Poila Boishakh of Feluda

ব্যাচেলরের পয়লা বোশেখ! কী ভাবে দিনটি কাটাচ্ছে ফেলুদা, জটায়ু আর ব্যোমকেশ-সঙ্গী অজিত?

অকৃতদারদের ব্যাপারটা অবশ্যই আলাদা। তাঁরা যেহেতু পরিবার নামের পরিসরটির মার্জিনের বাইরে, তাই তাঁদের যাপনেও খানিক ব্যতিক্রম থাকবে, এ আর আশ্চয্যির কী!

Advertisement

অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ১০:০৪
Share:

তিন বিখ্যাত ব্যাচেলর চরিত্র কী ভাবে কাটাচ্ছেন বছর পয়লা? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম

রসসাহিত্যিক তথা শব্দ-খেলুড়ে হিমানীশ গোস্বামী বেঁচে থাকলে বলতেই পারতেন— ‘একলসেঁড়ের একলা বৈশাখ’। কিন্তু আপাতত যে সব ব্যক্তিত্বের কথা এই পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে মনে আসছে, তাঁরা কেউই রক্তমাংসের মানুষ নন। তাঁদের বিচরণ বইয়ের পাতায়। এবং একই সঙ্গে তাঁরা সকলেই কনফার্মড ব্যাচেলর। বাঙালির নববর্ষের প্রথম দিনটি একটু বেশি মাত্রাতেই ঘরোয়া। ইংরেজি নিউ ইয়ারের উদ্‌যাপনে যেমন একটা বারো-ইয়ারি ব্যাপার রয়েছে, বাংলা নববর্ষে যেন ঠিক তার উল্টোটা। সকাল থেকে রাত সপরিবার খাওন-দাওন, নতুন জামা পরে হালখাতা সেরে ফের বাড়ি আগমন এবং ফের সপরিবার বাইরে ভোজন কিংবা বাড়িতেই আয়োজন ও দিন ফুরুলে বছর পুরনো ধরে নিয়ে তথৈবচ জীবনযাপন। অকৃতদারদের ব্যাপারটা অবশ্য আলাদা। তাঁরা যেহেতু পরিবার নামের পরিসরটির মার্জিনের বাইরে, তাই তাঁদের যাপনেও খানিক ব্যতিক্রম থাকবে, এ আর আশ্চয্যির কী! তবে সাহিত্যের পাতায় আটকে থাকা যে সব অকৃতদারের কথা বাঙালি চোখ বুজে বলে দিতে পারে, তাঁদের মধ্যে প্রথমেই আসতে বাধ্য প্রদোষচন্দ্র মিত্র ওরফে ফেলুদা, লালমোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওরফে জটায়ু আর অবশ্যই সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সীর ছায়াসঙ্গী অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। এঁরা সকলেই একলা মানুষ হতে পারেন, তবে কেউই ‘একলসেঁড়ে’ নন। বন্ধুবৎসল হিসেবে তিনজনেই বিদিত। অন্তত বইয়ের পাতা সেই সাক্ষ্যই দেয়।

Advertisement

কিন্তু বাঙালির স্বভাবই এই যে, কাগুজে অস্তিত্বে নিজেদের প্রিয় চরিত্রগুলিকে আবদ্ধ না রেখে তারা তাদের উপরে রক্তমাংসের খড়-মাটি চড়িয়ে বাস্তবে দেখতে একান্তই ভালবাসে। আর সে কারণেই বোধহয় ফেলুদা-ব্যোমকেশ নিরন্তর বড়-ছোট-মুঠো— সব রকম পর্দাতেই আবির্ভূত হয়ে চলেছে। আর বঙ্গজন কাগুজে অবতার থেকে ছায়া অবতারে তাদের ঠেলে দিয়ে এক প্রকার নিশ্চিন্তেই আছেন। সুনিশ্চিত অকৃতদার (কনফার্মড ব্যাচেলর-এর অক্ষম বঙ্গানুবাদ)-দের পয়লা বোশেখ কেমন, তা জানতে খানিক ভ্রমণে বার হতে হয়েছিল। হাতের কাছেই উত্তর কলকেতা। গড়পারে লালমোহনবাবুর বাস। ইদানীং অভিনেতা অনির্বাণ চক্রবর্তী মশাই জটায়ুর স্থলাভিষিক্ত। প্রথম কড়া নাড়া গেল তাঁরই দুয়ারে।

জটায়ু তথা লালমোহনবাবুর সঙ্গে পয়লা বৈশাখে সঙ্গী হবে বাকি দুই মূর্তিও। ছবি: সংগৃহীত

