কৃত্রিম মেধা বা এআইয়ের (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) দুনিয়ায় শোরগোল। শোরগোল ফেলেছে অ্যানথ্রপিক। তাদের তৈরি ‘ক্লড এআই’ নাকি নিজের থেকেই বানাতে পারছে কৃত্রিম মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা। এর জেরে এআইয়ের উন্নতি আরও দ্রুত হতে পারে বলে স্পষ্ট করেছে সংশ্লিষ্ট মার্কিন টেক জায়ান্ট।
‘এআই ক্লড’কে নিয়ে সম্প্রতি নিজেদের ব্লগে গবেষণামূলক একটি লেখা পোস্ট করে অ্যানথ্রপিক। সেখানে বলা হয়েছে, যে ভাবে কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তিটি কাজ করছে, তাতে এটি ‘পুনরাবৃত্তিমূলক আত্ম-উন্নয়ন’-এর দিকে চলে যেতে পারে। অর্থাৎ, আগামী দিনে মানুষের সাহায্য ছাড়াই নিজের উত্তরসূরির নকশা, নির্মাণ এবং প্রশিক্ষণ দিতে পারবে ‘এআই ক্লড’।
মার্কিন টেক জায়ান্টটি জানিয়েছে, কৃত্রিম মেধার ‘পুনরাবৃত্তিমূলক আত্ম-উন্নয়নের’ বাস্তবায়ন হয়তো পুরোপুরি সম্ভব নয়। কিন্তু, এই ধরনের ভয়াবহ কিছু হতে পারে সেটা ধরে নিয়ে সরকার এবং সমাজকে প্রস্তুত থাকতে হবে। কারণ, যে গতিতে কৃত্রিম মেধা এগোচ্ছে তাতে চিন্তাভাবনার সময়টুকুও পাওয়া যাবে না। এর উন্নতি ধীরে হওয়ার বদলে খুব দ্রুত গতিতে হচ্ছে।
একাধিক সমীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই ই়ঞ্জিনিয়ার এবং গবেষকদের তড়িৎগতিতে কাজ করতে সাহায্য করছে এআই। অ্যানথ্রপিক মনে করে, আগামী দিনে স্বাস্থ্যসেবা, বিজ্ঞান এবং উৎপাদনশীলতার মতো ক্ষেত্রগুলিতে বড় ধরনের উন্নতির পথ খুলে দেবে কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তি। তখন এআইয়ের সঙ্গে মানুষ কী ভাবে নিজের সম্পর্ক বজায় রেখে চলবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।
নিজেদের ব্লগে এর ব্যাখ্যাও দিয়েছে অ্যানথ্রপিক। সেখানে বলা হয়েছে, গোড়ার দিকে সফট্অয়্যার তৈরি করতে ইঞ্জিনিয়ারেরা হাতে-কলমে কোড লিখতেন। তার পর এল এআই চ্যাটবট। তারা ছোটখাটো কোড লিখতে সাহায্য করত। সেটাই বর্তমানে কোডিং এজেন্টে পরিণত হয়েছে। এরা স্বাধীন ভাবে ফাইল লিখতে এবং সম্পাদনা করতে পারে। ফলে ওই ইঞ্জিনিয়ারদের আর কোনও প্রয়োজন নেই।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গত কয়েক বছরে এআই এজেন্টগুলো আরও উন্নতি করেছে। কোড লেখা, ফাইল সম্পাদনার পাশাপাশি অন্য এজেন্টদের হাতে কাজ ভাগ করে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে তাদের। অ্যানথ্রপিক মনে করে, এর পরের পদক্ষেপ হল এমন একটা কৃত্রিম মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি করা যারা অন্যান্য এআই মডেল বানিয়ে তাদের প্রশিক্ষণ দেবে।
মার্কিন টেক জায়ান্টটির দাবি, প্রযুক্তিগত উন্নতির জেরে কৃত্রিম মেধার উপর আমজনতার নির্ভরশীলতাও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। একটি পরিসংখ্যান থেকে সেটা বুঝে নেওয়া যেতে পারে। বর্তমানে প্রতি চার মাসে এআই ব্যবহার দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগে এটা ছিল সাত মাস। ২০২৪ সালে মাত্র চার মিনিটে একজন সফট্অয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের প্রায় সব কাজ করে ফেলত ‘ক্লড ওপাস ৩’।
গত বছর (২০২৫ সাল) ‘ক্লড সনেট ৩.৭’ বাজারে আনে অ্যানথ্রপিক। সেটা আরও কম সময়ে সেরে দিচ্ছিল সফ্টঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের কাজ। এ বছর ‘ক্লড ওপাস ৪.৬’ তৈরি করেছে সংশ্লিষ্ট মার্কিন টেক জায়ান্ট। যে কাজ করতে এক ব্যক্তির ১২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় লাগে, সেটা এই কৃত্রিম মেধা নিমেষে করতে পারে বলে জানা গিয়েছে।
অ্যানথ্রপিক আরও জানিয়েছে, বর্তমানে এআই মডেল তৈরির বেশির ভাগ কোড নিজের থেকে লিখছে ‘ক্লড’। ফলে ইঞ্জিনিয়ারেরা অনেক বেশি পরিমাণে কোড তৈরি করতে পারছেন। ২০২৪ সালের তুলনায় তাদের কোড তৈরির পরিমাণে দৈনিক প্রায় আট গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেটা অভাবনীয়।
‘ক্লড’ এআই মডেলটি শুধুমাত্র কোডিংয়ে দক্ষ, তা ভাবলে ভুল হবে। গবেষণামূলক কাজেও এই কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তিটি বেশ উন্নতি করছে। ফলে কঠিন কোডিংয়ে সাফল্যের হার চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়ে ৭৬ শতাংশে পৌঁছেছে বলে অ্যানথ্রপিক সূত্রে জানা গিয়েছে। আর তাই এআইয়ের ব্যাপারে তিনটি পূর্বাভাস দিয়েছে এই মার্কিন টেক জায়ান্ট।
অ্যানথ্রপিকের দাবি, কিছু কিছু প্রযুক্তির ক্ষেত্রে গোড়াতেই অভাবনীয় উন্নতি লক্ষ করা গিয়েছে। ফলে পরবর্তী কালে অনেকটাই শ্লথ হয়েছে তাদের অগ্রগতি। কৃত্রিম মেধার ক্ষেত্রেও সেটা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অন্যথায় উৎপাদনের দুনিয়ায় বড় ভূমিকা নেবে এআই। পাশাপাশি, নিজেরাই নিজেদের উত্তরসূরি তৈরি করে ফেলবে। এবং সেটা ঘটার সম্ভাবনা প্রবল।
এ ব্যাপারে মার্কিন গণমাধ্যম ব্লুমবার্গের কাছে মুখ খুলেছেন অ্যানথ্রপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা তথা সিইও (চিফ এক্জ়িকিউটিভ অফিসার) দারিও আমোদি। তাঁর কথায়, ‘‘কৃত্রিম মেধাকে আরও ক্ষুরধার করতে আমরা সেরাটা দিচ্ছি। কিন্তু, তাতে এআই প্রযুক্তি একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে। সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’’
অন্য দিকে রয়টার্সের একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ৫০ শতাংশ আমেরিকাবাসী মনে করেন কৃত্রিম মেধার উত্থানে কাজ হারাবেন তাঁদের পরিবারের কেউ না কেউ। বয়স, লিঙ্গ এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্বিশেষে এই ভয় সকলের মধ্যেই রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী সমস্ত এআই সংস্থাকে একত্রিত হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন অ্যানথ্রপিকের সিইও। ব্লুমবার্গকে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের নিজেদের মধ্যে একটা বোঝাপড়া থাকা দরকার। নইলে ভুল ভাবে এআই প্রযুক্তির বিকাশ ঘটবে। এর সামাজিক প্রভাব মারাত্মক হতে পারে।’’ আর তাই কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার গতি শ্লথ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
এর পাশাপাশি কৃত্রিম মেধাভিত্তিক ব্যবস্থাগুলির কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন আমোদি। ব্লুমবার্গকে তিনি বলেন, ‘‘বড় ধরনের কোনও ভুল হলে এআই টুলটি নিষিদ্ধ হতেই পারে। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে।’’
ইতিমধ্যেই অ্যানথ্রপিক তাদের এআই মডেল ‘মিথোস’-এর একটি সর্বজনীন সংস্করণ বাজারে এনেছে। সফ্টঅয়্যারের ত্রুটি খুঁজে বার করার অসাধারণ ক্ষমতার কারণে এর আগের একটি ‘প্রিভিউ’ সংস্করণ বিশ্ব জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এ বার সাইবার নিরাপত্তার মতো ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে এর ব্যবহার রোধে বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা বা ‘গার্ডরেল’ যুক্ত করেছে তারা।
চলতি বছরের ৯ জুন মার্কিন টেক জায়ান্টটি জানায়, সফ্টঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং এবং অ্যানালিটিক্স ক্ষেত্রে দুর্দান্ত কাজ করা ‘ক্লড ফেবল ৫’ মডেলটি তাদের তৈরি এ যাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিশালী মডেল, যা ব্যাপক পরিসরে ব্যবহারের জন্য চালু করা হচ্ছে। গত এপ্রিলে ‘মিথোস’-এর মাধ্যমে হাজার হাজার সফ্টঅয়্যার দুর্বলতা বা ‘ভালনারেবিলিটি’ শনাক্ত করার পর এর ব্যবহার সীমিত করে অ্যানথ্রপিক।
মার্কিন এআই সংস্থাটির বর্তমান বাজারমূল্য ৯৬,৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছে গিয়েছে। তাদের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থা হল চ্যাটজিপিটির নির্মাণকারী সংস্থা ওপেনএআই। দু’টি কোম্পানিই বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির চেষ্টা চালাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কৃত্রিম মেধার নতুন মডেল প্রতিযোগিতায় অ্যানথ্রপিককে কিছুটা এগিয়ে রাখবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।