২৭ বছরের কর্মজীবনে ইতি। অবসরের গ্রহে ৬০ বছর বয়সি মহাকাশের রহস্য অনুসন্ধানকারী সুনীতা উইলিয়ামস। গত বছরের (২০২৫) সালের ২৭ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক ভাবে অবসর গ্রহণ করেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই নভোচারী। মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি বিবৃতি দিয়ে সেই খবর জানিয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। ২৮৬ দিন মহাকাশে কাটিয়ে পৃথিবীতে ফেরার এক বছর না ঘুরতেই অবসর নিলেন নাসার এই নভশ্চর।
ভারতের গুজরাতে তাঁর পৈতৃক ভিটে। মহেসাণা জেলার ঝুলাসন গ্রামে এখনও থাকেন তাঁর আত্মীয়েরা। সুনীতার বাবা দীপক পাণ্ড্যের জন্ম গুজরাতে। তাঁর মা উরসুলিন বনি পাণ্ড্য স্লোভাক-আমেরিকান। মার্কিন নৌবাহিনীর ৬০ বছর বয়সি প্রাক্তন ক্যাপ্টেন এবং নাসার মহাকাশচারী সুনীতার ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি অস্বাভাবিক ঝোঁক।
মার্কিন নৌ অ্যাকাডেমিতে একটি সফরের পর সে দিকেই ঝোঁক তৈরি হয় তাঁর। তবে তাঁর শৈশবের স্বপ্ন ছিল পশুচিকিৎসক হওয়ার। ১৯৯৮ সালে নাসার মহাকাশচারী হিসাবে নির্বাচিত হয়ে জনসন স্পেস সেন্টারে প্রশিক্ষণ নেন সুনীতা।
পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক সুনীতা মেলবোর্নের ফ্লরিডা ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। যোগ দেন মার্কিন নৌসেনায়। হেলিকপ্টার এবং ফিক্সড-উইং পাইলট হিসাবে ৪০টি বিমানে মোট ৪,০০০ ঘণ্টারও বেশি সময় উড়ানের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। সুনীতার প্রথম মহাকাশযাত্রা ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে।
২০১২ সালে দ্বিতীয় বার মহাকাশে যান সুনীতা। ১২৭ দিনের সেই অভিযানে মহাকাশ স্টেশন কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নভশ্চর। ২০২৪ সালে তাঁর তৃতীয় ও শেষ অভিযান ছিল বোয়িং স্টারলাইনারে চড়ে মহাকাশ স্টেশনে যাওয়া। সঙ্গী ছিলেন আর এক মার্কিন মহাকাশচারী বুচ উইলমোর। সে বার মাত্র ১০ দিনের অভিযানে গিয়ে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায় ১০ মাস মহাকাশে আটকে থাকতে হয় তাঁদের।
গত বছর ৫ জুন মহাকাশে পাড়ি দিয়েছিলেন সুনীতারা। কথা ছিল আট দিন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে কাটিয়ে পৃথিবীতে ফিরবেন তাঁরা। কিন্তু যে যানে চড়ে তাঁরা গিয়েছিলেন, সেই বোয়িং স্টারলাইনারে যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ে। ফলে আট দিনের সফর বদলে যায় ২৮৬ দিনে। অবশেষে ভারতীয় সময় অনুসারে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ২৮৬ দিন পর পৃথিবীতে ফেরেন দু’জনে।
অন্য মহাকাশচারীদের মতো সুনীতা উইলিয়ামসও মহাকাশের নানা রহস্যের কিনারা করতে পাড়ি দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক মহাকাশকেন্দ্রে। মাত্র আট দিনের জন্য সেই অভিযান নির্ধারিত হলেও শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে কার্যত আটকে থাকতে হয় সুনীতা ও তাঁর সহকর্মী বুচ উইলমোরকে।
সুনীতার চিত্তাকর্ষক মহাকাশ অভিযানের ঝুলির মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে তিনটি অভিযান এবং ৬০৮ দিন মহাকাশে কাটানোর মতো রেকর্ড। এটি নাসার মহাকাশচারীর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। তিনি ন’টি স্পেসওয়াকও সম্পন্ন করেছেন। মহাকাশযানের বাইরে ৬২ ঘণ্টা ৬ মিনিট সময় কাটিয়েছেন। মহিলা মহাকাশচারীর মধ্যে এটি সর্বোচ্চ এবং নাসার ইতিহাসে চতুর্থ সর্বোচ্চ। এখন সকলের মনে প্রশ্ন, অবসরগ্রহণের পর তার জীবন কেমন হবে।
মহাশূন্যে নভোচর পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রথম স্থানে রয়েছে আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। এখানকার মহাকাশচারীদের বেতনকাঠামো সংস্থাটির ওয়েবসাইটে লেখা রয়েছে। আমেরিকার আইন অনুযায়ী, অসামরিক সরকারি কর্মীরা জেনারেল শিডিউলের (জিএস) ফেডারেল কাঠামো অনুযায়ী বেতন পান। বিজ্ঞানী, মহাকাশচারী থেকে নাসার সমস্ত কর্মীও আমেরিকার জেনারেল শিডিউলের আওতায় পড়েন।
চাকরিরত অবস্থায় নাসা থেকে বেতন ও অন্যান্য সুবিধা পেলেও অবসরগ্রহণের পর সুনীতা সরাসরি নাসা থেকে পেনশন পাবেন না। তার পরিবর্তে তিনি আমেরিকার পেনশন আইন অনুযায়ী ফেডারেল এমপ্লয়িজ় রিটায়ারমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে পেনশন পাবেন। ২৭ বছরের চাকরি এবং টানা তিন বছরের সর্বোচ্চ বেতনের গড় বেতনের উপর অবসরকালীন পেনশন গণনা করা হয়। জেনারেল শিডিউলের ১৫ পে গ্রেড অনুযায়ী সুনীতার বার্ষিক বেতন প্রায় ১.২-১.৩ কোটি টাকার কাছাকাছি হওয়ায় তাঁর পেনশনও বেশ মোটা হবে।
যদিও সঠিক পরিমাণ সরকারি ভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা তিনি বার্ষিক আনুমানিক ৪৩ হাজার ২০০ ডলার বা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৩৫ লক্ষ টাকা ফেডারেল পেনশন হিসাবে পেতে পারেন।
পেনশনের পাশাপাশি নাসার এই মহাকাশচারী মার্কিন সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প থেকেও সুবিধা পাবেন। ফলে একটি পৃথক মাসিক ভাতাও দেওয়া হবে তাঁকে। এ ছাড়াও স্বাস্থ্য বিমা, জীবন বিমা এবং তাঁর ‘থ্রিফ্ট সেভিংস প্ল্যান’ থেকেও মাসে মাসে আর্থিক সহায়তা পাবেন সুনীতা।
মহাকাশচারীর পেশা বেছে নেওয়া কিন্তু মোটেই সহজ নয়। উচ্চশিক্ষিত না হলে, বিশেষত মহাকাশবিজ্ঞান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান না থাকলে এই কাজ পাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই। পাশাপাশি, মহাকাশচারী হতে গেলে নিতে হয় বিশেষ প্রশিক্ষণ।
বেতনকাঠামো অনুযায়ী সুনীতার মতো অত্যন্ত অভিজ্ঞ নভোচারীদের বার্ষিক বেতন জিএস ১৫ বিভাগের আওতায় পড়ে। আমেরিকার মহাকাশচারীরা সাধারণত জিএসের ১২ থেকে ১৫ র্যাঙ্ক অনুযায়ী বেতন পেয়ে থাকেন। নাসার ওয়েবসাইটের সূত্র বলছে, ২০২৪ সালে এই বিভাগের মহাকাশচারীরা ১ লক্ষ ৫২ হাজার ২৫৮ ডলার বেতন পেয়েছেন।
জল, স্থল কিংবা অন্তরীক্ষ— যেখানেই মহাকাশচারীরা থাকুন না কেন, ‘ওভারটাইম’ বা অতিরিক্ত কাজের জন্য বেশি পারিশ্রমিক দেওয়ার নিয়ম নেই নাসার। তবে, আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার এমন নিয়মের জন্য মূল বেতনের বাইরে হাতখরচ বাবদ দিনপ্রতি মাত্র ৩৪৭ টাকা (ভারতীয় মুদ্রায়) পেতে পারেন সুনীতা উইলিয়ামস।
সুনীতাও সমপরিমাণ বার্ষিক বেতন পান বলে নাসা সূত্রে খবর। সেই বেতনের পরিমাণ ১ কোটি ২৬ লক্ষ ৩৮ হাজার ৪৩৪ টাকা। মহাকাশ ভ্রমণ এবং প্রশিক্ষণের জন্য এই বেতন বরাদ্দ। এ ছাড়া রয়েছে হরেক রকমের সুযোগ-সুবিধা। নাসা থেকে স্বাস্থ্য বিমা, মিশনের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ, ভ্রমণ ভাতা-সহ অনেক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়।
‘মার্কা ডটকম’ নামের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, সুনীতার আনুমানিক মোট সম্পদের পরিমাণ ৫০ লক্ষ ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ৪৩ কোটি টাকার বেশি।