নিজেকে রহস্য রোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক লালমোহন গঙ্গোপাধ্যায় (সত্যজিৎ-মতে, গাঙ্গুলি) ওরফে জটায়ু ভেবে নিয়ে কেমন হতে পারে পরিপূর্ণ বাঙালি এই কল্পসাহিত্যিকের নববর্ষ যাপন— প্রশ্ন রাখায় অনির্বাণ (থুড়ি, জটায়ু)-র স্মার্ট উত্তর— “উত্তরের পয়লা বৈশাখ তো দক্ষিণ কলকাতার চাইতে আলাদা। তার উপর জটায়ু বেশ খ্যাতনামা সাহিত্যিক। তাই তাঁর বছর পয়লাটা প্রকাশকের পাড়া দিয়েই শুরু হবে।’’ অনির্বাণের মতে, জটায়ু বইপাড়ায় যাবেন সকালে, একটু বেলা করে। প্রকাশকের আপিসে বসে শরবত, মিষ্টি খাবেন, ক্যালেন্ডার নেবেন। অন্য সাহিত্যিকদের সঙ্গে খানিক আড্ডাও দিতে পারেন। তবে তাঁর তাড়া আছে। সবুজ অ্যাম্বাসাডর হাঁকিয়ে ছুটবেন দক্ষিণে রজনী সেন রোডে। প্রদোষ সি মিটার তথা ফেলু মিত্তিরের বাড়ি। দুপুরে সেখানেই নেমন্তন্ন। সাদামাঠা ঘরোয়া খাবারেই ভরসা গোয়েন্দা প্রবরের। বাঙালি খানা। কিন্তু পয়লা বৈশাখে স্পেশ্যাল কিছু হতেই পারে। ডাল, ভাত, তরকারি চাটনির সঙ্গে কিছুর একটা বড়া শ্রীনাথ ভেজে দিতে পারে। শেষপাতে অবশ্যই থাকবে মিষ্টি, সেটা অনিবার্য ভাবেই লালমোহন নিজেই এনেছেন। তার পর দুপুরভর আড্ডা। কখনও বা বেড়ানো নিয়ে পরিকল্পনা, কখনও জটায়ুর সঙ্গে তাঁর লেখা নিয়ে ফেলুদার খুনসুটি। বিকেল গড়ালে চা-শিঙাড়া খেয়ে জটায়ুর গাড়িতেই ত্রিমূর্তি বেড়াতে বেরোবেন। কলকাতাতেই। সেটা পার্ক স্ট্রিটের পুরনো গোরস্থান, না কি ভূকৈলাসের রাজবাড়ির খণ্ডহর, তা নিয়ে ঝেড়ে কাশলেন না জটায়ু ওরফে অনির্বাণ। নতুন কেসের গন্ধ পাচ্ছেন কি? নাকি জটায়ুর পরের উপন্যাস ‘ভূতভুতুমের ভূকৈলাস’-এর প্লট নির্মাণ, সে ব্যাপারে অনির্বাণ, মানে ইয়ে… জটায়ু স্পিকটি নট।

