কলকাতায় ‘মুখা’র প্রদর্শনী। — নিজস্ব চিত্র।
মুখোশের দেশ দিনাজপুর। সেখানে স্থানীয় ভাষায় মুখোশকে বলা হয় ‘মুখা’। স্থানীয় শিল্পীদের কাছে মুখোশ তৈরির কাজ পুজো করার মতোই পবিত্র। স্নান সেরে শুদ্ধশুচি হয়ে কাচা কাপড় পরে তবেই তাঁরা বসেন মুখোশ তৈরির কাজ নিয়ে। যত দিন চলবে মুখোশ তৈরির কাজ, তত দিন চলবে সংযম। আমিষ ভোজন থেকে মদ্যপান, সবই নৈব নৈব চ।
শাস্ত্র বা পুরাণ থেকে লৌকিক ধর্মবিশ্বাসের কোলাজ, সবই ফুটে ওঠে মুখোশে। দিনাজপুরে পরব, অনুষ্ঠান, স্থানীয় জনজাতির সংস্কৃতির শিকড়ের ছাপ লেপ্টে থাকে মুখোশের নানা রঙে। লেগে রয়েছে বঙ্গ-সংস্কৃতির অন্যান্য রঙও।
দিনাজপুরের এই মুখোশশিল্পের সঙ্গে জড়িত মূলত স্থানীয় দেশি পলি ও রাজবংশীরা। মুখা তৈরিতে ছাতিম, আম, গামারি, পাকুড়, নিম প্রভৃতি কাঠ লাগে। তার পর যত্ন করে খোদাই করা হয় চোখ, নাক, মুখ। সব শেষে পালিশ, রং। কোনও রকম রাসায়নিকের ব্যবহার নেই। সিঁদুর, চুন, সাদা খড়িমাটি, রঙিন ফুল দিয়ে তৈরি প্রাকৃতিক রঙেই হয় যাবতীয় কারসাজি।
শিল্পী শর্মিলা সেনের উদ্যোগে আয়োজিত আর্ট বিয়ন্ড ট্র্যাডিশন নামক শিল্পপ্রদর্শনীর মূল বিষয় হল মুখোশ এবং তার নেপথ্যকাহিনি। — নিজস্ব চিত্র।
১৭ এপ্রিল যেন এক টুকরো দিনাজপুরের ঝলক মিলল কলকাতার বুকে। গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শাশালায় শিল্পী শর্মিলা সেনের উদ্যোগে আয়োজিত আর্ট বিয়ন্ড ট্র্যাডিশন নামক শিল্পপ্রদর্শনীর মূল বিষয় হল মুখোশ এবং তার নেপথ্যকাহিনি। ২০ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে প্রদর্শনী। কেবল দিনাজপুরের মুখোশ নয়, প্রদর্শনীতে মিলবে দক্ষিণ ভারতের ছোঁয়াও। কথাকলি নৃত্যের মুখোশের আদলেও রয়েছে একাধিক মুখোশ। রয়েছে আফ্রিকার মুখোশের নানা আদল। শর্মিলা বলেন, “আমার পুরো কাজটাই এক জন কারিগরের কাজ। আমি নকশা বানিয়ে দিই। কারিগর সেই নকশাকেই বাস্তবের রূপ দেন । মুখোশ তৈরিতে দক্ষ কারিগরের প্রয়োজন। তবে অধিকাংশ মুখোশ শিল্পই অবলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে। কারণ, শিল্পী বা কারিগররা এই শিল্পে আর লাভের মুখ দেখতে পারছেন না । এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে এ রকম আরও অনেক প্রদর্শনীর প্রয়োজন। যুবসমাজের সঙ্গে এর পরিচয় করানো ভীষণ জরুরি। তবেই তো তাঁদের আগ্রহ তৈরি হবে। উন্নতি হবে শিল্পের।”