‘দিদি নম্বর ওয়ান’ থেকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম ভরসার পাত্রী। তৃণমূলের টিকিটে হুগলি লোকসভায় জিতে সংসদ-যাত্রা। তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদের শিবিরে ভিড়েছেন সেই রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। মঙ্গলবার লোকসভার সচিবালয়ে ‘হাজিরা’ দিয়েছিলেন তিনি। লোকসভার সচিব উৎপলকুমার সিংহের সঙ্গে দেখা করে অভিনেত্রী-নেত্রী নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন বলেও ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (এনসিপিআই)-র ছাতার তলায় আসা বিদ্রোহী সাংসদ গোষ্ঠীর একটি সূত্র জানিয়েছে।
লোকসভার সচিবের সঙ্গে সাক্ষাতের পর রচনা বলেন, ‘‘দিদির সঙ্গে আমার পুরনো সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক অটুট থাকবে। সবাই বলেন, দিদি মানেই তৃণমূল। ঠিকই। তাঁকে দেখেই মানুষ ভোট দেন। কিন্তু আমায় মানুষ ভোট দিয়েছেন তার কারণ আমি চিত্রতারকা বলে নয়। আমায় মানুষ ভোট দিয়েছেন কাজ করার জন্য। যে কাজ গত ১৫ বছরে হয়নি। কাজ করার জন্য কেন্দ্রের সমর্থন দরকার। সেটা খুব জরুরি।’’
গত রবিবার সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়ি এবং স্পিকার ওম বিড়লার বাসভবনে বৈঠকের পরে তৃণমূলের বিদ্রোহী ব্লকের সাংসদেরা জানিয়েছিলেন, এনসিপিআই-এ যোগ দিচ্ছেন তাঁরা। কিন্তু সেই দলে প্রথমে ছিলেন না রচনা। সূত্রের খবর, মঙ্গলবার লোকসভার সচিবের দফতরে গিয়ে হুগলির সাংসদ জানিয়ে এসেছেন, দলত্যাগী ২০ জন তৃণমূল সাংসদের তালিকায় তিনিও রয়েছেন। সূত্রের খবর, মঙ্গলবার ভূপেন্দ্র এবং বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবের সঙ্গে পৃথক ভাবে সাক্ষাৎ করেন রচনা।
কিন্তু মাত্র বছর দুয়েক আগে তৃণমূলের লোকসভার প্রার্থী হওয়া থেকে দলের বিদ্রোহী সাংসদদের শিবিরকে সমর্থন। কোন পথে এগিয়েছে রচনার রাজনৈতিক যাত্রাপথ? তাঁর ব্যক্তিগত জীবনই বা কী রকম ছিল? বড়পর্দা থেকে ছোটপর্দা, বিনোদন জগতে রচনা ‘দিদি নম্বর ওয়ান’। রচনার আসল নাম ঝুমঝুম বন্দ্যোপাধ্যায়। নব্বইয়ের দশকে তাঁর মাথায় তখন সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার জয়ের মুকুট। ওড়িয়া, বাংলা ছবির পাশাপাশি হিন্দি, তেলুগু, তামিল এবং কন্নড় ছবিতেও অভিনয় করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।
বাংলা ছবিতে অভিনয় শুরুর আগেই ওড়িয়া ফিল্মজগতে আত্মপ্রকাশ করেন রচনা। ১৯৯২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সাগর গঙ্গা’ ছবিতে প্রথম অভিনয় তাঁর। ১৯৯৩ সালে ‘দান প্রতিদান’ ছবির মাধ্যমে বাংলার সিনেমাজগতে পা রাখেন। তখনও অবশ্য ঝুমঝুম নামেই পরিচিত ছিলেন তিনি। নব্বইয়ের দশকে প্রথম সারির অভিনেত্রীর তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলেছিলেন রচনা। ১৯৯৯ সালে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘সূর্যবংশম’। মুখ্যচরিত্রে, দ্বৈতচরিত্রে অমিতাভ বচ্চন। রচনার কেরিয়ারের প্রথম হিন্দি ছবি। তার পর আর কোনও হিন্দি ছবিতে অভিনয় করতে দেখা যায়নি তাঁকে।
টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বড়পর্দায় জুটি বেঁধে সবচেয়ে বেশি অভিনয় করেছেন রচনা। টলিপাড়া সূত্রে খবর, মোট ৩৫টি বাংলা ছবিতে একসঙ্গে অভিনয় করেছেন রচনা এবং প্রসেনজিৎ। ৪০টির বেশি ওড়িয়া ছবিতে সিদ্ধান্ত মহাপাত্রের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করেছেন রচনা। পরে অবশ্য সহ-অভিনেতার সঙ্গেই সাত পাকে বাঁধা পড়েন তিনি। কিন্তু সেই বিয়ে টেকেনি।
২০০৪ সালে সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয় রচনার। অভিনয়ের পাশাপাশি সিদ্ধান্তের সঙ্গে যোগ রয়েছে রাজনীতিরও। ২০০৯ সালে নবীন পট্টনায়েকের বিজু জনতা দলে (বিজেডি) যোগ দিয়েছিলেন সিদ্ধান্ত। ২০০৯ এবং ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে ওড়িশার ব্রহ্মপুর থেকে জিতে সাংসদ হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পরে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। ২০২৪-এর ওড়িশার বিধানসভা ভোটে সিদ্ধান্তকে প্রার্থী করেছিল পদ্মশিবির। বাংলার পড়শি রাজ্যের বিধানসভা ভোটে দিগাপাহান্ডি আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন সিদ্ধান্ত।
সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিচ্ছেদের তিন বছর পর ২০০৭ সালে প্রবাল বসুর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন রচনা। পুত্রসন্তানের জন্ম দেন অভিনেত্রী। টলিপাড়া সূত্রে খবর, দু’জনের সম্পর্কের বনিবনা হয়নি। আলাদা থাকলেও এখনও বিবাহবিচ্ছিন্না নন অভিনেত্রী। বড়পর্দার অভিনেত্রী জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন ছোটপর্দাতেও। ‘দিদি নম্বর ওয়ান’ রিয়্যালিটি শোয়ের সঞ্চালনা শুরু করেন রচনা। বাঙালির ঘরে ঘরে ‘দিদি নম্বর ওয়ান’ খুঁজতে গিয়ে তিনি নিজেও হয়ে ওঠেন ‘দিদি নম্বর ওয়ান’।
লোকসভা নির্বাচনের কয়েক মাস আগে রচনা নবান্নে গিয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করতে। তার পরে জানা যায়, তাঁর রিয়্যালিটি শোয়ে অতিথি হয়ে উপস্থিত হবেন মমতা। সেই আমন্ত্রণ জানাতেই রচনা রাজ্য সরকারের সচিবালয়ে গিয়েছিলেন। মার্চ মাসের গোড়ায় শোয়ের বিশেষ পর্বের অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন মমতা। লোকসভা ভোটের প্রাক্কালে ‘দিদি নম্বর ওয়ান’ অনুষ্ঠানে মমতার উপস্থিতির ফলে অনেকেই অনুমান করছিলেন, রচনাকে বাংলার কোনও না কোনও আসনে প্রার্থী করতে পারেন মমতা। হয়েছিলও তাই।
ব্রিগেডের সভা থেকে ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের রাজ্যের ৪২টি আসনের প্রার্থী ঘোষণা করেছিলেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিষেক জানান, এ বছর লোকসভা নির্বাচনে হুগলি আসনে তৃণমূলের হয়ে লড়বেন রচনা। লোকসভা নির্বাচনে হুগলিতে তৃণমূলের রচনার বিরুদ্ধে বিজেপির প্রার্থী ছিলেন তাঁর একসময়ের সহ-অভিনেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায়। অভিনয় জগতের দুই অভিনেত্রী ভোটযুদ্ধে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছিলেন। তবে বিজেপি প্রার্থী লকেটের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর বলে দাবি করেছিলেন রচনা। দু’জনের সুসম্পর্কের কথা মানেন লকেটও।
হুগলির তৃণমূল প্রার্থী হিসাবে প্রচারে নেমে চারদিকে নাকি ‘শুধু ধোঁয়াই ধোঁয়া’ দেখতে পেয়েছিলেন রচনা। প্রচারে বেরিয়ে বলছেন, ‘‘মেয়েরা চাইলে সব করতে পারে। ‘দিদি নম্বর ওয়ান’ও চলবে, রাজনীতিও হবে। সব কিছু হবে।’’ অনেক কিছু ‘হওয়া’র আগে অবশ্য বার বার ভাইরাল হয়েছেন তিনি। প্রচারের চতুর্থ দিনে বলেছিলেন— চতুর্দিকে ‘শুধুই ধোঁয়া’। ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।
অভিনেত্রী-নেত্রী রচনাকে হুগলির বন্ধ কারখানা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমি যখন এলাম তখন তো দেখলাম অনেক কারখানা হয়েছে। চিমনি থেকে শুধু ধোঁয়াই ধোঁয়া। অন্ধকার রাস্তাঘাট। শুধু ধোঁয়াই বেরোচ্ছে। এত কারখানা হয়েছে। তা হলে কী করে বলছেন যে, কারখানা হয়নি। কারখানা তো হচ্ছে।’’ আরও কারখানা হবে এমন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন তিনি। এই মন্তব্যের পরেই সমাজমাধ্যমে তাঁর ‘মিম’ ছড়িয়ে পড়ে। কটাক্ষ ধেয়ে আসে তাঁর ‘ধোঁয়া ধোঁয়া’ মন্তব্য ঘিরে।
এ ছাড়াও কখনও ঘুঘনি, কখনও দই, কখনও মিড-ডে মিলের খাবার— মজার মজার মন্তব্য করে ভাইরাল হন রচনা। সমাজমাধ্যমে হইচই পড়ে। মিমের বন্যা বয়ে যায়। একাংশের মতে, ‘নেত্রীসুলভ’ আচরণের চেয়ে ‘নায়িকাসুলভ’ হাবভাব বেশি ছিল রচনার। সঞ্চালনার দৌলতে যথেষ্ট পরিচিত মুখ ছিলেন রচনা। এর পর লোকসভা ভোটের ফলাফলে দেখা যায় লকেটকে হারিয়ে জিতেছেন রচনা। সাংসদ হয়ে দিল্লির রাজনীতিতে পা রাখেন তিনি।
তবে তার পরেও বিতর্ক পিছু ছাড়েনি রচনার। বার বার খবরে থেকেছেন তিনি। ২০২৪ সালে বাংলায় বন্যা পরিস্থিতির জন্য মমতার মতো ডিভিসি-কে দায়ী করেন হুগলির তৃণমূল সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে দোষারোপ করতে গিয়ে একক গুলিয়ে ফেলেন তিনি। তৃণমূলের তারকা-সাংসদ গম্ভীর ভাবে বলেন, ‘‘কুইন্টাল কুইন্টাল জল বেরিয়ে আসছে। মানুষের বাড়িঘর কিচ্ছু নেই! সবাই রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছেন। আর ওরা (ডিভিসি) বলছে, জানিয়ে পাঠিয়েছে!’’ এ নিয়ে বিজেপির তরফে কটাক্ষও শুনতে হয় তাঁকে।
আরজি কর-কাণ্ডের সময় এক ভিডিয়োবার্তায় পাশে থাকার কথা জানিয়েছিলেন অভিনেত্রী। নির্যাতিতা চিকিৎসকের কথা বলতে গিয়ে বার বার চোখ ভিজে গিয়েছিল তাঁর। সে বারও কটাক্ষ ধেয়ে এসেছিল। কেউ কেউ তাঁর চোখের জলকে ‘কুম্ভীরাশ্রু’ বলে তোপ দাগেন।
এ ছাড়াও চুঁচুড়ার প্রাক্তন বিধায়ক অসিত মজুমদারের সঙ্গে এক প্রকার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন রচনা। বিতর্কের সূত্রপাত সাংসদ তহবিলের টাকায় বাণীমন্দির স্কুলে স্মার্ট ক্লাসরুম তৈরি নিয়ে। অভিযোগ উঠেছিল, সেই ক্লাসরুম নিয়ে স্কুলে গিয়ে ঝামেলা করেন অসিত। এমনকি, স্কুলের শিক্ষিকাদের গালিগালাজ করার অভিযোগও ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এর পর ওই স্কুল পরিদর্শনে যান রচনা। তাঁর কাছে বিধায়কের আচরণ নিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন শিক্ষিকারা। তার পরেই রচনা প্রকাশ্যে মুখ খোলেন দলের বিধায়কের বিরুদ্ধে। রচনার আচরণ নিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে নালিশ করেন বলেও জানিয়েছিলেন চুঁচুড়ার প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক অসিত।
এর পর বাংলায় সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের সময় বিভিন্ন প্রার্থীর হয়ে প্রচার করতে দেখা গিয়েছিল রচনাকে। কিন্তু ৪ মে নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর রাজ্যে গেরুয়া ঝড় শুরু হলে কয়েক দিন চুপচাপ ছিলেন রচনা।
এর মধ্যেই আইনি গেরোয় ফাঁসেন অভিনেত্রী। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, আরজি কর আন্দোলনের সময় তিনি নাকি সমাজমাধ্যমে একাধিক বার মৃতা তরুণী চিকিৎসকের নাম প্রকাশ্যে এনেছিলেন। সেই ঘটনা সামনে রেখে তাঁর বিরুদ্ধে চারু মার্কেট থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন জনৈক আইনজীবী।
বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের শোচনীয় পর্যায়ের পর দলের মধ্যে ভাঙন ধরেছে। বিধানসভার পাশাপাশি সংসদীয় রাজনীতিতেও তার প্রভাব পড়েছে। তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদেরা যোগ দিয়েছেন এনসিপিআই নামের দলে। তখনই জল্পনা শুরু হয়েছিল রচনার অবস্থান নিয়ে। কিন্তু দেখা গেল, বিদ্রোহী সাংসদদের জোটকেই সমর্থন জানিয়েছেন ‘দিদি নম্বর ওয়ান’।