Advertisement

ফেলু মিত্তির কিন্তু নববর্ষে চমক দিতেই চাইছে। ছবি: সংগৃহীত

উত্তরের পালা চুকিয়ে দক্ষিণে। রজনী সেন রোড। ব্যাচেলর ত্রিমূর্তির মধ্যমণি প্রদোষ মিত্তির ওরফে ফেলুদার আবাস। হাল আমলে ফেলু মিত্তিরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন টোটা রায়চৌধুরী। জেন জ়ি বংপুঙ্গবেরা বলেই ফেলেছেন, চেহারায় নাকি টোটাবাবু ফেলুমিত্তিরের এক্কেবারে ফোটোকপি। ফেলুদা তথা টোটার চোখে পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন খানিক শৌখিন। জটায়ুর মতো অতখানি আটপৌরে নয়। সকালের জলখাবারটা জটায়ুকে তার বাড়িতেই সারতে বলেছে ফেলুদা। মেনু কচুরি, আলুরদম, মিষ্টি। কিন্তু বাংলা নববর্ষকে খানিক কন্ট্রাস্ট দিতে ফেলুদার প্ল্যান তোপসে এবং জটায়ুকে নিয়ে পার্ক স্ট্রিটে লাঞ্চ সারার। কারণ, টোটার মতে, লালমোহনের আবার প্রকাশক পাড়ায় নেমন্তন্ন বিকেলে। ফলে স্কাইরুম-জাতীয় কোনও সাহেবি রেস্তরাঁয় লাঞ্চ সেরে বিকেলের মধ্যেই কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া। প্রকাশক মহল্লায় কিন্তু ফেলু মিত্তির মধ্যমণি নয়। সেখানে লালমোহনই হিরো। প্রকাশকের দফতরে পৌঁছে ফেলুদা হয়তো কোনও নতুন বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজবে। লালমোহন তখন ব্যস্ত হয়ে পড়বেন অনুরাগীদের অটোগ্রাফ দিতে। তরুণ লেখক হিসেবে তোপসেও ইদানীং বইপাড়ায় আনাগোনা করে। লালমোহন হয়তো তোপসেকে আলাপ করিয়ে দেবেন আর পাঁচজন রহস্য রোমাঞ্চ লেখকের সঙ্গে। তোপসে একটু লাজুক মুখে প্রকাশককে হয়তো প্রস্তাব দেবে ফেলুদার সাম্প্রতিক অ্যাডভেঞ্চারটা বই করার। এই সব সামলে ফের সবুজ অ্যাম্বাসাডরে চেপে তিনমূর্তি বেরিয়ে পড়বে কলকাতার আশপাশেই। রাতে জটায়ু ফেলু তোপসেকে ড্রপ করতে রজনী সেন রোডে এলেই হয়তো ফেলুদা প্রস্তাব দেবে রাতের খাবারটাও সেখানেই সারার। জটায়ু আবার আড্ডার গন্ধ পেয়ে এককথায় রাজি। বাড়ি ঢুকতেই শ্রীনাথ বলবে, “একটা ফোন এসেছিল। এক ভদ্রলোক ফেলুদাকে চাইছিলেন। নম্বর লিখে রেখেছি।” ফেলুদা তোপসেকে বলবে রিং করতে। টেলিফোনের ও প্রান্ত থেকে কেউ বিপন্ন কণ্ঠে প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর প্রদোষ মিত্রের সঙ্গে দেখা করতে চান বলে জানাবেন। ফেলুদা তোপসেকে নির্দেশ দেবে আগামিকাল সকাল ন’টায় দেখা করতে। সব শেষে টোটার সংযোজন, “পয়লা বৈশাখের সকালে ফেলু মিত্তিরের অবশ্যকর্তব্যটি বলতে ভুলে গিয়েছি। এ দিনও কিন্তু যোগাসনটা বাদ দেবে না ফেলুদা।”

সত্যান্বেষীর সাইডকিক কিন্তু পয়লা বৈশাখে একেবারেই স্বতন্ত্র। ছবি: সংগৃহীত

রজনী সেন রোড থেকে কেয়াতলা কতটা দূর? দুটোই দক্ষিণ কলকাতায়। সময় আর পরিসর যা-ই বলুক না কেন, ব্যোমকেশ বক্সী এখনও দারুণ ‘ইন’। পয়লা বৈশাখে ব্যোমকেশের সত্যবতীকে নিয়ে প্ল্যান থাকতেই পারে। বিবাহিত মানুষ! অথবা বলা ভাল, সত্যবতীই বছরের প্রথম দিনটা ঘরবন্দি হয়ে কাটাতে চায় না। ব্যোমকেশকে সিনেমার টিকিট কাটতে হয়েছে। সত্যবতী আবার বাংলা সিনামের পাশে দাঁড়ানোরই পক্ষপাতী। তার উপরে সে দিনটা সে আর হাঁড়ি ঠেলতে চায় না। অজিত কি তাদের সঙ্গ নেবে? পর্দার অজিত বন্দ্যোপাধ্যায় বকলমে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় কিন্তু প্রথমেই নাকচ করে দিলেন সেই সম্ভাবনা। পুঁটিরামের জিম্মায় অজিত দিব্যি থাকবে বলে জানাবে, এমনটাই মত তাঁর। কিন্তু বছর পয়লার দিনে অজিতের এ হেন গৃহবিলাসের হেতু ঠিক কী? আর কেউ না জানুক সত্যান্বেষী ব্যমকেশ ঠিক জানে, অজিত এ দিন প্রকাশকের নেমন্তন্নেও যাবে না। এমনকি, তার নিজের প্রকাশনার হালখাতাও সে পার্টনার প্রভাতের উপরেই ছেড়ে রাখবে। অজিত আসলে নিরালা মানুষ। ব্যোমকেশের হাতেও নতুন কেস আসি আসি করছে। ফলে এ দিনটা যুগলকে নিজেদের মতো কাটাতে দিয়ে অজিত তার লেখার টেবিলে গিয়ে বসবে। নতুন বছরে নতুন উপন্যাস লেখার তাগিদ রয়েছে। অন্য প্রকাশক এসে বায়না করেও গিয়েছেন নগদ টাকা দিয়ে। তার উপরে শাশ্বতের মতে, অজিত বিশ্বাস করে বছরের প্রথম দিনটায় যা করবে, সেটা সারা বছরই সাফল্যের সঙ্গে করতে পারবে। অতএব, ফাউন্টেন পেনের খাপ খুলে সে ঝুঁকে পড়বে অর্ধসমাপ্ত এক উপন্যাসের পাতায়। এ বছর যে করেই হোক ‘বিশুপাল বধ’ লেখাটা শেষ করতেই হবে। কেমন যেন দ পড়ে আছে সেই সত্যান্বেষণে!

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement