২০১৭ সালে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল জঙ্গলে। দীর্ঘ সময় পুনর্বাসনের পরও বাঁচানো গেল না। লখনউয়ে ১৮ বছর বয়সে মৃত্যু হল ভারতের ‘মোগলি কন্যা’ এহসাসের। ভারতের অধিকাংশ মানুষের কাছে এহসাস কেবল ‘মোগলি গার্ল’ বা ‘মোগলি কন্যা’ হিসাবেই পরিচিত ছিলেন।
২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশের কাতারনিয়াঘাট বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে ঘুরে বেড়ানোর সময় উদ্ধার করা হয়েছিল এহসাসকে। উদ্ধারের প্রায় ন’বছর পর, লখনউয়ে ১৮ বছর বয়সে মৃত্যু হল তাঁর।
চিকিৎসা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ১৫ জুন রাম মনোহর লোহিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (আরএমএলআইএমএস)-এ এহসাসের মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী, ফুসফুসের রোগের কারণে সৃষ্ট ‘সেপ্টিসেমিয়া’ (রক্তে মারাত্মক সংক্রমণ) ছিল তাঁর মৃত্যুর কারণ।
ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক রুডইয়ার্ড কিপলিঙের বিখ্যাত উপন্যাস ‘মোগলি’র কথা কে না জানে! কিপলিঙের উপন্যাসের সেই চরিত্রকে নিয়ে সিনেমা, কার্টুনও হয়েছে। বন্যপশুদের মাঝে এক মানবসন্তানের বেড়ে ওঠার কাহিনি। পশুদের মতোই আচার-আচরণ, ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুলের সেই মানবশিশুই কিপলিঙের উপন্যাসের দৌলতে যেন জীবন্ত চরিত্র হয়ে উঠেছে।
এহসাসের গল্পও ছিল খানিকটা সে রকমই। এমন এক কন্যা যাঁকে জঙ্গলের কাছে একা বিচরণ করতে দেখা গিয়েছিল। বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিলেন মোগলি কন্যা। কিন্তু সেই পরিচয়ের আড়ালে ছিল ‘এহসাস’ নামের একটি মেয়ে, যাঁর জীবন হয়ে উঠেছিল উদ্ধার, পরিচর্যা এবং পুনর্বাসনের এক অসাধারণ আখ্যান।
এহসাসের কাহিনি প্রথম সবার নজরে আসে ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে। বাহরাইচ জেলার কাতারনিয়াঘাট বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের মোতিপুর রেঞ্জের একটি রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে দেখা গিয়েছিল তাঁকে।
সে সময় উদ্ধারকারী এবং প্রশাসনের মনে হয়েছিল, মানবসমাজের সঙ্গে এহসাসের যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। হাত-পা ব্যবহার করে (পশুর মতো) হাঁটতেন তিনি। এ ছাড়াও শুরুর দিকে মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতেন এহসাস। পোশাক পরতে চাইতেন না। চিৎকার এবং অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে যোগাযোগ করতেন সকলের সঙ্গে।
যে ভাবে এবং যে অবস্থায় এহসাসকে পাওয়া গিয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই তাঁকে রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের কাল্পনিক চরিত্র ‘মোগলি’র সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেন। এ ভাবেই তাঁর নাম হয় ‘মোগলি গার্ল’ বা ‘মোগলি কন্যা’।
উদ্ধারের সময় মোগলি কন্যার কোনও নাম ছিল না। বাহরাইচের শিশু কল্যাণ কমিটি প্রথমে তাঁর নাম রাখে পূজা। পরে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় এহসাস। তাঁকে লখনউয়ের মোহন রোডে অবস্থিত ‘নির্বাণ রাজকীয় বাল গৃহ বিশেষীকৃত’ কেন্দ্রে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানেই জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছিলেন এহসাস।
পুনর্বাসনের জন্য দীর্ঘ পথ চলতে হয়েছিল এহসাসকে। ‘নির্বাণ ফাউন্ডেশন’-এর চেয়ারম্যান সুরেশ সিংহ ধাপোলার মতে, দীর্ঘ দিনের চিকিৎসা, পরিচর্যা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার ফলে এহসাস ধীরে ধীরে মানুষের মাঝে স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পোশাক পরা, পরিচর্যাকারীদের চিনতে পারা এবং ভালবাসার ডাকে সাড়া দিতে শিখেছিলেন মোগলি কন্যা। টুকটাক কথা বলতেও শুরু করেন। তাঁর পরিচর্যাকারী রানির সঙ্গে এহসাসের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। রানিকে ভালবেসে ‘আম্মা’ বলে ডাকতেন তিনি। সংবাদমাধ্যমে রানি বলেন, ‘‘ও (এহসাস) আমাকে আম্মা বলে ডাকত। আমার সব সময়ই আশা ছিল যে আরও সুস্থ হয়ে উঠবে। এখন শুধু ওর স্মৃতিটুকুই আমাদের কাছে রয়ে গেছে।’’
পরে অবশ্য সংবাদমাধ্যমে এহসাসের ছবি দেখে উত্তরপ্রদেশের বরাইচ পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এক বৃদ্ধ। নাম, হামিদ আলি শাহ। তিনি জানান, এহসাস তাঁর নাতনি। হারিয়ে গিয়েছিল সে। হামিদ আলি জানান, বরাইচের জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা ওই শিশুটি আসলে উত্তরপ্রদেশের কামলাপুর গ্রামের বাসিন্দা। তারা ছয় বোন এবং এক ভাই। বাবা কর্মসূত্রে দিল্লিতে রয়েছেন। যে জঙ্গল থেকে তাকে পাওয়া গিয়েছিল তার থেকে কামলাপুরের দূরত্ব ২৮৫ কিলোমিটার। ২০১৬-র ২৮ মার্চ আচমকাই বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে যায় সে। তার পর অনেক খুঁজেও তার খোঁজ মেলেনি। ওই দিনই বাদশাপুর পুলিশ স্টেশনে নিখোঁজ ডায়েরি করেছিল তার পরিবার। কিন্তু পুলিশও তার সন্ধান দিতে পারেনি। তবে বাবা-ঠাকুরদার খোঁজ পেয়েও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি এহসাস।
তবে দীর্ঘ দিনের পুনর্বাসন সত্ত্বেও অসুস্থ থাকতেন এহসাস। চিকিৎসকেরা লক্ষ্য করেন যে, এহসাসের মস্তিষ্ক মারাত্মক ভাবে অনুন্নত রয়ে গিয়েছে। ফলে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা দেখা দেয়।
এ ছাড়াও বার বার মৃগী রোগের খিঁচুনিতে আক্রান্ত হতেন এহসাস। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর চিকিৎসা চলেছিল। চলতি মাসের ৮ তারিখে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল তাঁকে। অবস্থার উন্নতি হওয়ায় ১১ জুন হাসপাতাল থেকে ছেড়েও দেওয়া হয়। তবে ১৫ জুন ফের তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।
এসিপি (গাজিপুর) অনিন্দ্য বিক্রম সিংহ জানিয়েছেন, এহসাসকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও সেখানে পৌঁছোনোর কিছু ক্ষণের মধ্যেই তিনি মারা যান। হাসপাতাল থেকে মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিক ভাবে জানানোর পর পুলিশ মৃতদেহের প্রাথমিক তদন্ত বা ‘ইনকোয়েস্ট’ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।
অনেক ভারতীয়ের কাছে এহসাস ছিলেন কেবলই ‘মোগলি কন্যা’, যাঁকে জঙ্গলে খুঁজে পাওয়া। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে যাঁরা তাঁর দেখাশোনা করেছেন, তাঁদের কাছে তিনি ছিলেন শুধু কন্যা। এহসাসের জীবন প্রতিকূলতা দিয়ে শুরু হলেও ভাল জীবন পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পুনর্বাসনের পথে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে ১৮ বছর বয়সে মৃত্যু হল তাঁর।
এর আগেও এক ‘মোগলি’র খোঁজ মিলেছিল ভারতের উত্তরপ্রদেশেই। সেই ‘মোগলি’র নাম দিনা সানিচর। উত্তরপ্রদেশের বুলন্দশহরের জঙ্গলে তাঁর খোঁজ মিলেছিল ১৮৭৩ সালে। একদল নেকড়ের সঙ্গে ওই জঙ্গলে দিনাকে দেখতে পেয়েছিলেন শিকারিরা। দিনার বয়স তখন মাত্র ছয়। ওই সময় দেশের নানা প্রান্তে চার জন এমন ‘মোগলি’র কথা প্রকাশ্যে এসেছিল। তবে একমাত্র খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল দিনার। পরে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। শিকারিরা দাবি করেছিলেন, একদল নেকড়ের মাঝে ওই মানবশিশুকে দেখতে পেয়েছিলেন তাঁরা। চার হাত-পায়ে নেকড়ের মতোই হাঁটছিল সে।
কিন্তু বন্যজগৎ থেকে ওই মানবশিশুকে উদ্ধার করে সভ্যতার আলোয় নিয়ে এসে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হল। আগরার কাছে একটি অনাথ আশ্রমে পাঠানো হয়েছিল মানুষের আদবকায়দা শেখানোর জন্য। সেই অনাথ আশ্রমেই ওই মানবশিশুর নামকরণ হয় দিনা সানিচর। কিন্তু সানিচরকে মানুষের আদবকায়দা শেখানো বড় কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পোশাক পরতে চাইত না। ভাষা বোঝা দূর অস্ত্, হাড়ে ঘষে দাঁত ধার করত সে। আর খাবারের মধ্যে শুধু মাংসই খেত।
ওয়েন ডেনিস নামে এক শিশু মনোবিদ দিনাকে নিয়ে গবেষণা করেন। ১৯৪১ সালে ‘আমেরিকান জার্নাল অফ সাইকোলজি’তে তিনি লিখেছিলেন যে, মানুষের সংস্পর্শে কোনও দিনই আসেনি দিনা। শুধু তাই-ই নয়, শীত, গ্রীষ্ম কোনও কিছুই তাঁর শরীরে প্রভাব পড়ত না। ডেনিসের দাবি, অনাথ আশ্রমে থাকাকালীন আশ্রমের অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন না দিনা। তার মতোই আরও একটি মানবশিশুকে উদ্ধার করে ওই অনাথ আশ্রমে নিয়ে আসা হয়। দু’জনকে একসঙ্গে রাখা হয়েছিল। তাদের মধ্যে একটা অদ্ভুত বন্ধন তৈরি হয়।
তবে বেশি দিন বাঁচেননি দিনা। ৩৪ বছর বয়সে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় ১৮৯৫ সালে। তবে মৃত্যুর আগে তিনি মানুষের অনেক আদবকায়দা শিখে গিয়েছিলেন। পোশাক পরা শিখেছিলেন, কী ভাবে খেতে হয়, তা-ও শিখেছিলেন। ঘটনাচক্রে, ১৮৯৪ সালে অর্থাৎ দিনার মৃত্যুর এক বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল রুডইয়ার্ড কিপলিঙের উপন্যাস ‘দ্য জাঙ্গল বুক’।