৬ কোটি টাকার আর্থিক তছরুপ মামলায় গত বছর অভিনেত্রী, নেটপ্রভাবী তথা উদ্যোগপতি সন্দীপা বির্ককে গ্রেফতার করেছিল ইডি। মাস চারেক তিহাড় জেলে ছিলেন তিনি। সম্প্রতি জামিন পেয়েছেন। জামিন পেয়ে এ বার তিহাড় জেলে কাটানো তাঁর সময় নিয়ে মুখ খুলেছেন সন্দীপা। একাধিক চাঞ্চল্যকর দাবিও করেছেন।
সমাজমাধ্যমে সন্দীপার অনুগামী ১২ লক্ষের বেশি। নিজেকে তিনি অভিনেত্রী এবং কসমেটোলজিস্ট বলে দাবি করেন। জেল থেকে বেরিয়ে এক সাক্ষাৎকারে সন্দীপা তাঁর কারাগারের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বিস্তারে কথা বলেছেন।
সন্দীপা বলেছেন, ‘‘তিহাড় এমন একটি জায়গা যেখানে আমি আমার সবচেয়ে খারাপ শত্রুকেও পাঠাতে চাইব না। যখন আমি প্রথম বার সেখানে গিয়েছিলাম, তখন আমি ঈশ্বরকে বলেছিলাম যে এই পরিণতি আমার প্রাপ্য নয়। প্রথম দিন যখন আমি জেলের শৌচালয়ে গিয়েছিলাম তখন মনে হয়েছিল, হয়তো আমি আগের জন্মে জেনেশুনে বা অজান্তে কিছু ভুল করেছি।’’
আবেগঘন পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে সন্দীপা আরও বলেন, ‘‘জেলে আমি প্রার্থনা করতাম যেন মৃত্যু এসে আমাকে নিয়ে যায়। সবচেয়ে খারাপ অনুভূতি হয় যখন জেলে থাকাকালীন বাবা-মা তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসে। আমি ওদের কাছেও ক্ষমা চেয়েছিলাম। কারণ, আমার কারণেই ওদের সেখানে যেতে হয়েছিল। আমার বাবা-মা এবং ভাইবোনেরা আমার পাশে ছিল কারণ, নিজের লোকেরাই জানে আমি কী রকম।’’
কারাবাসের সময় শারীরিক এবং মানসিক চাপের কথাও বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেছেন সন্দীপা। তিনি জানিয়েছেন, জেলে ৫০০ জন কয়েদির সঙ্গে থাকতে হত তাঁকে। মানসিক চাপের কারণে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। দাঁড়িয়ে থাকতেও পারতেন না একটানা।
সন্দীপা বলেন, ‘‘এখনও যখন আমি ওই সময়ের কথা ভাবি, তখন কেঁদে ফেলি। প্রশ্ন করি মনে মনে— আমিই কেন?’’ তিহাড়ে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অবস্থা সম্পর্কে বলতে গিয়ে নেটপ্রভাবী দাবি করেছেন, সেখানকার শৌচাগারগুলি নোংরা। ঘুমোতে হত মেঝেতে। সকাল ৬টায় ব্যারাক খুলে দেওয়া হত। আবার ১২টায় বন্ধ হয়ে যেত। আবার বিকেল ৩টেয় খুলে দেওয়া হত। সন্ধ্যা ৬টায় আবার বন্ধ করা হত।
তিহাড়ের খাবারও জঘন্য ছিল বলে দাবি করেছেন সন্দীপা। তাঁর দাবি, প্রতি দিন একই ডাল, একই সব্জি, চারটি রুটি এবং ভাত খেতে দেওয়া হত তাঁকে। কিছু খেতে ইচ্ছা করত না তাঁর।
কারাগারের ভিতরে পুলিশদের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক গড়ে ওঠে কয়েদিদের? সন্দীপার কথায়, ‘‘কিছু মহিলা পুলিশ দয়ালু। আর কয়েক জন বন্দিদের উপর তাঁদের জীবনের যাবতীয় রাগ এবং হতাশা উগরে দিতেন।’’
গ্রেফতারির খবর প্রকাশ্যে আসার পর তাঁর গায়ে যে কালির দাগ লেগেছিল এবং তিনি যে কলঙ্কিত হয়েছিলেন, সে কথাও উল্লেখ করেছেন সন্দীপা। তিনি বলেন, ‘‘যখন আমার খবর প্রকাশিত হত, তখন লোকেরা বলত, আমি প্রতারণা করেছি। যেখানে খুনের অভিযোগে অভিযুক্তদের সঙ্গে ভাল আচরণ করা হচ্ছে তখন আমি যা করিনি, তার জন্য আমায় প্রতারক বলা হচ্ছে।’’
জেলের ভিতরে টাকা দিয়ে কাজ করানোর অভিযোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে সন্দীপা বলেন, ‘‘জেলে টাকা ছাড়া কিছুই হয় না। আমি বেশি কিছু বলতে চাই না। কিন্তু জেলে যদি টাকা থাকে, তা হলে তোমার কাজ হয়ে যাবে। যদি টাকা না থাকে তা হলে তোমায় কঠিন পরিস্থিতিতে থাকতে হবে।’’
জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর সন্দীপা এ-ও দাবি করেছেন যে তিনি কারাগারে দুই মহিলাকে সাহায্য করেছেন। ওই দুই মহিলা কয়েদির আইনি সহায়তার প্রয়োজন ছিল। আর সে কারণেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি।
সন্দীপা বলেন, ‘‘এক মহিলা ৩,০০০ টাকা চুরির অভিযোগে চার মাস ধরে জেলে ছিলেন। তাঁর মা অন্ধ। বাবা শয্যাশায়ী। আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে আমি তাঁকে জেল থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করব এবং আমি তা করেছি।’’
সন্দীপা আরও বলেন, ‘‘আর এক মহিলা তাঁর স্বামীর কারণে জেলে খাটছিলেন। স্বামী শেয়ার বাজারের লেনদেনের মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলেন এবং স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে ১৭ লক্ষ টাকা স্থানান্তর করেছিলেন। ফলে মহিলার জেল হয়। তিনি ছ’মাস জেলে কাটিয়েছেন। আমি বেরিয়ে আসার প্রায় এক মাস পর তাঁকে অন্তর্বর্তিকালীন জামিন পেতে সাহায্য করেছি।’’
সন্দীপার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, প্রসাধন দ্রব্যের আড়ালে প্রতারণার কাজ চালাতেন তিনি। তাঁর সংস্থার ওয়েবসাইটে যে সব প্রসাধনীর বিজ্ঞাপন দিতেন এবং যেগুলি বিক্রি করতেন, সেগুলি এফডিএ স্বীকৃত বলে দাবি করতেন। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে পুরো বিষয়টিই ভুয়ো।
কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে খবর, সন্দীপার বিরুদ্ধে মোহালিতে একটি থানায় ৪০৬, ৪২০ ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণা এবং বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ ওঠে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে গত বছরের অগস্টে দিল্লি এবং মুম্বইয়ের বেশ কয়েকটি ঠিকানায় তল্লাশি অভিযান চালায় ইডি।
তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে খবর, আর্থিক প্রতারণার মাধ্যমে নিজের স্থাবর সম্পত্তি বাড়িয়েছেন সন্দীপা। তিনি একটি ওয়েবসাইট খুলেছিলেন। সেখানে যে সব প্রসাধনী দ্রব্যের উল্লেখ করা হয়েছিল সেগুলির কোনও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এমনকি ওয়েবসাইটের কোনও রেজিস্ট্রেশন ছিল না। যে সংস্থার নাম উল্লেখ করেছিলেন সন্দীপা, সেই সংস্থার কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে একটি প্রতারণার জাল তৈরি করেছিলেন বলে দাবি তদন্তকারী সংস্থার।
ইডি সূত্রে খবর, তল্লাশি অভিযানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার হয়। পঞ্জাবের মোহালিতে সন্দীপার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। তার পর প্রায় চার মাস জেল হেফাজতে ছিলেন তিনি। গত ডিসেম্বরে দিল্লি হাই কোর্ট নেটপ্রভাবী তথা অভিনেত্রীকে জামিন দেয়। আদালত এ-ও উল্লেখ করে, ইতিমধ্যেই চার মাসেরও বেশি সময় ধরে হেফাজতে ছিলেন তিনি। অন্য দিকে প্রধান অভিযুক্ত অমিত গুপ্ত পলাতক। ফলে বিচার শীঘ্র এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। আর সে কারণেই তাঁকে জামিন দেওয়া হয়েছিল। তার পরে মুম্বই ফিরে যান সন্দীপা।