Operation Cactus

শ্রীলঙ্কার জঙ্গিদের সঙ্গে হাত মেলান শিল্পপতি, গা ঢাকা দেন প্রেসিডেন্ট! ‘ক্যাকটাস’ দিয়ে কাঁটা উপড়ে মলদ্বীপকে বাঁচায় ভারত

১৯৮৮ সালের নভেম্বরের গোড়ায় ওই অভ্যুত্থানের ঘটনায় গায়ুম সরকারকে বাঁচিয়েছিল ভারতীয় সেনা। সেই সামরিক অভিযানের পোশাকি নাম ছিল ‘অপারেশন ক্যাকটাস’।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৪
Share:
০১ ২৩

ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিমে ভারত মহাসাগরের উপরে অবস্থিত ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র মলদ্বীপ। মাঝখানের বছর দু’য়েক বাদে প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে বরাবরই সুসম্পর্ক রয়েছে ভারতের। মলদ্বীপকে অর্থ, সেনার সুরক্ষা দিয়ে বার বার সাহায্য করেছে ভারত।

০২ ২৩

ইতিহাস ঘাঁটলে মলদ্বীপের সঙ্গেই ভারতের সুসম্পর্কের একাধিক নজির খুঁজে পাওয়া যায়। একাধিক কঠিন পরিস্থিতিতে মলদ্বীপের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত। ৩৮ বছর আগে শ্রীলঙ্কা থেকে নৌপথে আসা সশস্ত্র হামলাকারীদের ভয়ে নিজের প্রাসাদ ছেড়ে লুকোতে হয়েছিল মলদ্বীপের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মামুন আব্দুল গায়ুমকে।

Advertisement
০৩ ২৩

১৯৮৮ সালের নভেম্বরের গোড়ায় ওই অভ্যুত্থানের ঘটনায় গায়ুম সরকারকে বাঁচিয়েছিল ভারতীয় সেনা। সেই সামরিক অভিযানের পোশাকি নাম ছিল ‘অপারেশন ক্যাকটাস’। কিন্তু কী এই ‘অপারেশন ক্যাকটাস’?

০৪ ২৩

‘অপারেশন ক্যাকটাস’ মলদ্বীপে ভারতীয় সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ একটি সামরিক অভিযান, যার মাধ্যমে একেবারে খাদের কিনারা থেকে পড়শি দেশটিকে তুলে এনেছিল ভারত। ভারতীয় সেনা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অভিযানে সাফল্য পেয়েছে। তবে খুব কম ক্ষেত্রেই অভিযানে সেনার তিন বাহিনীকে একসঙ্গে মাঠে নামতে দেখা গিয়েছে। মলদ্বীপের ‘অপারেশন ক্যাকটাস’ ছিল তেমনই এক বিরল অভিযান। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী মলদ্বীপ সরকারের সহায়তায় সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ১২ ঘণ্টার মধ্যেই শুরু হয়েছিল অভিযান।

০৫ ২৩

১৯৮৮ সালের ৩ নভেম্বর। ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকের কাছে মলদ্বীপ থেকে সাহায্য চেয়ে জরুরি বার্তা এসে পৌঁছোয়। শ্রীলঙ্কার জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশে সামরিক অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেছিলেন আবদুল্লা লুতিফি।

০৬ ২৩

লুতিফি ছিলেন মলদ্বীপের জনপ্রিয় শিল্পপতি। তিনি শক্তি সঞ্চয় করে শ্রীলঙ্কার জঙ্গিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশের সরকার ফেলে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁদের ভয়ে মলদ্বীপের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গায়ুমকে গা ঢাকা দিতে হয়েছিল।

০৭ ২৩

লুতিফির ঘনিষ্ঠ সহযোগী আহমদ ইসমাইল মানিক সিক্কা শ্রীলঙ্কার তামিল জঙ্গিগোষ্ঠী ‘প্লট’ (পিপল্‌স লিবারেশন অর্গানাজ়েশন অফ তামিল ইলম)-এর নেতা উমা মহেশ্বরনের সঙ্গে আলোচনা করে অভ্যুত্থানের নকশা তৈরি করেছিলেন।

০৮ ২৩

একদা আর এক তামিল জঙ্গিগোষ্ঠী এলটিটিইর সদস্য ছিলেন মহেশ্বরন। কিন্তু এলটিটিই প্রধান ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে ১৯৮০ সালে গড়েন নতুন গোষ্ঠী প্লট। মলদ্বীপ-কাণ্ডের কিছু দিন পরেই খুন হন তিনি।

০৯ ২৩

উত্তর এবং উত্তর-পূর্ব শ্রীলঙ্কায় এলটিটিইর প্রভাব বৃদ্ধির ফলে কোণঠাসা হয়ে পড়া প্লট ভারত মহাসাগরে নতুন একটি নিরাপদ ঘাঁটির সন্ধান করছিল। তাই তারা হাত মেলায় লুতিফির সঙ্গে। অন্য দিকে লুতিফি চেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট হতে। লুতিফির আর এক সঙ্গী আহমদ নাসির মাছ ধরার দু’টি ট্রলারে শ’দেড়েক জঙ্গিকে সমুদ্রপথে রাজধানী মালেতে আনার ব্যবস্থা করেছিলেন। তাদের সাহায্য করার জন্য ছিলেন স্থানীয় বেশ কিছু সশস্ত্র যোদ্ধা।

১০ ২৩

মলদ্বীপে পৌঁছেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলি একের পর এক দখল করে নেয় জঙ্গিরা। ১৯৮৮-র ৩ নভেম্বর ভোরে দু’টি দলে ভাগ হয়ে মালে পৌঁছে সেখানকার বন্দর এবং প্রেসিডেন্ট গায়ুমের ব্যবহৃত বিশেষ জেটির দখল নেয় অভ্যুত্থানকারীরা। কব্জা করে প্রেডিডেন্টের প্রাসাদ এবং রেডিয়ো ও টিভি সম্প্রচার কেন্দ্র। বিমানবন্দর, সরকারি ভবন সব জঙ্গিদের দখলে চলে গিয়েছিল চোখের নিমেষে।

১১ ২৩

মলদ্বীপের জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনী অতর্কিত আক্রমণে কার্যত ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গোপন ডেরায় পালিয়ে সাহায্যের জন্য ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, আমেরিকা এবং ব্রিটেনের কাছে আর্জি জানিয়েছিলেন মলদ্বীপের প্রেসিডেন্ট। সেনা দিয়ে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কোনও বন্ধু দেশই ফিরে তাকায়নি।

১২ ২৩

এই অবস্থায় এগিয়ে এসেছিল নয়াদিল্লি। মলদ্বীপে সামরিক অভ্যুত্থানের খবর পেয়ে নড়েচড়ে বসে ভারত। জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষীদের (ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড) সঙ্গে হাত মেলায় ভারতীয় সেনা। মলদ্বীপের পাশে দাঁড়াতে সে সময় দু’বার ভাবেনি ভারত।

১৩ ২৩

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী মলদ্বীপকে সাহায্যের আশ্বাস দেন। দিল্লিতে নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী রাজীব। সেখানে প্রাথমিক ভাবে এনএসজি কমান্ডোদের মালে পাঠানোর আলোচনা হলেও পরে সেনা অভিযানের সিদ্ধান্ত হয়। দ্রুত তৈরি হয় রণসজ্জা। ভারতের স্থলবাহিনী, নৌসেনা এবং বায়ুসেনা মলদ্বীপে অভিযান চালায়।

১৪ ২৩

মলদ্বীপে ভারতীয় সেনা পৌঁছোয় ৩ নভেম্বর রাতে। সাহায্য চেয়ে ফোন আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মলদ্বীপে ভারত সেনা পাঠিয়ে দিয়েছিল। মলদ্বীপে অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আগরায় ‘৫০ ইনডিপেন্ডেন্ট প্যারাস্যুট ব্রিগেড’কে। নেতৃত্বে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার ফারুখ বালসারা এবং কর্নেল সুভাষ জোশী।

১৫ ২৩

যদিও তত ক্ষণে মলদ্বীপের জাতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর সদর দফতরের দখল নিয়েছে শ্রীলঙ্কার হামলকারীরা। লড়াইয়ে নিহত হয়েছেন কয়েক জন নিরাপত্তা আধিকারিক। আহত উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইলিয়াস ইব্রাহিমও।

১৬ ২৩

৩ নভেম্বর রাতে ভারতীয় বায়ুসেনার তিনটি আইএল-৭৬ সামরিক পরিবহণ বিমান আগরা থেকে তিরুঅনন্তপুরম হয়ে রাতেই মলদ্বীপের হুলহুলে (বর্তমান ভেলানা) বিমানবন্দরে অবতরণ করে। শুরু হয় ঝটিতি অভিযান। ভারত যে মলদ্বীপকে সাহায্য করবে, এত দ্রুত যে ভারতীয় সেনা সেখানে পৌঁছে যাবে, বিদ্রোহীরা তা আন্দাজ করতে পারেননি। ফলে দ্রুত তাঁরা পিছু হটেন।

১৭ ২৩

সমুদ্রপথে আরও হামলাকারী যাতে মালে না পৌঁছোতে পারে সে জন্য কেরলের কোচি নৌঘাঁটি থেকে ভারতীয় নৌসেনার কয়েকটি জাহাজও মলদ্বীপের উদ্দেশে রওনা হয়। ভারতীয় প্যারাকমান্ডোরাও ৪ নভেম্বর ভোর ৪টের সময় গায়ুমের গোপন ডেরায় পৌঁছে যান। স্যাটেলাইট ফোনে তিনি কৃতজ্ঞতা জানান রাজীবকে।

১৮ ২৩

অন্য দিকে, একটি মালবাহী জাহাজে ২৭ জন পণবন্দিকে নিয়ে পালানোর পরিকল্পনা করেছিল শ্রীলঙ্কার জঙ্গিরা। পণবন্দিদের মধ্যে ছিলেন মলদ্বীপের পরিবহণমন্ত্রী আহমেদ মুজুতুবা এবং তাঁর স্ত্রী। পণবন্দিদের নিয়ে জঙ্গিদের জাহাজ শ্রীলঙ্কা থেকে রওনা দিয়েছিল। পিছনে ধাওয়া করেছিল ভারতীয় নৌসেনার জাহাজ। মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণ করা হচ্ছিল। পালাবার পথ পাচ্ছিল না জঙ্গিরা।

১৯ ২৩

বাঁচার জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মরিয়া চেষ্টা করে জঙ্গিরা। কিন্তু নৌসেনা থামেনি। শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার জঙ্গি এবং মলদ্বীপের বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণ করতে হয় ভারতের কাছে। জঙ্গিদের বন্দি করে জাহাজে মলদ্বীপে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

২০ ২৩

মাত্র ১৬ ঘণ্টায় শেষ হয় মলদ্বীপের সামরিক অভ্যুত্থান। ভারতীয় সেনার অভিযানে বন্দি হয়েছিলেন মূল পরিকল্পনাকারী লুতিফি। ভারতীয় সেনা জওয়ানেরা পরে জানিয়েছিলেন, সে সময় মলদ্বীপের সাধারণ মানুষের চোখেমুখে কৃতজ্ঞতার ছাপ দেখেছিলেন তাঁরা।

২১ ২৩

মলদ্বীপে গায়ুমের সরকার তার আগে আরও দু’বার সামরিক অভ্যুত্থানের মুখে পড়েছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতা ছিল তার অন্যতম কারণ। তবে ১৯৮৮ সালের অভ্যুত্থান ছিল সবচেয়ে বড় এবং বিপজ্জনক। মলদ্বীপের বিপদে এ ভাবেই বার বার পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত।

২২ ২৩

মলদ্বীপের বর্তমান শাসক মহম্মদ মুইজ্জু নির্বাচনের আগে ভারত-বিরোধী প্রচার চালিয়েছিলেন দেশে। তিনি ক্ষমতায় আসার পর আচমকা মলদ্বীপের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্দেশে তাদের তিন প্রাক্তন মন্ত্রীর অবমাননাকর মন্তব্যে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল দুই দেশে। ভারতে উঠেছিল ‘বয়কট মলদ্বীপ’ স্লোগান।

২৩ ২৩

এ ছা়ড়া ক্ষমতায় এসেই মুইজ্জু মলদ্বীপের মাটি থেকে ভারতীয় সেনাকে সরে যেতে বলেন। বিষয়টিকে একেবারেই ভাল চোখে দেখেনি নয়াদিল্লি। যদিও বর্তমানে একাধিক কূটনৈতিক বোঝাপড়ার পর আবার দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement