Jyotipriya Mallick

মতুয়া ভোটব্যাঙ্কে ভর করে উত্থান, মন্ত্রী হয়েই নানা অভিযোগে বিদ্ধ! কী ভাবে তৃণমূলের দাপুটে নেতা হয়ে ওঠেন বালু?

বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের দেড় মাসের মাথায় তৃণমূলের সমস্ত দলীয় পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন রাজ্যের সাবেক মন্ত্রী তথা উত্তর ২৪ পরগনার দাপুটে নেতা জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ওরফে বালু। ফলে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২১ জুন ২০২৬ ০৭:৪৪
Share:
০১ ১৮

তৃণমূলের সমস্ত পদ থেকে ইস্তফা দিলেন উত্তর ২৪ পরগনার দাপুটে নেতা জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। ঘাসফুল জমানায় খাদ্য ও বনমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ‘ঘনিষ্ঠ’ বালু। পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শারীরিক অসুস্থতার কথা বলতে শোনা গিয়েছে তাঁকে। ফলে পাকাপাকি ভাবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ইতি পড়ল কি না, তা নিয়ে তুঙ্গে উঠেছে জল্পনা।

০২ ১৮

চলতি বছরের ১৯ জুন, শুক্রবার তৃণমূলের পদ ছাড়ার কথা ঘোষণা করেন রাজ্যের সাবেক মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয়। পরে এ প্রসঙ্গে বালু বলেন, ‘‘আমার রক্তে শর্করার মাত্রা ৩৫০-র উপর চলে গিয়েছে। কিডনিও খারাপ। এই অবস্থায় দলীয় কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারছি না। তাই পদ আঁকড়ে থাকতে রাজি নই।’’ ইতিমধ্যেই দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠি দিয়ে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন তিনি।

Advertisement
০৩ ১৮

১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তৃণমূলের সঙ্গে ছিলেন বালু। ২০০১ সালে গাইঘাটা থেকে জিতে প্রথম বার বিধায়ক হন জ্যোতিপ্রিয়। রাজ্যে তখন বাম শাসনের রমরমা। রাজনৈতিক মহলে ‘লালদুর্গ’ হিসাবেই পরিচিতি ছিল উত্তর ২৪ পরগনার। ফলে ভোটের ময়দানে পা দিয়েই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন তিনি। সেটা সসম্মানে টপকে যাওয়ায় আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। দলের অন্দরেও বৃদ্ধি পায় গুরুত্ব।

০৪ ১৮

উত্তর ২৪ পরগনার রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হল মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক। গাইঘাটার ঠাকুরনগরকে তার ‘এপিসেন্টার’ বললে অত্যুক্তি হবে না। বিধায়ক হয়েই এই সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে থাকেন জ্যোতিপ্রিয়। পরবর্তী কালে মতুয়াদের ‘বড়মা’ হিসাবে পরিচিত প্রয়াত বীণাপাণি দেবীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে মমতার। পর্যবেক্ষকদের দাবি, সেই সেতুবন্ধনের নেপথ্য কারিগর ছিলেন বালু।

০৫ ১৮

২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জ্যোতিপ্রিয়ের পরামর্শ মেনে গাইঘাটায় বীণাপাণি দেবীর দ্বিতীয় পুত্র মঞ্জুলকৃষ্ণ ঠাকুরকে টিকিট দেন মমতা। অন্য দিকে হাবড়ায় সরে যান জ্যোতিপ্রিয়। সবাইকে অবাক করে দিয়ে দু’টি কেন্দ্রেই জেতে তৃণমূল। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, ওই বছরই ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসে জোড়াফুল শিবির। মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা।

০৬ ১৮

তৃণমূল কুর্সি পেলে জ্যোতিপ্রিয় যে মন্ত্রী হবেন, তা একরকম প্রত্যাশিতই ছিল। প্রথম বার সরকার গঠন করে বালুর কাঁধে খাদ্য দফতরের গুরুদায়িত্ব তুলে দেন মমতা। পাশাপাশি, দলীয় সংগঠন মজবুত রাখতে উত্তর ২৪ পরগনার জেলা সভাপতিও ছিলেন তিনি। ২০১৬ ও ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে হাবড়া থেকে পুনর্নির্বাচিত হন জ্যোতিপ্রিয়। এই সময়কালে তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ার মধ্যগগনে বলা যেতে পারে।

০৭ ১৮

২০২১ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর খাদ্যমন্ত্রী ছিলেন বালু। এর পর সেখান থেকে তাঁকে সরিয়ে বন দফতরের দায়িত্ব দেন মমতা। পর্যবেক্ষকদের দাবি, জ্যোতিপ্রিয়ের ‘খারাপ’ সময়ের সূচনা হয় ২০১৯ সালে। ওই সময় তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় ‘বড়মা’ বীণাপাণি দেবীর জ্যেষ্ঠ পুত্র শান্তনু ঠাকুরের। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ঘাসফুল শিবিরের মতুয়া ভোটব্যাঙ্কে থাবা বসায় বিজেপি। ভাঙন ধরে ‘বড়মা’র পরিবারেও।

০৮ ১৮

’১৯-র লোকসভা ভোটে বনগাঁ থেকে জিতে সংসদে যান বীণাপাণি দেবীর জ্যেষ্ঠ পুত্র শান্তনু ঠাকুর। শুধু তা-ই নয়, নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রিসভাতেও জায়গা পান তিনি। কুর্সি মিলতেই একাধিক ইস্যুতে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে নিশানা করেন শান্তনু। বালুর বিরুদ্ধে তোলেন দুর্নীতির অভিযোগও। পরবর্তী বছরগুলিতে গাইঘাটা ও বনগাঁর মতো মতুয়া-প্রধান এলাকাগুলিতে কিছুটা ছন্নছাড়া হয়ে যায় তৃণমূলের সংগঠন।

০৯ ১৮

এই পরিস্থিতিতে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোলে’ আসরে নামেন স্বয়ং মমতা। জেলার একাধিক সাংগঠনিক পদ থেকে বালুকে সরিয়ে দেন তিনি। এর পর ’২১-এর বিধানসভা ভোটে জিতেও স্বমহিমায় ফিরতে পারেননি বালু। ২০২৩ সালের অক্টোবরে রেশন দুর্নীতি মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি। ফলে প্রায় ১৪ মাস বিচারাধীন বন্দি হিসাবে জেলে থাকতে হয় তাঁকে।

১০ ১৮

উল্লেখ্য, বালুর বিরুদ্ধে শুধুমাত্র রেশন বণ্টনে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, এমনটা নয়। বনমন্ত্রী থাকাকালীনও বহু ‘কারচুপি’র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। এর মধ্যে অন্যতম হল উত্তরবঙ্গের জঙ্গলের জমি দখল করে ব্যবসা, কাঠ পাচার এবং চিড়িয়াখানার পশুদের জন্য বরাদ্দ থাকা খাবারের বরাতে আর্থিক তছরুপ। এই নিয়ে হাই কোর্টে দায়ের হয় মামলা। ফলে আরও বিপাকে পড়েন উত্তর ২৪ পরগনার এই দাপুটে নেতা।

১১ ১৮

গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই বার বার জামিনের আবেদন করতে থাকেন জ্যোতিপ্রিয়। এই নিয়ে সওয়াল-জবাবের সময় পাল্টা বালুকে ‘দুর্নীতির গঙ্গাসাগর’ ও ‘রিংমাস্টার’ বলে উল্লেখ করেন ইডির আইনজীবীরা। গত বছর (২০২৫ সাল) জামিন মঞ্জুর হয় তাঁর। জেল থেকে মুক্তি পেলেও গা থেকে এখনও দুর্নীতির কাদা মুছে ফেলতে পারেননি তিনি।

১২ ১৮

ইডির হাতে গ্রেফতার হলেও জ্যোতিপ্রিয়ের উপর ভরসা হারাননি মমতা। এ বছরের বিধানসভা ভোটে ফের হাবড়া থেকে তাঁকে প্রার্থী করেন তৃণমূল সুপ্রিমো। প্রচারে গিয়ে দেন দরাজ শংসাপত্রও। ওই সময় মঞ্চ থেকে দলনেত্রী বলেন, ‘‘আমার সরকারে বালু যত ভাল কাজ করেছে, তা কেউ করতে পারেনি। সিপিএমের চুরি-ডাকাতি ও ধরছিল। তাই বিজেপিকে দিয়ে ওকে জেলে পোরা হয়। ওর দুর্নীতির কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’’

১৩ ১৮

মমতার এই প্রচারেও চিঁড়ে ভেজেনি। এ বারের ভোটে হাবড়ায় বিজেপির দেবদাস মণ্ডলের কাছে ৩১,৪৬২ ভোটের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হন বালু। গণনাকেন্দ্র থেকে বেরোনোর সময় তাঁকে ঘিরে ওঠে চোর স্লোগান। প্রসঙ্গত, গত ৪ মে ফলঘোষণার পর থেকেই সক্রিয় রাজনীতিতে আর সে ভাবে দেখা যায়নি জ্যোতিপ্রিয়কে।

১৪ ১৮

বনমন্ত্রী থাকাকালীন আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিবিহীন সম্পত্তি মামলায় নাম জড়ায় জ্যোতিপ্রিয়ের। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে দায়ের করা হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর অস্থাবর সম্পত্তির বাজারমূল্য ছিল মোট ৩ কোটি ৯৩ লক্ষ টাকা। এ ছাড়া ২ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পত্তি ছিল তাঁর স্ত্রীর। ওই সময় জমি-জমা ও বাড়ি সবই ছিল বালু-ঘরনির নামে। বর্তমানে সেটা কিছুটা কমেছে বলে জানা গিয়েছে।

১৫ ১৮

এ বছরের নির্বাচনী হলফনামায় জ্যোতিপ্রিয় জানিয়েছেন, তাঁর মোট ১ কোটি ৬৬ লক্ষ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। স্থাবর সম্পত্তির অঙ্ক ৩১ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে কলকাতায় আমহার্স্ট স্ট্রিট থানা এলাকায় তাঁর নামে দু’টি ফ্ল্যাট রয়েছে। হলফনামা অনুযায়ী, ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষে বালুর বার্ষিক আয় ছিল ৩৮ লক্ষ ২৯ হাজার টাকা। তার আগের চারটি আর্থিক বছরে তা ছিল যথাক্রমে ২৩ লক্ষ ৫৬ হাজার টাকা, ২১ লক্ষ ৭৯ হাজার টাকা, ২৩ লক্ষ ৬৮ হাজার টাকা এবং ৩৮ লক্ষ ৪৯ হাজার টাকা।

১৬ ১৮

এ বছর ৪ এপ্রিল হলফনামা জমা দেওয়ার সময় হাতে নগদ ২৪ হাজার টাকা রয়েছে বলে জানান জ্যোতিপ্রিয়। তাঁর ৯টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং ১১টি টার্ম ডিপোজ়িট রয়েছে। ডাকঘর ও শেয়ারেও লগ্নি করেছেন বালু। প্রাক্তন মন্ত্রীর একটি গাড়ি আছে, যার বাজারমূল্য ৭ লক্ষ ৩৩ হাজার টাকা বলে হলফনামায় উল্লেখ করেন তিনি। এ ছাড়া ২ লক্ষ ২০ হাজার টাকা মূল্যের চারটি আংটি আছে তাঁর।

১৭ ১৮

হলফনামা অনুযায়ী, ৬৬ লক্ষ ৬১ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পত্তি আছে বালু-ঘরনির। তাঁর স্থাবর সম্পত্তির বাজারমূল্য ৪০ লক্ষ টাকা। স্ত্রীর নামে একটি গাড়ি রয়েছে। সেটির দাম ৯ লক্ষ ৭৭ হাজার টাকা বলে হলফনামায় উল্লেখ করেন রাজ্যের প্রাক্তন খাদ্য ও বনমন্ত্রী।

১৮ ১৮

এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবি ঘটায় ভেঙে খান খান হয়ে গিয়েছে তৃণমূল। ঘাসফুলের বিজয়ী বিধায়কেরা দ্বিধাবিভক্ত। বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে রয়েছে একদল। গণমাধ্যমে অন্যদের পরিচয় ‘কালীঘাট তৃণমূল’। ঠিক এই সময় সমস্ত পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন জ্যোতিপ্রিয়। ফলে তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ার অন্য কোনও দিকে বাঁক নেয় কি না, সেটাই এখন দেখার।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement