কীটনাশক আর আম-মাছির ছোঁয়ায় ইউরোপের বাজারে নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে এ দেশের আলফানসো আম।
এ রাজ্যে অবশ্য সে সব সতর্কতার বালাই নেই। পাখি-পোকা-বাদুড়ের উৎপাতে লিচুর ফলন যাতে মার না খায় তাই দেদার কীটনাশক ছড়ানো হয়েছিল মালদহের কালিয়াচকের বেশ কয়েকটি লিচু বাগানে। সেই লিচু খেয়েই বৃহস্পতি থেকে শনিবার, গত ছত্রিশ ঘণ্টায় ৯ জন শিশু মারা গিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা। অসুস্থ হয়ে মালদহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আরও পাঁচ জন।
ঘটনার পরেই জেলা স্বাস্থ্য কর্তারা কালিয়াচকের সিলামপুর, জালালপুর কিংবা নবীনগর গ্রাম এবং লাগোয়া লিচু বাগানগুলিতে গিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট বাগানগুলি থেকে লিচু সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে তা পাঠানোও হয়েছে বলে স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে। রাজ্যের অতিরিক্ত স্বাস্থ্য অধিকর্তা দীপঙ্কর মাজি শনিবার দুপুরেই মালদহ পৌঁছেছেন। কলকাতার ট্রপিক্যাল মেডিসিন থেকেও চিকিৎসকদের একটি দল এ দিন রাতে মালদহ রওনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
তবে, প্রায় দেড় দিন পেরিয়ে গেলেও এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনের বিশেষ হেলদোল চোখে পড়েনি। মালদহের জেলাশাসক শরৎকুমার দ্বিবেদী বলছেন, “স্বাস্থ্যকর্তারা ওই গ্রামগুলিতে গিয়েছেন। আগে তাঁদের রিপোর্ট পাই, তারপরে আইনি পথে যাওয়ার কথা ভাবা যাবে।” জেলা পুলিশ সুপার প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ও নির্বিকার গলায় বলছেন, “অভিযোগ না করলে কে দোষী বুঝব কী করে!” স্থানীয় লিচু-চাষিরা অকপটেই বাগানে কীটনাশক স্প্রে করার কথা জানালেও পুলিশ-প্রশাসন এমনই নির্বিকার।
অথচ আম-মাছি এবং কীটনাশকের উপস্থিতি টের পাওয়ায় ইউরোপের বিশেষত ইংল্যান্ডের বাজারে ভারতের আলফানসো আমের বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এ দেশ থেকে রফতানি করা বেগুন, করলা ও উচ্ছেও। ফল ও সব্জির বাজারে কয়েক লক্ষ পাউন্ড ক্ষতি সত্ত্বেও এ ব্যাপারে আপস করেনি ইউরোপিয় ইউনিয়নের দেশগুলি।
অথচ কালিয়াচকের সুজাপুরের লিচু ব্যবসায়ী মহম্মদ আব্দুর মোনায়েন স্পষ্টই বলছেন, “গাছে মুকুল ধরার পরে সাইপার মেট্রিন গ্রুপের কীটনাশক স্প্রে করা হয়েছিল। লিচুর গুটি আসতেই ব্যবহার করা হয়েছিল ফাইটোনল ও অ্যাগ্রোমিন জাতীয় কীটনাশক।” কোনও রাখঢাক না রেখেই ওই এলাকার লিচু চাষিরা জানান, যে কীটনাশক স্প্রে করা হয় তা শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক। আব্দুর বলেন, “গ্রামের কিছু লিচু ব্যবসায়ী বেশি ফলনের আশায় ক্ষতিকারক কীটনাশক ব্যবহার করেছেন বলেও শুনেছি। সেই কীটনাশক দেওয়া লিচু ভাল করে ধুয়ে না খেলে বড়দেরও শরীর খারাপ হতে পারে। ছোটদের ক্ষেত্রে ক্ষতির আশঙ্কা বেশি।”
মালদহের জেলা খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও উদ্যানপালন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, মালদহে প্রায় ১২০০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়। যার মধ্যে কালিয়াচক ১, ২ এবং ৩ নম্বর ব্লকে-ই প্রায় হাজার হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়। ফলন বাড়াতে অনেকেই যে প্রয়োজনের চেয়েও বেশি কীটনাশক ব্যবহার করেন তাও মেনে নিয়েছেন ওই দফতরের এক কর্তা। দফতরের সহ-অধিকর্তা রাহুল চক্রবর্তী বলেন, “লিচু গাছে মুকুল আসার পরে গুটিতে সিন্থেটিক পাইরিথ্রয়েড গ্রুপের কীটনাশক স্প্রে করা উচিত। তার বিষক্রিয়া বড় জোর সাতদিন থাকে।” তবে তিনি জানান, পরীক্ষা না করে অবশ্য বলা সম্ভব নয় যে ওই লিচু খেয়েই শিশুরা অসুস্থ হয়েছে কিনা।
খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও উদ্যান পালন মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু চৌধুরী নিজেই মালদহের বাসিন্দা। তিনি বলেন, “ঘটনাটি জেনে মুখ্যমন্ত্রীও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে, লিচু খাওয়ার ফলেই শিশু মৃত্যু হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখতে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর ও ট্রপিক্যাল মেডিসিনের বিশেষজ্ঞরা মালদহে পৌঁছবেন। আক্রান্ত শিশুদের পরীক্ষা করে তাদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।”
কালিয়াচকের যদুপুর, রতুয়া, হরিশচন্দ্রপুর গ্রামগুলিতেও ঘুরছেন চিকিৎসকেরা। ঘরে ঘরে উদ্বেগ নিয়ে দাঁড়িয়ে বাবা-মা। যদুপুরের সাদিকা বিবি তাঁর ৩ বছরের শিশুটিকে ভর্তি করেছিলেন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সাগিকা অনর্গল বলে চলেছেন, “তিনটে লিচু খেয়েই বমি করতে শুরু করল মেয়েটা। তারপর কিছু বোঝার আগেই চলে গেল গো!”