শতবর্ষপ্রাচীন দিল্লির জিমখানা ক্লাবের জমি অধিগ্রহণের পথে কেন্দ্র। চলতি বছরের ৫ জুনের মধ্যে জায়গা খালি করার নির্দেশ দিয়েছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। ৭, লোক কল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে ২৭.৩ একর জমির উপর দাঁড়িয়ে থাকা ১১৩ বছরের পুরনো ক্লাবটিকে আভিজাত্যের প্রতীক বলা যেতে পারে।
গত ২২ মে, দিল্লির জিমখানা ক্লাবকে উচ্ছেদের নোটিস ধরায় কেন্দ্র। সেখানে জমি অধিগ্রহণের নেপথ্য কারণ হিসাবে জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা পরিকাঠামো এবং জরুরি জনস্বার্থের কথা উল্লেখ করেছে সরকার। একে চ্যালেঞ্জ করে দিল্লি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয় ক্লাব কর্তৃপক্ষ। যদিও তাতে কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেয়নি আদালত।
এ দেশের বিলাসবহুল ক্লাবগুলির মধ্যে বরাবরই প্রথম সারিতে থেকেছে দিল্লির জিমখানা। কী নেই সেখানে? সুসজ্জিত লন, দু’ডজন টেনিস কোর্ট, একটি সুইমিং পুল, কাঠের মেঝের একটি বলরুম-সহ একাধিক পানশালা। আভিজাত্যের পাশাপাশি দিল্লির জিমখানাকে নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। কারণ, এই ক্লাবপ্রাঙ্গণ থেকেই একটা সময় ফাঁস হত ভারতীয় সেনার গোপন তথ্য!
২০০২ সালে প্রকাশিত হয় মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ-র (সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি) প্রাক্তন এজেন্ট রবার্ট বেয়ারের আত্মজীবনী, ‘সি নো ইভিল’। সেখানে সামরিক গোপন তথ্য পাচারের জন্য মাত্র পাঁচ দশক আগে কী ভাবে দিল্লির জিমখানা ক্লাবপ্রাঙ্গণ ব্যবহার হত, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন তিনি। এর জেরে বইটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সর্বত্র হইচই পড়ে যায়।
একসময় দিল্লির জিমখানা ক্লাবে ছিল বিদেশি নাগরিকদের ঢালাও প্রবেশাধিকার। ‘সি নো ইভিল’-এ বেয়ার লিখেছেন, এই নিয়মের ফাঁক গলেই সেখানে নিয়মিত যাতায়াত করতেন তিনি ও তাঁর মতো বেশ কিছু গুপ্তচর। ক্লাবে ঢোকার ক্ষেত্রে মূলত কূটনীতিকের ছদ্মবেশ নিতেন তাঁরা, যেটা ছিল ভারতীয় গোয়েন্দাদের চোখে ধুলো দেওয়ার মোক্ষম অস্ত্র।
১৯৭০-এর দশকে ‘ঠান্ডা যুদ্ধ’কে (কোল্ড ওয়ার) কেন্দ্র করে আমেরিকা ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে বাড়তে থাকে সংঘাত। ওই সময় মস্কোর ‘বন্ধু’ ভারতের উপর নজরদারি চালাতে বেয়ারকে দিল্লি পাঠায় সিআইএ। তত দিনে অবশ্য মার্কিন নেতৃত্বাধীন নেটো (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন) এবং ক্রেমলিনের তৈরি করা ওয়ারশ চুক্তিতে আড়াআড়ি ভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে ইউরোপ।
শুধু তা-ই নয়, ‘ঠান্ডা যুদ্ধে’র সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়ে একের পর এক অত্যাধুনিক হাতিয়ার তৈরি করে ফেলে সাবেক সোভিয়েত। এর মধ্যে ছিল টাইটানিয়াম-নির্মিত আলফা শ্রেণির ‘ইন্টারসেপ্টর’ ডুবোজাহাজ, বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার ঘেঁষে উড়ে চলা মিগ-২৫ ‘ফক্সব্যাট’ লড়াকু জেট এবং টি-৭২ নামের নতুন প্রজন্মের ট্যাঙ্ক। ফলে যথেষ্ট চাপে পড়ে যায় আমেরিকার রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব।
আত্মজীবনীতে বেয়ার লিখেছেন, ৭০-এর দশকে মস্কোর এই হাতিয়ারগুলির ‘প্রতিষেধক’ তৈরি করতে মরিয়া হয়ে ওঠে মার্কিন সরকার। ওয়াশিংটন মনে করত সংশ্লিষ্ট অস্ত্রগুলিই সোভিয়েত ফৌজকে অজেয় করে তুলছে। আর তাই ওয়ারশ’ চুক্তিভুক্ত দেশ এবং ভারতকে নিশানা করে সিআইএ, যারা ছিল ক্রেমলিনের হাতিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা।
