Benazir Bhutto and Flight Hijack

‘ম্যাডাম তো ঘুমোচ্ছেন’! বিমান ছিনতাইয়ের ফোন পেয়েও পাত্তা দেননি পাক বিরোধী নেত্রী বেনজির ভুট্টোর চাকর, তার পর..

১৯৯১ সালে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের যাত্রীবোঝাই বিমান ছিনতাই করে পাকিস্তানের বেশ কয়েক জন জঙ্গি। ফলে পণবন্দিদের ছাড়াতে ইসলামাবাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটির এক আধিকারিক। কী ঘটে তার পর?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২৬ ১৭:১১
Share:
০১ ১৯

আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফের মুখ পুড়ল পাকিস্তানের। ভারত ও আফগানিস্তানকে দোষারোপের সময় বিপাকে পড়লেন ইসলামাবাদের এক সাংবাদিক। তাঁর বক্তব্যের পরই নিজের অভিজ্ঞতার উদাহরণ টেনে সেখানকার প্রশাসনকে তুলধোনা করেন সিঙ্গাপুরের সাবেক রাষ্ট্রদূত বিলাহারি কৌশিকান। পাশাপাশি, পাক রাজনীতিবিদদের খোঁচা দিতে ‘সময়ের অপচয়’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করতে শোনা যায় তাঁকে।

০২ ১৯

চলতি বছরের ৩ জুলাই একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ভাষণ দেন এক পাক সাংবাদিক। সেখানে তিনি বলেন, ইসলামাবাদের অধিকাংশ সমস্যার নেপথ্যে রয়েছে ভারত এবং আফগানিস্তান সীমান্ত। এর পর বলতে ওঠেন কৌশিকান। ১৯৯১ সালের বিমান ছিনতাইয়ের প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। বলেন, ‘‘রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সেনাকর্তাদের অদূরদর্শিতার কারণেই চরম অব্যবস্থার মুখে পড়েছে পাকিস্তান।’’

Advertisement
০৩ ১৯

কৌশিকানের কথায়, ‘‘আজকের সঙ্কটের জন্য ইসলামাবাদ নিজেই দায়ী। যাবতীয় ব্যর্থতার জন্য অন্যকে দোষ দেওয়া অনুচিত। আমি বলব, পাকিস্তানের সমস্যাগুলির নেপথ্যে সবচেয়ে বড় হাত রয়েছে তাঁদের ফৌজের। আর ওখানকার রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে কিছু না বলাই ভাল। তাঁদের সঙ্গে কথা বলা সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই নয়।’’

০৪ ১৯

১৯৯১ সালের ২৬ মার্চ মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের এসকিউ১১৭টি বিমানটি ছিনতাই করে চার পাক জঙ্গি। উড়োজাহাজটি আকাশে উড়তেই নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা। ফলে বাধ্য হয়ে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরে অবতরণ করে সেটি। শুধু তা-ই নয় জঙ্গিদের হাতে পণবন্দি হয় বিমানে থাকা ১১৪ জন যাত্রী এবং ১১ জন ক্রু সদস্য।

০৫ ১৯

অবতরণের পর মদ ঢেলে বিমানে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার লাগাতার হুমকি দিতে থাকে চার পাক সন্ত্রাসবাদী। ওই সময় বিদেশ মন্ত্রকের দুঁদে অফিসার কৌশিকানকে তাঁদের সঙ্গে কথা বলার দায়িত্ব দেয় সিঙ্গাপুর সরকার। একসময় রাশিয়া এবং ফিনল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত ছিলেন তিনি। ফলে এ সব বিষয়ে চোখ বুজে তাঁর উপর ভরসা করেছিল প্রশাসন। অনেকে বলেন, জটিল পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ হাসিলের সহজাত দক্ষতা রয়েছে কৌশিকানের।

০৬ ১৯

কৌশিকান জানিয়েছেন, জঙ্গিদের কেউই পাকা মাথার না হওয়ায় গোড়াতেই একটা মস্ত ভুল করে বসে তারা। আর তাই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলে বিমানবন্দরের যে এলাকা সর্বাধিক প্রস্তুত থাকে, উড়োজাহাজটিকে সেখানে দাঁড় করাতে সক্ষম হয় সিঙ্গাপুর প্রশাসন। ফলে পণবন্দি যাত্রীদের সঙ্গে কী রকম ব্যবহার করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত।

