নীরদচন্দ্র চৌধুরী, লীলা মজুমদার এবং মনোহর আইচ।
শতবর্ষের দোরগোড়ায় রয়েছেন, এক ডাকে চেনা বাঙালির সংখ্যাটা খুব কম ছিল না কয়েক বছর আগেও। নব্বই বা মাঝ নব্বইয়ের কোঠায় পৌঁছেও তাঁরা অনেকেই দিব্যি সচল, সজীব ছিলেন।
অমলা শঙ্কর কিন্তু সেজেগুজে, ১০০ বছরের জন্মদিনের কেকও কাটেন। অমলা শঙ্কর কিন্তু সেজেগুজে, ১০০ বছরের জন্মদিনের কেকও কাটেন। তাঁর ঘরোয়া ছিমছাম বার্থ ডে পার্টির অনুষ্ঠান, তেমন আতিশয্য ছাড়াই বিদগ্ধ বাঙালির বৃত্তে একটা উদযাপনের উপলক্ষ হয়ে ওঠে। সেটা ছিল ২৭ জুন, ২০১৯। ২০১২র মার্চে ‘পকেট হারকিউলিস’ মনোহর আইচের ১০০ তম জন্মদিনটিও শৃঙ্খলার শৌর্যে মুখর। হাতের পেশি ফুলিয়ে বাড়িময় হেঁটে বেড়ানো শতায়ু সে-দিন জনেজনে ‘হাসিখুশি থাক’ বলে টিপস দিয়েছেন। ছড়া মিলিয়ে ‘তিন জোয়ানের বল, পান্তা ভাতের জল’-এর জয়গান শোনাতেও কসুর করেননি। সে-বছরই সিপিএমের পলিটব্যুরো সদস্য সমর মুখোপাধ্যায়ের ১০০ বছরে প্রথা ভেঙে কেক কেটে জন্মদিন পালনে ছিলেন বিমান বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যেরা।
বাঙালির সাম্প্রতিক স্মৃতির ঝাঁপিতে আরও রয়েছে লীলা মজুমদারের ১০০য় পদার্পণের লগ্ন। তবে তাঁর স্মৃতির মুঠো মুঠো হিরে, গোছা গোছা মোহর তখন ভুলে যাওয়া বর্মিবাক্সের ভিতরে বন্দি। সজ্ঞানে শতক অতিক্রম করার নজির হিসেবে উজ্জ্বল নীরদচন্দ্র চৌধুরী। এ ছাড়া, সঙ্গীতাচার্য উস্তাদ আলাউদ্দিন খান, সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত শ্রীজীব ন্যায়তীর্থ বা রাজনীতিবিদ প্রভুদয়াল হিম্মতসিংকার নামও শতকজয়ী বাঙালির তালিকায় স্বমহিমায় থাকবে।
“এমনিতে শতবর্ষ শুনতে মহিমময় লাগলেও সব সময়ে তা খুব সহজে সহনীয় হয় না!” বলছিলেন, বার্ধক্য বিজ্ঞান বিশারদ ইন্দ্রাণী চক্রবর্তী। শেক্সপিয়রের কবিতার ‘সেভেন এজেস অব ম্যান’-এর অন্তিম পর্যায়ের মতো অনেকেই যেন ‘দ্বিতীয় শৈশবে’ ফিরে যান তখন। ইন্দ্রাণীর কথায়, “কোভিড অতিমারি নিয়ে আতঙ্কের ছায়ায় দীর্ঘায়ু নাগরিকেরা আমাদের প্রেরণা। ভাইরাসে মৃত্যুভয় বাড়লেও নব্বই পেরিয়েও অনেকে সুস্থ জীবন যাপন করছেন।” অন্নদাশঙ্কর রায়, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, জ্যোতি বসু বা বিজয়া রায় অল্পের জন্য শতক ছুঁতে পারেননি। মৃণাল সেন, রমাপদ চৌধুরী, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, মান্না দে-রাও মাঝ নব্বই বা তার কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। তবু এখনও শতায়ু বা শতকের দোরগোড়ায় থাকা বাঙালিরা অনেককেই বিস্মিত করেছেন। সদ্যপ্রয়াত অমলা শঙ্কর ৯২-৯৩ বছরেও মহাজাতি সদনে মঞ্চে উঠেছেন। মাঝ নব্বইতেও তাঁর আঙুলের নখে অসামান্য ছবি আঁকতেন। মৃত্যুর তিন-চার বছর আগেও স্মৃতি সজীব ছিল।
দু’বছর আগে ডোভার লেনের বাড়িতে বসে রজনীকান্ত সেনের দৌহিত্র দিলীপকুমার রায়কেও অনেকে অনর্গল তাঁর দাদুর গানের লাইন স্মৃতি থেকে বলতে শুনেছে। তখন তাঁর বয়স ১০২ বছর। এখন ১০৪ বছর বয়সেও কষ্ট করে লেখা পড়তে পারেন। পুরনো স্মৃতির বিচ্ছুরণে মাঝেমধ্যে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন তিনি। ইন্দ্রাণী বলছিলেন, “দীর্ঘ জীবনের অনেকটাই জিনেরও মহিমা। সেই সঙ্গে আজকের পরিভাষায় কোমর্বিডিটি বা আনুষঙ্গিক রোগ
কম থাকাও কারণ।” তিনি জোর দিচ্ছেন, “প্রযুক্তি, জীবনদায়ী ওষুধ, সুহৃদ, পড়শিদের সাহচর্যে এই সামাজিক দূরত্বের দিনকালেও অনেক ৯০ উত্তীর্ণ ভাল ভাবেই বাঁচছেন।”
৯৪ বছরেও বাড়ি থেকে বেরিয়ে অলিগলি ঘুরে বাজার করায় অভ্যস্ত শ্যামবাজারের সুশীল চট্টোপাধ্যায় ওরফে নকুবাবু। অতীত সংগ্রাহক নকুবাবুর বাড়িতে আদ্যিকালের রেডিয়ো ভালভ বা ক্যামেরা দেখতে রোজ অজস্র লোকের আনাগোনা লেগেই থাকত। বললেন, “মানুষের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ হওয়াটা কষ্ট দিচ্ছে। তবে মন শক্তপোক্ত। অজানা ভয়ে নিজের জীবনীশক্তি নষ্ট হতে দেওয়া কাজের কথা নয়।”