একটা ম্যাকবুক কিংবা একটা আইপ্যাড থাকুক। এই স্বপ্ন অনেকেই মনে মনে পোষণ করেন। বিশেষ করে অ্যাপ্ল ব্র্যান্ডটিকে যাঁরা বেশি গুরুত্ব দেন। অ্যাপ্লের পণ্য বরাবরই তাঁদের কাছে একটি আকাঙ্ক্ষিত পণ্য। কারণ অ্যাপ্লের নিজস্ব ইকোসিস্টেম ও ব্র্যান্ড মূল্য এখনও অনেক গ্রাহকের কাছে বড় আকর্ষণ।
কয়েক মাস ধরে অর্থ সঞ্চয় করে ম্যাকবুক অথবা আইপ্যাড কেনার পরিকল্পনা করছেন? যাঁরা আগামী সপ্তাহে মার্কিন টেক জায়ান্ট সংস্থার পণ্য কিনতে চাইছেন তাদের জন্য দুঃসংবাদ। কারণ বেশ কিছু পণ্য কিনতে হলে ক্রেতাদের জন্য পকেট থেকে খসবে অতিরিক্ত অর্থ। কারণ এক ঝটকায় অ্যাপ্ল তাদের অধিকাংশ পণ্যেরই দাম বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করেছে।
২০২৬ সালে বিশ্ব জুড়ে কৃত্রিম মেধার (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই) তথ্যকেন্দ্র (ডেটা সেন্টার) তৈরির কাজ চলছে তাতে বিপুল পরিমাণ র্যাম ও রমের প্রয়োজন হচ্ছে। অ্যাপ্লের বিভিন্ন পণ্য প্রস্তুত করার জন্য প্রয়োজনীয় এই দুটি যন্ত্রাংশ মহার্ঘ হয়ে উঠছে। আর তাতেই লাভের অঙ্ক কমছে মার্কিন বহুজাতিক সংস্থাটির।
দিন কয়েক আগেই তাদের পণ্যসম্ভারের বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়ার আভাস দিয়েছিল অ্যাপ্ল। সংস্থার সিইও টিম কুক জানিয়েছেন যে অ্যাপ্ল দীর্ঘ দিন ধরে তাদের পণ্যের দাম বৃদ্ধির পথে হাঁটেনি। মেমোরি এবং স্টোরেজ চিপের আকাশছোঁয়া দামের সঙ্গে তাল মেলাতে মূল্যবৃদ্ধি অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে।
অ্যাপ্ল সূত্রে খবর ছিল সম্ভবত প্রথমে ম্যাকবুক ও আইপ্যাডের দাম বাড়বে। পরে আইফোন-সহ অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়াবে নির্মাতা সংস্থা। সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। কোন কোন পণ্যের দাম বাড়ছে তার একটি তালিকা প্রকাশ করেছে অ্যাপ্ল। আসুন দেখে নেওয়া যাক কোন কোন পণ্য কিনতে হলে অতিরিক্ত কত টাকা গাঁট গচ্চা যাবে ক্রেতাদের। এই প্রতিবেদনে রইল তারই হদিস।
অ্যাপ্ল ভারতে তাদের বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়িয়েছে। নতুন দামের তালিকায় ম্যাকবুক, আইপ্যাড, ম্যাক স্টুডিয়ো, ম্যাক মিনি, হোম পড এবং অ্যাপ্ল টিভির মতো পণ্যগুলি অন্তর্ভgক্ত হয়েছে। এই সমস্ত পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে অ্যাপ্ল।
কিছু মডেলের ক্ষেত্রে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৭০,০০০ টাকা পর্যন্ত। বিশেষ করে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বা হাই-এন্ড কনফিগারেশনের যন্ত্রগুলির দাম আগের তুলনায় প্রায় ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছে। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কনফিগারেশনগুলোর ক্ষেত্রে দাম বৃদ্ধির প্রভাব আরও বেশি পড়েছে।
অ্যাপ্লের অন্যতম জনপ্রিয় ডেস্কটপ কম্পিউটার ম্যাক মিনিএম৪ (২৫৬জিবি) মডেলের দাম ভারতে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এর মূল্য প্রায় ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫৯,৯০০ টাকা থেকে বেড়ে ৮২,৯০০ টাকা হয়েছে। ম্যাক মিনি এম৪ প্রো-এরও দামও উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। এই পণ্যটি কিনতে হলে ১,৪৯,৯০০ টাকার বদলে এখন ১,৯৯,৯০০ টাকা দিতে হবে।
অন্য দিকে, ম্যাকবুক এয়ার এম৫-এর দাম ২৯,০০০ টাকা বেড়ে এখন ১ লক্ষ ৪৯ হাজার ৯০০ টাকা থেকে শুরু হচ্ছে। সম্প্রতি লঞ্চ হওয়া ম্যাকবুক নিও-এর দামও বেড়েছে। এর প্রারম্ভিক মূল্য প্রায় ৬৯,৯০০ টাকা থেকে বেড়ে ৭৯,৯০০ টাকা হয়েছে।
অ্যাপ্লের স্মার্ট হোম সংক্রান্ত পণ্যের দামেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। অ্যাপ্ল টিভি ৪কে (৬৪জিবি)-এর দাম এখন ১৪,৯০০ টাকা থেকে বেড়ে ২৫,৯০০ টাকা হয়েছে। সেখানে এর ১২৮ জিবি ভ্যারিয়েন্টের দাম ১৬,৯০০ টাকা থেকে বেড়ে ৩১,৯০০ টাকা হয়েছে।
হোমপড-এর দাম আগের ৩২,৯০০ টাকার পরিবর্তে এখন ৪৪,৯০০ টাকা হয়েছে। অন্য দিকে হোমপড মিনি-র দাম ১০,৯০০ টাকা থেকে বেড়ে ১৫,৯০০ টাকা হয়েছে।
পেশাদার ম্যাকবুক মডেল, ডেস্কটপ ম্যাক এবং প্রিমিয়াম আইপ্যাডগুলির দামবৃদ্ধি সর্বোচ্চ। পেশাদারদের জন্য তৈরি ম্যাক ডিভাইসগুলির দাম বাড়ায় ভিডিয়ো এডিটিং, সফটঅয়্যার ডেভেলপমেন্ট এবং সৃজনশীল কাজের জন্য অ্যাপ্লের পণ্য কেনার খরচ আরও বেড়েছে। একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু সম্পূর্ণ ফিচারযুক্ত ম্যাকবুক প্রো কনফিগারেশন কিনতে এখন আগের চেয়ে প্রায় ১ লক্ষ টাকা বেশি খরচ পড়বে।
সংস্থার অধিকর্তা কুকের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে যন্ত্রাংশের, বিশেষ করে মেমোরি এবং স্টোরেজ চিপের তীব্র মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে বিশ্ব জুড়ে। ফলে ফোন তৈরির খরচ বাড়ছে। ক্ষতির বোঝা আর বহন করতে পারছে না সংস্থা। এমনটাই জানিয়েছেন টিম।
এক সাক্ষাৎকারে অ্যাপ্লের সিইও স্বীকার করে নিয়েছেন, ‘‘মূল্যবৃদ্ধি এড়ানো সম্ভব নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে তা অনিবার্য। এই বিপুল মূল্যবৃদ্ধি প্রশমিত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা হয়েছে। গ্রাহকদের উপর যাতে কোপ না পড়ে তারও চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে লাভের অঙ্ক আর কমাতে পারছে না সংস্থা।’’
চিপ ও মেমোরি কার্ডের সরবরাহকারীদের জন্য অ্যাপ্ল বর্তমানে চাপের মুখে রয়েছে। কারণ বাজারে মজুতের একটি বড় অংশ এআই-ভিত্তিক হার্ডঅয়্যার তৈরির জন্য সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, সংস্থাকে এক দিকে যেমন সরবরাহ সঙ্কটের মোকাবিলা করতে হচ্ছে, অন্য দিকে তেমনই বাড়তে থাকা উৎপাদন খরচের চাপও সামলাতে হচ্ছে।
বিশেষ করে ডির্যাম মেমোরির বাজারে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে, কারণ এই ধরনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মেমোরির চাহিদা এআই সার্ভারের জন্য দ্রুত বাড়ছে। ফলে সাধারণ ইলেকট্রনিক পণ্যের জন্য মেমোরি সরবরাহে টান পড়ছে এবং দামও ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।
অ্যাপ্লের এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অনেক ক্রেতাকেই অবাক করেছে। কারণ, এটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন সংস্থা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির উপর তাদের ভবিষ্যৎ কৌশল আরও জোরদার করছে। প্রযুক্তি শিল্পের বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে এআই যুগের নতুন হার্ডঅয়্যারের চাহিদা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আধুনিক এআই ফিচার চালানোর জন্য আরও শক্তিশালী প্রসেসর, উন্নত মেমোরি এবং বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন ‘কম্পিউটিং আর্কিটেকচারের’ প্রয়োজন হচ্ছে।
এআই-ভিত্তিক কম্পিউটিংয়ের প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি সংস্থাগুলি শক্তিশালী হার্ডঅয়্যারে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে প্রিমিয়াম কম্পিউটার ও স্মার্ট ডিভাইসের দাম আরও বেশি নির্ভর করতে পারে উন্নত প্রসেসিং ক্ষমতা এবং এআই সুবিধার ওপর।
অ্যাপ্ল ভারতে উৎপাদন বাড়ালেও, আমদানি করা উপাদানের খরচ, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, মুদ্রার বিনিময় হার এবং সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধিতে বিশাল উল্লম্ফন ভারতের প্রিমিয়াম কম্পিউটার বাজারে অ্যাপ্লের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই স্পষ্ট হবে বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।