মৃত্যু হল বিহারের ঐতিহাসিক দ্বারভাঙ্গা রাজপরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য এবং শেষ মহারানি কামসুন্দরী দেবীর। গত ১২ জানুয়ারি সোমবার মারা গিয়েছেন তিনি। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪।
বিগত কিছু দিন ধরে অসুস্থ মহারানি শয্যাশায়ী ছিলেন। দ্বারভাঙ্গা রাজপরিবারের কল্যাণী নিবাসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কামসুন্দরী।
মহারানি কামসুন্দরীর মৃত্যু দ্বারভাঙ্গা রাজপরিবারের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। সামাজিক কাজের সঙ্গে রাজকীয় মর্যাদার সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন তিনি।
কেবল রাজপরিবারের জন্য নয়, কামসুন্দরী দেবীর মৃত্যু সমগ্র অঞ্চলের জন্য এক বিরাট ক্ষতি। তাঁর মৃত্যুতে সমগ্র দ্বারভাঙ্গা জুড়ে শোকের আবহ।
মহারানি কামসুন্দরী দেবীর মৃত্যু প্রসঙ্গে মৃতার জ্যেষ্ঠ নাতি রত্নেশ্বর সিংহ বলেছেন, ‘‘মহারানি ১২ জানুয়ারি সকালে মারা গিয়েছেন। তাঁর শেষকৃত্যের প্রস্তুতি চলছে।’’ পরিবারের সদস্যেরা আসার পর দ্বারভাঙ্গার মাধেশ্বর কমপ্লেক্সে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় মহারানির। চিতায় আগুন দেন যুবরাজ রত্নেশ্বরই।
শেষকৃত্যের আগে দীর্ঘ সময় কামসুন্দরীর দেহ বাসভবনে রাখা হয়েছিল। মিথিলাঞ্চলের মানুষ সেখানে গিয়েই শেষ শ্রদ্ধা জানান মহারানিকে।
মিথিলার সাংস্কৃতিক এবং রাজকীয় ঐতিহ্যের যোগসূত্র হিসাবে পরিচিত ছিলেন মহারানি কামসুন্দরী। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বারভাঙ্গা-সহ সমগ্র মিথিলা অঞ্চলে শোকের ঢেউ বয়ে গিয়েছে। বেশ কয়েক জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব মহারানির মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন।
দ্বারভাঙ্গার শেষ মহারাজ কামেশ্বর সিংহের তিন স্ত্রী ছিলেন। মহারানি কামসুন্দরী ছিলেন মহারাজের তৃতীয় এবং শেষ স্ত্রী। ১৯৪০-এর দশকে কামসুন্দরীকে বিয়ে করেন কামেশ্বর।
মহারাজ কামেশ্বর অনেক আগেই গত হয়েছেন। মৃত্যু হয়েছে তাঁর প্রথম স্ত্রী মহারানি রাজলক্ষ্মী এবং দ্বিতীয় স্ত্রী মহারানি কামেশ্বরী প্রিয়ারও। ১২ জানুয়ারি তৃতীয় মহারানিরও মৃত্যু হল। কামসুন্দরী ছিলেন রাজপরিবারের সবচেয়ে প্রবীণ সদস্য।
কামসুন্দরী এমন এক সময় দ্বারভাঙ্গা রাজপরিবারের অংশ হয়েছিলেন যখন রাজতন্ত্রের সূর্য অস্ত যাচ্ছিল এবং গণতন্ত্রের ঊষাকাল চলছিল।
কামসুন্দরী ছিলেন নিঃসন্তান। ১৯৬২ সালে মহারাজ কামেশ্বরের মৃত্যুর পর রাজপরিবারের দায়িত্ব তিনিই কাঁধে তুলে নেন।
রাজপরিবার সামলানোর দায়ভার হাতে পেয়ে দ্বারভাঙ্গা তথা মিথিলার ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন কামসুন্দরী। সামাজিক এবং জনহিতকর কাজের জন্যও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তিনি।
প্রয়াত স্বামী তথা মহারাজ কামেশ্বরের স্মরণে ‘মহারাজাধিরাজ কামেশ্বর সিংহ কল্যাণী ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কামসুন্দরী। অসরকারি ওই সংস্থার মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সমাজকল্যাণ সম্পর্কিত অসংখ্য উদ্যোগ চালু করেছিলেন মহারানি।
মিথিলার সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণেও সংস্থাটির অবদান প্রশংসনীয়। সারা জীবন দরিদ্র, অভাবী এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের জন্য অটল নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছিলেন কামসুন্দরী। কারণ তিনি মনে করতেন, শিক্ষা, দানধ্যান এবং জনকল্যাণ রাজকীয় কর্তব্য।
তবে অনেকেরই অজানা যে, কামসুন্দরী ছিলেন একনিষ্ঠ দেশপ্রেমিক। ১৯৬২ সালের চিন-ভারত সংঘাতের সময় সরকারকে ৬০০ কেজি সোনা দান করেছিলেন তিনি।
ভারত-চিন সংঘাতের আবহে দেশে সম্পদের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। জাতীয় সঙ্কটের মুখোমুখি হচ্ছিল ভারত। সেই সময়ই দ্বারভাঙ্গা রাজপরিবার ভারত সরকারকে ৬০০ কেজি সোনা দান করে।
শেষ কয়েক মাসে মহারানি কামসুন্দরীর স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটে। গত কয়েক মাস ধরে অসুস্থ ছিলেন তিনি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাথরুমে পড়ে গিয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন কামসুন্দরী।
তৎক্ষণাৎ মহারানিকে দ্বারভাঙ্গার একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করানো হয়। পড়ে গিয়ে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং রক্ত জমাট বেঁধে যায়। তাঁর অবস্থা গুরুতর বলেই জানিয়েছিলেন চিকিৎসকেরা। ১২ জানুয়ারি রাজপরিবারের কল্যাণী নিবাসে মৃত্যু হয় তাঁর।