০৭ ১৯

অবতরণের নিরিখে সুবিধা হলেও জঙ্গিদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে যথেষ্ট সমস্যার মুখে পড়েন কৌশিকান। পণবন্দিদের ছাড়াতে জঙ্গিদের দাবি-দাওয়া নিয়েও তৈরি হয় ধোঁয়াশা। কারণ, তারা পাকিস্তান পিপ্‌লস পার্টির (পিপিপি) নেত্রী বেনজির ভুট্টোর সঙ্গে কথা বলতে চাইছিল, যাঁকে দু’দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসাবে পেয়েছে ইসলামাবাদ। যদিও ছিনতাইকাণ্ডের সময় ক্ষমতার বাইরে ছিলেন বেনজির।

০৮ ১৯

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে তখন নওয়াজ় শরিফ। অন্য দিকে, রাজধানী ইসলামাবাদ ছেড়ে সিন্ধ প্রদেশের পারিবারিক এস্টেট চলে গিয়েছেন বেনজির। ফলে পণবন্দিদের সুরক্ষায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে বিপাকে পড়েন কৌশিকান। তড়িঘড়ি পাক হাই কমিশনে যোগাযোগ করেন তিনি। পরে তাঁদের সাহায্যে ভুট্টোর বাসভবনের ঠিকানা ও ফোন নম্বর জোগাড় করতে সক্ষম হন সিঙ্গাপুরের সাবেক রাষ্ট্রদূত।

০৯ ১৯

কৌশিকানের কথায়, ‘‘এই প্রক্রিয়া শেষ করতে রাত ৩টে বেজে গিয়েছিল। কিন্তু, তখন আর কোনও কিছুই ভাবার সময় ছিল না। আমরা সঙ্গে সঙ্গে বেনজিরের সিন্ধের এস্টেটে ফোন করি। কিন্তু, কথা বলা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, ম্যাডাম ভুট্টোর বাড়ির সকলে উর্দুতে কথা বলছিলেন। আর আমাদের দলে ওই ভাষা জানে এমন কেউই ছিলেন না। শেষ এক জনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তিনি ইংরেজি জানতেন।’’

১০ ১৯

সিঙ্গাপুরের সাবেক রাষ্ট্রদূতের দাবি, ওই ব্যক্তি সম্ভবত বেনজিরের বাড়ির চাকর ছিলেন। তাঁকে গোটা পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু, সব শুনেও বিস্ময়কর মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, ‘‘ম্যাডাম তো এখন ঘুমোচ্ছেন, তাঁকে বিরক্ত করা যাবে না।’’ এর পর কোনও কিছু না বলেই সটান ফোন কেটে দেন সংশ্লিষ্ট পরিচারক।

১১ ১৯

আন্তর্জাতিক সম্মেলনে কৌশিকান বলেন, ‘‘আমি অন্তত তিন বার তাঁকে ঘটনার ভয়াবহ পরিণাম বোঝানোর চেষ্টা করি। বলি, ছিনতাইকারী জঙ্গিরা বেনজিরের সঙ্গে কথা বলতে চাইছে। সেটা না হলে সমস্ত যাত্রীকে এক এক করে হত্যা করবে তারা। ১২৫ জনের জীবন আপনার উপর নির্ভর করছে। তার পরেও ওই ব্যক্তির মন গলেনি। উল্টে এক তরফা ভাবে ফোনের রিসিভার নামিয়ে দেন তিনি।’’

১২ ১৯

সাবেক পাক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে না পারায় ওই বিমানে কমান্ডো অপারেশন চালায় সিঙ্গাপুর। রাতের অন্ধকারে বিস্ফোরণে দরজা উড়িয়ে উড়োজাহাজটির ভিতরে ঢোকে সেই বাহিনী। এর পর এক এক করে ছিনতাইকারী জঙ্গিদের নিকেশ করা হয়। সমস্ত যাত্রী ও ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করা সম্ভব হয় নিরাপদে।

১৩ ১৯

এই ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই স্থানীয় গণমাধ্যমগুলিতে প্রকাশিত হয় একাধিক বিস্ফোরক প্রতিবেদন। সেখানে নিহত জঙ্গিদের ভুট্টোর দল পিপিপি-র সদস্য বলে উল্লেখ করা হয়। পাকিস্তানে জেলবন্দি কয়েক জনের মুক্তির উদ্দেশ্য সিঙ্গাপুরের বিমানটি ছিনতাই করে তারা। যদিও সরকারি ভাবে বেনজির বা ইসলামাবাদ কখনওই সে কথা স্বীকার করেনি।

১৪ ১৯

দেশভাগের পর থেকে পাক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে থাকে ভুট্টো পরিবার। ১৯৫৮ সালে প্রথম বার সেনাশাসনে যায় ইসলামাবাদ। ওই সময় পশ্চিমের প্রতিবেশীর প্রেসিডেন্ট হন ফিল্ড মার্শাল আয়ুব খান। বিদেশ মন্ত্রকের দায়িত্ব জ়ুলফিকার আলি ভুট্টোকে দেন তিনি। সম্পর্কে তিনি ছিলেন বেনজিরের বাবা।

১৫ ১৯

১৯৬৭ সালে পাকিস্তান পিপল্‌স পার্টি (পিপিপি) নামের একটি রাজনৈতিক দল তৈরি করেন জ়ুলফিকার আলি ভুট্টো। ১৯৭১-’৭৩ সাল পর্যন্ত দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। এর পর সংবিধান বদলে ছিনিয়ে নেন প্রধানমন্ত্রীর কুর্সি। ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে ভাল ফল করে তাঁর দল পিপিপি। ফলে দ্বিতীয় বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তিনি। তবে কিছু দিনের মধ্যেই সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করেন জেনারেল জিয়াউল হক।

১৬ ১৯

১৯৭৯ সালে সামরিক আদালতের রায়ে জ়ুলফিকারকে ফাঁসিতে ঝোলায় জেনারেল জিয়ার প্রশাসন। বাবার মৃত্যুর পর পিপিপির নেতৃত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন বেনজির। তাঁকে সামনে রেখেই ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে বাজিমাত করে পাকিস্তান পিপল্‌স পার্টি। ফলে দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন হার্ভার্ড ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। যদিও মাত্র দু’বছরের মাথায় বরখাস্ত হতে হয় তাঁকে।

১৭ ১৯

১৯৯৩-’৯৬ পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বেনজির। ১৯৯৭ সালের ভোটে হেরে যান জ়ুলফি-কন্যা। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে সুইৎজ়ারল্যান্ডের একটি প্রতিষ্ঠানের থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ। এর পর আট বছর স্বেচ্ছা নির্বাসন কাটিয়ে ২০০৭ সালের অক্টোবরে ফের পাকিস্তানে ফেরেন বেনজির ভুট্টো। ওই বছরই রাওয়ালপিন্ডিতে একটি নির্বাচনী জনসভায় আত্মঘাতী বিস্ফোরণে মৃত্যু হয় তাঁর।

১৮ ১৯

পাকিস্তানের রাজনীতিতে বেনজিরের অবদান নিয়ে দুনিয়া জুড়ে যথেষ্ট চর্চা হয়েছে। বর্তমানে ইসলামাবাদের প্রেসিডেন্ট তাঁরই স্বামী আসিফ আলি জ়ারদারি। অন্য দিকে, মায়ের মৃত্যুর পর থেকে পিপিপির চেয়ারপার্সনের পদ সামলাচ্ছেন বিলাবল ভুট্টো জ়ারদারি। ২০২২-’২৩ এই সময়কালে দেশের বিদেশমন্ত্রীও ছিলেন তিনি।

১৯ ১৯

যদিও পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে খুব একটা সম্মান দেখাননি সিঙ্গাপুরের সাবেক রাষ্ট্রদূত। তাঁর কথায়, ‘‘বিমান ছিনতাই-কাণ্ডে ইসলামাবাদের সামন্ততান্ত্রিক প্রকৃতি বেআব্রু হয়ে গিয়েছিল। সেখানকার অভিজাত সমাজের সঙ্গে কারও কথা বলার সাহস নেই। তা হলেই মাথা কাটা যেতে পারে নিম্নবর্গীয়দের।’’

ছবি: সংগৃহীত, প্রতীকী ও এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement