রাশি রাশি বালির নীচে চাপা পড়ে রয়েছে কয়েক হাজার বছরের রহস্য। মিশরের প্রাচীন শহর থিবসের এই অংশেই ছিল রাজা-রাজড়াদের সমাধি, পরবর্তী কালে যার নামকরণ করা হয়েছে ‘ভ্যালি অফ কিংস’। প্রায় তিন হাজার বছরের পুরনো ইতিহাসে অজস্র কাহিনি-উপকাহিনির শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে ফারাওয়ের সমাধি ঘিরে।
সেই সমাধিতে এ বার হদিস মিলল ভারতীয় যোগের। সময়ের স্তরে স্তরে চাপা পড়া প্রাচীন সমাধি থেকে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে অতীতের এক বিস্মৃত অধ্যায়কে। ভারতের সঙ্গে যে বহু কাল ধরে পিরামিডের সম্পর্ক ছিল সেই তত্ত্বই জোরালো হল এই অধ্যায়টির উন্মোচনে।
গবেষকেরা সম্প্রতি মিশরের বিখ্যাত ‘ভ্যালি অফ দ্য কিংস’-এর অভ্যন্তরে ভারতীয় ভাষায় লেখা প্রায় ৩০টি প্রাচীন শিলালিপি শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে ২০টি ছিল তামিল-ব্রাহ্মী লিপিতে। প্রায় ২,০০০ বছর আগে এক ভারতীয় পর্যটক বা পরিদর্শক মিশরের এক রাজকীয় সমাধিতে নিজের উপস্থিতির চিহ্ন রেখে গিয়েছিলেন, প্রমাণ পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা।
গবেষকদের মতে, সিকাই কোরান নামে এক ভারতীয় ব্যক্তি ভারত থেকে মিশর পর্যন্ত হাজার হাজার মাইল ভ্রমণ করেছিলেন। দু’হাজার বছর আগে, ভারতের তামিলভাষী অঞ্চল থেকে মিশরের ‘ভ্যালি অফ কিংস’-এ গিয়ে, একটি-দু’টি নয়, মোট পাঁচটি সমাধিতে নিজের নাম লিখে এসেছিলেন।
সিকাই সম্ভবত প্রথম ভারতীয় যাঁর প্রাচীন তামিল ভাষায় লেখা এই লিপিগুলো বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্রের দেওয়ালে আজও খোদাই করা রয়েছে। একটি দেওয়ালের লিপিতে আবিষ্কার হয়েছে, “সিকাই কোরান এখানে এসে দেখেছিল” এই বাক্যবন্ধটি।
প্রাচীন তামিল ভাষায় সেই লিপি পাঠোদ্ধার করতে পেরে বিশেষজ্ঞেরা মিশর-ভারত সংযোগের বিষয়ে বহু নতুন কথা বলছেন। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, বোঝা যাচ্ছে, যত্রতত্র নিজের নাম খোদাই করে আসার অভ্যাসটি আদৌ কোনও কোনও নতুন বিষয় নয়, বরং তা প্রাচীন ভারতীয় ‘রোগ’!
গবেষকেরা নিশ্চিত, সিকাই ছিলেন সেই কয়েক ডজন ভারতীয় পরিদর্শকদের মধ্যে একজন, যাঁরা খ্রিস্টীয় প্রথম থেকে তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যে মিশরের সবচেয়ে পবিত্র সমাধিস্থলগুলি পরিদর্শনে এসেছিলেন। তাঁরা সম্মিলিত ভাবে প্রাচীন তামিল, সংস্কৃত, প্রাকৃত এবং গান্ধার-খরোষ্ঠী-সহ ভারতীয় ভাষা ও লিপিতে প্রায় ৩০টি শিলালিপি রেখে গিয়েছেন।
তবে, এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত সমস্ত শিলালিপির মধ্যে কেবল একটি নামই বার বার দেখা গিয়েছে। সেটি হল সিকাই কোরান। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘সিকাই’ অংশটি সম্ভবত সংস্কৃত শিখা শব্দ থেকে এসেছে এবং কোরান শব্দটি তামিল, যার অর্থ বিজয়।
প্রাচীন মিশরের সমাধিপ্রাচীরে খোদাই করা এই ধরনের লেখা থেকে বোঝা যায়, সেই সময় ভারত ও মিশরের মধ্যে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ছিল। দূর দেশ থেকে আসা মানুষেরা মিশরের বিখ্যাত সমাধি ও স্মৃতিস্তম্ভ দেখতে যেতেন এবং অনেক সময় নিজেদের নাম বা মন্তব্য খোদাই করে রেখে যেতেন।
ইতিহাস বলছে, টলেমীয় ও রোমান যুগে (খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় প্রথম কয়েক শতক পর্যন্ত) মিশরের প্রাচীন রাজকীয় সমাধিগুলি পর্যটকদের আকর্ষণ করত। দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষ— গ্রিক, রোমান, নুবীয়, এমনকি ভারতীয় বংশোদ্ভূত পর্যটকেরাও এই সমাধি দেখতে যেতেন এবং অনেক সময় দেওয়ালে নিজেদের নাম, পরিচয় বা মন্তব্য লিখে রাখতেন।
লোহিত সাগরের তীরবর্তী বন্দরগুলি ভারত-মিশর বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে এ সব অঞ্চলে ভারতীয় উৎসের পণ্য, যেমন গোলমরিচ ও অন্যান্য সামগ্রীর প্রমাণও মিলেছে।
ফরাসি গবেষক জুল বেইয়ে ১৯২৬ সালে মিশরীয় সমাধিতে ২,০০০-এরও বেশি শিলালিপি ও অঙ্কন খুঁজে পান। তাঁর গবেষণায় দেখা যায় যে গ্রিক ও লাতিন পর্যটকেরা প্রায়শই এখানে আসতেন এবং তাঁদের চিহ্ন রেখে যেতেন। ১১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত তামিল শিলালিপি বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে লোজান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইঙ্গো স্ট্রাউচ পিরামিডে ভারতীয় শিলালিপি শনাক্ত করার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন।
তিনি জানিয়েছিলেন যে ২০২৪ সালে সমাধিগুলো পরিদর্শনের সময় তিনি এমন কিছু গ্রাফিতি লক্ষ করেন যা আগে প্রকাশিত গ্রাফিতিগুলি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। তিনি যে গ্রাফিতিগুলো খুঁজে পেয়েছেন সেগুলি ভারতীয় লিপির মতো ছিল। তাঁর তোলা ছবিগুলি বিশ্লেষণে ধারণা করা হয় যে সেগুলো সম্ভবত তামিল ভাষায় লেখা হয়েছিল। তিনি ছবিগুলো তাঁর সহকর্মী শার্লট শ্মিডকে দেখান। তিনি নিশ্চিত করেন এটি তামিলেই লেখা।
শ্মিড সম্মেলনে জানান যে, শিকাইয়ের চিহ্ন রেখে যাওয়ার একটি অদ্ভুত পদ্ধতি তাঁদের নজরে পড়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি কয়েক ফুট উঁচুতে ছিল। নবম রামসেসের সমাধিতে প্রবেশদ্বারের প্রায় ১৬ থেকে ২০ ফুট উপরে নাম লিখেছিলেন শিকাই। গবেষকদের মতে, তিনি সম্ভবত নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যে তাঁর লেখা বা নাম অন্যদের নজরে পড়ুক।
স্ট্রাউচ আরও যোগ করেন যে, শিকাই স্পষ্টতই তাঁর এই সফর নিয়ে অত্যন্ত উত্তেজিত ছিলেন এবং প্রায় প্রতিটি সমাধিতেই নিজের নাম রেখে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। প্রাচীন ভারতীয়েরা শুধু বাণিজ্যের জন্য নয়, ভ্রমণ ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের উদ্দেশ্যেও নীল নদের উপত্যকায় যাতায়াত করতেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ গ্রিক ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচিত ছিলেন বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
গবেষকদের মতে, হাজার বছরের প্রাকৃতিক ক্ষয়, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের পা পড়ার পরেও এই শিলালিপি টিকে থাকা এক অসাধারণ ঘটনা। এটি প্রমাণ করে যে প্রাচীন বিশ্বের সভ্যতাগুলো একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। বরং বাণিজ্য, ভাষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে তাদের মধ্যে গভীর যোগাযোগ ছিল।