং এরিয়া’ অর্থাৎ অল্প সময়ের জন্য বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে সময় কাটানোর জায়গা। উঁচু গোল টেবিল ঘিরে মেরুন মখমলের গদি মোড়া উঁচু বার চেয়ার। ছড়ানো রয়েছে তবে নির্দিষ্ট নিয়মে। একটি বসার জায়গা থেকে আর একটির নিরাপদ দূরত্ব। আর প্রতিটি টেবিলেই রাখা ওই ছোট টেবিল ল্যাম্প। উপরের বিলিতি কেতার ঝাড়বাতিটি নিভিয়ে দেওয়া হলে ওই টেবিল ল্যাম্পের আলো নিঃসন্দেহে মায়াবী আবছায়া তৈরি করবে টেবিলের চারপাশে। উল্টো দিকে বার। ঠিক তার উপরে ডিজে নাইটের বন্দোবস্ত। আর দু’পাশের মেজ়েনাইন ফ্লোরটি আরাম করে বসার জায়গা। সেখানে ছোট বড় মেরুন, বাদামি বা ছাইরঙা সোফা সেট, নরম আলো আর কাঠের মেঝেতে পাতা ব্যবহৃত কার্পেট আক্ষরিক অর্থেই আরাম জোগায়। তবে স্বাদের ব্যাপারটি শুধু ইউরোপে সীমাবদ্ধ রাখেননি রেস্তরাঁর মালিক প্রিয়াংশ শাহ। ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরার পরিবেশে দিব্যি উপভোগ করা যাবে জাপানি সুশি কিংবা মোগলাই কবাব।
নীচের বসার জায়গাটি পেরোলে সাজানো পানশালা। ছবি: সংগৃহীত।
প্রিয়াংশের এটিই প্রথম রেস্তরাঁ। অন্দরসজ্জা শিল্পী হিসাবে নিঃসন্দেহে দেশে খ্যাতনামী গৌরী। কিন্তু কলকাতার রেস্তরাঁ সাজানোর জন্য শাহরুখ-পত্নীর নাম হঠাৎ মনে পড়ল প্রিয়াংশের? প্রশ্ন শুনে প্রিয়াংশ বললেন, ‘‘প্রথম কাজ সবাই ভাল করতে চায়। আমিও চেয়েছি। বড় জায়গা নিয়ে রেস্তরাঁ। তাই ভাল ভাবে সাজাতে চেয়েছিলাম। অনেকের সঙ্গেই কথা চলছিল। এ দিকে, নাইট রাইডার্স টিমের সূত্রে শাহরুখের টিমের সঙ্গেও একটা যোগাযোগ ছিল আমার। সেখান থেকেই মনে হয়, ওঁকেও প্রস্তাব দিয়ে দেখি।’’
নিজের নকশা করা রেস্তরাঁরর উদ্বোধনে বলিউডের বন্ধুদের নিয়ে কলকাতায় এসেছিলেন গৌরী খান। ছবি: সংগৃহীত।
যদিও গৌরী ওই প্রস্তাবে যে এক বারেই রাজি হয়েছিলেন, এমন নয়। প্রিয়াংশ বলেন, ‘‘আমাকে তিনি ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তার পরে টানা ৪৫ মিনিট জেরা করেছেন। রেস্তরাঁ নিয়ে আমার ভাবনা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনেছেন সব। তার পরে রাজি হয়েছেন। সাজিয়েছেন মনের মতো করে।’’
ফলে শাহরুখভক্ত তো বটেই, সুসময় কাটাতে চাওয়া খাদ্যরসিকদের জন্যও এক টুকরো ‘মন্নত’ জায়গা করে নিয়েছে এই ব্যস্তসমস্ত শহরের মাঝখানে।