এই পর্বে মার্কিন যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগনের সবচেয়ে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় সোভিয়েতের টি-৭২ ট্যাঙ্ক। পুরনো টি-৫৫ এবং টি-৬২র নিরিখে ৪১ টন ওজনের এই হাতিয়ারটি ছিল মস্কোর এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। সংশ্লিষ্ট ট্যাঙ্কে ১২৫ সিসির একটি কামান লাগায় ক্রেমলিন, যা সেকেন্ডে ১,৮০০ বেগে গোলা ছুড়তে পারত।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ নেটোভুক্ত দেশগুলির হাতে থাকা ট্যাঙ্কগুলির তুলনায় টি-৭২র পাল্লা ছিল অনেকটাই বেশি। তবে হাতিয়ারটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল স্বয়ংক্রিয় গোলা ভরার প্রযুক্তি, যেটা ট্যাঙ্কের ভিতরের সৈনিক সংখ্যাকে চার থেকে তিনে নামিয়ে এনেছিল। ১৯৭৯ সালে টি-৭২র বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে সোভিয়েত প্রশাসন। ওই বছরই ২,০০০-এর বেশি ট্যাঙ্ক তৈরি করে ফেলে তারা।
বেয়ার জানিয়েছেন, মস্কোর হাতিয়ারের শক্তি ও দুর্বলতা বুঝতে তার ব্যবহারবিধি জোগাড়ের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয় সিআইএ। মার্কিন গুপ্তচরদের কাছে তা ছিল ‘সোভম্যাট’ (সোভিয়েত-ম্যানুয়াল)। গোড়ার দিকে ক্রেমলিনের ট্যাঙ্কের সর্বাধিক বড় ক্রেতা ছিল নয়াদিল্লি। আর তাই ৭০-র দশকের শেষের দিকে প্রথম দফায় টি-৭২, টি-৭২এম এবং টি-৭২এম১ মিলিয়ে মোট ৫০০টি ট্যাঙ্ক আমদানি করে ভারত।
‘সি নো ইভিল’-এ মার্কিন গুপ্তচর বেয়ার লিখেছেন, এই পরিস্থিতিতে একটি দুঃসাহসিক পরিকল্পনা করে সিআইএ-র দিল্লি স্টেশন। ঠিক হয়, মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দিয়ে ভারতীয় সেনার এক পদস্থ কর্তাকে দলে টানবেন তাঁরা। সীমান্ত পেরিয়ে একটি টি-৭২ ট্যাঙ্ককে পাকিস্তানে নিয়ে যাবেন তিনি। সেখানেই সংশ্লিষ্ট সোভিয়েত ব্রহ্মাস্ত্রের ‘ময়নাতদন্ত’ সেরে ফেলবেন ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানীরা।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ১৯৭৬ সালে মিগ-২৫ লড়াকু জেটকে উড়িয়ে জাপানে নিয়ে আসেন সোভিয়েত বিমানবাহিনীর সদস্য ভিক্টর বেলেনকোর। মস্কোর কমিউনিস্ট শাসনের উপর যথেষ্ট বীতশ্রদ্ধ ছিলেন তিনি। টোকিয়োতেই ওই যুদ্ধবিমানের প্রতিটা অংশ খুলে পরীক্ষা করে মার্কিন সামরিক গবেষকদের দল। তার পরও দ্রুত গতির লড়াকু জেটটির বহু রহস্য ছিল তাঁদের কাছে অধরা।
বেয়ারের দাবি, ‘অপারেশন বেলেনকোর’-এর পুনরাবৃত্তি ভারতের মাটিতেও করা যাবে বলে নিশ্চিত ছিলেন সিআইএ কর্তাদের একাংশ। যদিও বাস্তবে তা হয়নি। ফলে পরিকল্পনায় বড় বদল আনতে বাধ্য হয় মার্কিন গুপ্তচরবাহিনী। শেষ পর্যন্ত এক ভারতীয় চর টি-৭২ ট্যাঙ্কের ব্যবহারবিধির নথিভর্তি ডাফল ব্যাগ এনে দিতে সম্মত হন। কিন্তু সেখানেও উঁকি মারছিল অন্য বিপদ।
৭০-এর দশকে বিদেশি নাগরিকদের উপর মারাত্মক রকমের নজরদারি চালাত ভারতের ‘ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ’ বা আইবি। বেয়ার দিল্লিতে আসার আগেই তাদের হাতে ধরা পড়েন সিআইএ-র এক অফিসার। ফলে দিল্লির স্টেশন চিফকে ঘরে ফেরাতে বাধ্য হয় ওয়াশিংটন। পাশাপাশি, দু’বছরের জন্য তাঁর দফতরে পড়ে তালা। ফলে আইবির নজর এড়িয়ে ওই ডাফেল ব্যাগ হস্তগত করা বেয়ারের কাছে প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।
সিআইএ-র ফিল্ড এজেন্ট তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘‘ভারত ছিল আমার কর্মক্ষেত্রগুলির মধ্যে সবচেয়ে কঠিনতম জায়গা। তার কারণ একটাই, আইবি। এই অবস্থায় এক গুপ্তচর এসে জানায়, মাত্র দু’ঘণ্টার জন্য টি-৭২র ‘সোভম্যাট’ দিতে পারবে সে। কথাটা শোনা ইস্তক আমার তো বুক ধড়ফড়ানি শুরু হয়ে গিয়েছিল। কারণ, এর পিছনে আমরা বছরের পর বছর দৌড়েছি। ওটা একটা জ্ঞানের খনি। ফলে তাঁকে না বলতে পারিনি।’’
বেয়ারের আত্মজীবনী অনুযায়ী, টি-৭২র ব্যবহারবিধির নথি এক সৈনিকের থেকে মাত্র দু’ঘণ্টার জন্য ধার নিয়েছিলেন ওই ব্যক্তি, ডিউটি শেষ হওয়ার আগে যা সুনির্দিষ্ট সিন্দুকে রাখতে হবে তাঁকে। ফলে দফতরে গিয়ে ওই ম্যানুয়ালের ফোটোকপি করার সময় ছিল না বেয়ারের হাতে। তাঁর কথায়, ‘‘আইবি আমার উপর নজরদারি চালাচ্ছে। ফলে নথি হাতাতে একটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে যে এগোব, সেই সুযোগই পাচ্ছিলাম না।’’
কিন্তু, তার পরেও ঝুঁকি নেননি বেয়ার। ভারতীয় এজেন্টের থেকে টি-৭২র ব্যবহারবিধির ডাফল ব্যাগ নিয়ে গাড়ি থেকে এক ধাক্কা মেরে তাঁকে ফেলে দেন তিনি। ঠিক হয়, দু’ঘণ্টার মধ্যে দিল্লি জিমখানার তিন নম্বর গেস্ট হাউসের পিছনে ঝোপের ধারে দেখা করবেন তাঁরা। এজেন্ট গাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেই গতির ঝড় তুলে মার্কিন দূতাবাসে ছোটেন বেয়ার।
‘সি নো ইভিল’ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে টি-৭২র ব্যবহারবিধির নকল প্রক্রিয়া শেষ হলে মূল নথি নিয়ে দিল্লির জিমখানা ক্লাবে যান সিআইএ-র ফিল্ড এজেন্ট। এর জন্য মাত্র ১৭ মিনিট সময় পেয়েছিলেন বেয়ার। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, ‘‘আমার গাড়ি তখন উল্কার গতিতে ছুটছে। কিছু ক্ষণ পরে বুঝলাম পিছনে আমাকে তাড়া করেছে আইবির তিনটে গাড়ি, যা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পাঁচটা হয়ে গিয়েছিল।’’
বেয়ারের দাবি, এই পরিস্থিতিতে কোনও মতে জিমখানা ক্লাবে প্রবেশ করেন তিনি। পিছন পিছন আইবির গাড়িগুলিও সেখানে ঢুকে পড়ে। ফলে গাড়ি থেকে নেমে দুই টেনিস কোর্টের মাঝের নুড়িবিছানো রাস্তা দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে তিন নম্বর গেস্ট হাউসের পিছনে পৌঁছোতে হয় তাঁকে। একটা তেঁতুল গাছের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় ঝোপের দিকে ডাফেল ব্যাগটা ছুড়ে দেন বেয়ার। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন ওই ভারতীয় এজেন্ট। ব্যাগটা সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিয়ে অন্ধকারে মিশে যান ওই ব্যক্তি।
সিআইএ-র ফিল্ড এজেন্ট জানিয়েছেন, এর পর আইবির সন্দেহ এড়াতে পিছনের দরজা দিয়ে জিমখানার পানশালায় প্রবেশ করেন তিনি। সেখানে ‘থ্রি পিস’ স্যুট পরিহিত এক সম্ভ্রান্ত ভারতীয় একা বসে সংবাদপত্র পড়ছিলেন। বেয়ার দ্রুত সেই টেবলে চলে যান। ওই ব্যক্তির সঙ্গে খোশগল্প শুরু করেন তিনি। পাশাপাশি, বরফ ছাড়া দু’ডবল স্কচ বেয়ারাকে দিতে বলেন ‘সি নো ইভিল’-এর লেখক।
বেয়ারের দাবি, এই পদ্ধতিতে টি-৭২র ট্যাঙ্কের রফতানি শ্রেণির কিছু তথ্য হাতে পেয়েছিল পেন্টাগন। মার্কিন প্রতিরক্ষা গবেষকেরা বুঝতে পারেন, রাতের বেলা এই হাতিয়ারের লড়াই করার ক্ষমতা বেশ কম। কারণ, এর থার্মাল সাইটের পাল্লা ছিল মাত্র ৮০০ মিটার। দিল্লির জিমখানা ক্লাব না থাকলে সোভিয়েত ব্রহ্মাস্ত্রটির ব্যবহারবিধি যে কখনওই হাতানো যেত না, তা স্বীকার করে নিয়েছেন সিআইএ-র এই ফিল্ড এজেন্ট।