১৫ বছর বয়সে কেরিয়ার শুরু। মডেলিং থেকে নৃত্যজগতে পদার্পণ। ধীরে ধীরে বলিপা়ড়ার প্রথম সারির কোরিয়োগ্রাফার হয়ে ওঠেন গীতা কপূর। ৫২ বছর বয়সেও অবিবাহিতা রয়েছেন। সম্প্রতি শারীরিক চাহিদা এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মন্তব্য করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন গীতা।
১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে মহারাষ্ট্রের মুম্বইয়ের এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম গীতার। ছোটবেলা থেকেই নাচ করতে ভালবাসতেন। কিন্তু নৃত্যশিল্পী হিসাবে পেশা গড়তে কখনও চাননি তিনি। বিমানসেবিকা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন গীতা।
বিমানসেবিকা হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতেও শুরু করেছিলেন গীতা। কিন্তু বাদ সাধে তাঁর দৃষ্টিশক্তি। শৈশব থেকে দৃষ্টিশক্তি দুর্বল ছিল তাঁর। তিন বার বিমানসেবিকার পরীক্ষা দিলেও স্বাস্থ্যপরীক্ষার সময় বাদ পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। অন্য দিকে, সংসারের দায়দায়িত্বও এসে পড়ছিল গীতার কাঁধে।
কলেজে পড়ার সময় ছোট ছোট কাজের প্রস্তাব পেতে শুরু করেন গীতা। ‘জুনিয়র আর্টিস্ট’ হিসাবে কাজ করাও শুরু করেন তিনি। শ্রীদেবীর ‘খুদা গাওয়া’, অনিল কপূরের ‘নায়ক’ ছবিতে অতি গৌণ চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায় গীতাকে।
মাত্র ১৫ বছর বয়সে বলিউডের জনপ্রিয় কোরিয়োগ্রাফার ফরাহ খানের নাচের দলে যোগ দেন গীতা। অভিনয়ের পাশাপাশি চলছিল নাচের তালিমও। কিন্তু ফরাহকে নাকি একসময় হিংসা করতেন গীতা। ফরাহের সঙ্গে গীতার আলাপও হয়েছিল কাকতালীয় ভাবে।
কানাঘুষো শোনা যায়, ফরাহের পারফরম্যান্স দেখে তাঁর নাচের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে গিয়েছিলেন গীতার বাবা। নাচ নিয়ে গীতার বাবা অন্য কোনও নৃত্যশিল্পীর প্রশংসা করছেন জেনে হিংসা হয়েছিল গীতার। কিন্তু ভাগ্যের চাকা গেল ঘুরে।
কিছু দিন পরেই একটি নাচের অনুষ্ঠানে পারফর্ম করার প্রস্তাব পান গীতা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই অনুষ্ঠানে যে নৃত্যশিল্পীর নাচ করার কথা ছিল, তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় গীতার ডাক পড়েছে। গীতাও মনপ্রাণ দিয়ে সেই অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেন। এমনকি, যে শিল্পীর সেই অনুষ্ঠানটি করার কথা ছিল তিনিও গীতার প্রশংসা করেন। তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং ফরাহ।
গীতার নাচ দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে নিজের দলে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন ফরাহ। ১৫ বছর বয়স থেকে ফরাহের সঙ্গে কাজ করতেন গীতা। গীতাকে খুব স্নেহ করতেন ফরাহ। এমনকি, ফরাহের ভাই সাজিদ খানের সঙ্গেও ভাইবোনের মতো সম্পর্ক ছিল গীতার।
২০১৮ সালে একটি নাচের রিয়্যালিটি শোয়ে অতিথি হিসাবে আমন্ত্রিত ছিলেন সাজিদ। সেই শোয়ের বিচারক ছিলেন গীতা। কিশোর বয়স থেকেই পরস্পরকে চেনেন তাঁরা। অনুষ্ঠানে সাজিদ জানিয়েছিলেন যে, দিদির (ফরাহ) সূত্রে গীতার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তাঁর। বহু বার গীতাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন সাজিদ। কিন্তু গীতা প্রতি বার তা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
গীতা পরে জানিয়েছিলেন, সাজিদের সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই ভাইবোনের মতো সম্পর্ক। কিশোর বয়সে সাজিদ তাঁকে মজা করে বলতেন, ‘‘আমাদের মনের কত মিল! একসঙ্গে কত মজা করি! চলো, আমরা বিয়ে করে ফেলি।’’
ফরাহের দলে যোগ দেওয়ার পর ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ ছবির ‘তুঝে ইয়াদ না মেরি আয়ি’ গানটি কোরিয়োগ্রাফ করার সুযোগ পান গীতা। সেই গানে নিজে অভিনয়ও করেন। তার পর ‘দিল সে’ ছবির ‘ছাঁইয়া ছাঁইয়া’-সহ আরও বেশ কিছু ছবিতে কোরিয়োগ্রাফার হিসাবে কাজ করতে শুরু করেন তিনি। বাড়তে থাকে পরিচিতিও।
ফরাহের দলের অংশ হয়ে কাজ করতে আর ভাল লাগছিল না গীতার। বলিউডে নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তুলতে চাইছিলেন তিনি। ফলে ফরাহের দল ছেড়ে বেরিয়ে যান গীতা। কিন্তু বলিপাড়ায় নিজের পরিচয় তৈরি করতে চেনাজানা থাকা প্রয়োজন। তা ছিল না গীতার। তাই আবার ফরাহের দলেই ফিরে যান তিনি।
গীতাকে ফিরিয়ে না দিয়ে বরং কাজের আরও দায়িত্ব দিয়ে দেন ফরাহ। ছবি পরিচালনার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে নাচের দলের বহু দায়িত্বই গীতার কাঁধে এসে পড়ে। সেই সুযোগ হাতছাড়া করেননি গীতা।
‘ম্যায় হুঁ না’, ‘থোড়া প্যার থোড়া ম্যাজিক’, ‘হে বেবি’-র মতো একাধিক হিন্দি ছবির পাশাপাশি বলিউডের নামকরা অন্য প্রযোজনা সংস্থাগুলির ছবিতে কোরিয়োগ্রাফির দায়িত্বও নেন গীতা। রাতারাতি কোরিয়োগ্রাফার হিসাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। কিন্তু গীতা পৌঁছে যেতে চেয়েছিলেন ঘরে ঘরে।
২০০৮ সালে ছোটপর্দার নাচের রিয়্যালিটি শোয়ে প্রথম বার বিচারক হয়ে আসেন গীতা। টেলিভিশনের পর্দায় যাত্রা শুরু হয় গীতার। তার পর বহু রিয়্যালিটি শোয়ে বিচারক হিসাবে দেখা যেতে থাকে গীতা। গীতা হয়ে ওঠেন গীতা মা।
নাচের স্কুলের ফিরোজ নামে এক ছাত্র প্রথম মা বলে সম্বোধন করেন গীতাকে। ফিরোজের কথায়, গীতা মায়েদের মতো যত্ন নিয়ে, স্নেহ করে নাচ শেখাতেন। সেখান থেকেই শুরু। ধীরে ধীরে রিয়্যালিটি শোয়ের মঞ্চে গীতা মা নামেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।
২০১৫ সালে মুম্বইয়ে আইনি মামলায় জড়িয়ে পড়েন গীতা। বিপজ্জনক ভাবে গাড়ি চালিয়ে এক তরুণকে ধাক্কা মারেন তিনি। সেই তরুণকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। চিকিৎসাবাবদ সমস্ত খরচ বহন করতে রাজি ছিলেন গীতা। কিন্তু সেই তরুণ পথচারী গীতার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।
তরুণের অভিযোগের ভিত্তিতে গীতাকে গ্রেফতার করা হয়। গীতার দাবি, বাইক দুর্ঘটনা এড়াতে গিয়ে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন তিনি। ভুলবশত তরুণ পথচারীর গায়ে ধাক্কা লাগে। গীতা নিজেই সেই তরুণকে হাসপাতালে নিয়ে যান। গ্রেফতারির পর জামিনে ছাড়া পেয়ে যান তিনি।
২০২১ সালে সিঁদুর পরে ছবি তুলে সমাজমাধ্যমের পাতায় পোস্ট করেন গীতা। তাঁর পরনে ছিল ঐতিহ্যবাহী পোশাক। অনেকেই ভেবেছিলেন যে, তিনি বিয়ে করেছেন। কিন্তু সেই ধোঁয়াশা পরে নিজেই দূর করেছিলেন গীতা।
গীতা জানান, নাচের রিয়্যালিটি শোয়ে বর্ষীয়ান অভিনেত্রী রেখার উদ্দেশে একটি পর্ব নির্মাণ করা হয়েছিল। যেহেতু সিঁদুর পরে থাকা রেখার সাজের নিজস্ব ধরন (সিগনেচার স্টাইল), তাই রেখাকে শ্রদ্ধা জানাতে সেই সাজের ধরন অনুকরণ করে সিঁদুর পরেছিলেন গীতা।
এক পুরনো সাক্ষাৎকারে গীতা জানিয়েছিলেন, তিনি বহু সম্পর্কে জড়িয়েছেন। কিন্তু তাঁর প্রেমিকেরা কেউ চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে যুক্ত নন। একসময় হাঁটুর বয়সি এক মডেলের সঙ্গেও নাম জড়িয়ে পড়েছিল গীতার।
উঠতি মডেল এবং কোরিয়োগ্রাফার রাজীবের সঙ্গে নাকি সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন গীতা। বিভিন্ন জায়গায় একসঙ্গে দেখা যেত তাঁদের। যদিও সে কথা গুঞ্জন বলে উড়িয়ে দেন গীতা। স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, তাঁরা দু’জন বন্ধু।
সম্প্রতি যৌনচাহিদা নিয়ে মন্তব্য করে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন গীতা। ৫২ বছর বয়স হলেও তিনি এখনও অবিবাহিতা। গীতা এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘‘আমি সাধু-সন্ন্যাসী নই। কুমারীও নই। আমিও সাধারণ মানুষ। এক জন সাধারণ মানুষের মতো আমারও চাওয়া-পাওয়া রয়েছে। শারীরিক চাহিদা পূরণ করে এখনও তৃপ্ত থাকি আমি।’’