Modi on Khamenei State Funeral

মোসাদের হামলার আশঙ্কা, চটতে পারে আরব ‘বন্ধু’, খামেনেইয়ের অন্ত্যেষ্টির আমন্ত্রণে সাড়া দেবেন উভয়সঙ্কটে থাকা মোদী?

আগামী ৪ জুলাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসে নিহত সর্বোচ্চ নেতা খামেনেইয়ের শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান শুরু করবে ইরান। সেখানে হাজির থাকার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে তেহরান। কী করবে ভারত?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৫ জুন ২০২৬ ১৭:০২
Share:
০১ ১৯

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৬০ দিনের সংঘর্ষবিরতিতে সম্মত হয়েছে ইরান। পশ্চিম এশিয়ায় চিরস্থায়ী শান্তি ফেরাতে দু’পক্ষের মধ্যে সুইৎজ়ারল্যান্ডে চলছে আলোচনা। তার মধ্যেই আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে নিহত সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) তথা শিয়া ধর্মগুরু আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের শেষকৃত্যের প্রস্তুতি শুরু করল তেহরান। পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাধিস্থ করা হবে তাঁকে।

০২ ১৯

চলতি বছরের ৪ জুলাই রাজধানী তেহরানে শুরু হবে বছর ৮৬-র আলি খামেনেইয়ের শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান। ইরানি পতাকায় মুড়িয়ে তাঁর নশ্বর দেহ প্রথমে যাবে পবিত্র কোম শহরে। ৭ জুলাই সেখানে শায়িত থাকবে মৃতদেহ। ৯ জুলাই খামেনেইয়ের নিজের শহর মাশহাদে সমাধিস্থ করা হবে তাঁকে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসে (৪ জুলাই) শুরু হচ্ছে শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

Advertisement
০৩ ১৯

কূটনৈতিক সূত্রকে উদ্ধৃত করে সংবাদসংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, আলি খামেনেইয়ের রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ব্যক্তিগত ভাবে আমন্ত্রণ করেছেন ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ান। যদিও এই নিয়ে সরকারি ভাবে কোনও বিবৃতি দেয়নি নয়াদিল্লি। অন্য দিকে বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রধানমন্ত্রীর দফতরের পক্ষে বেশ কঠিন।

০৪ ১৯

দুঁদে কূটনীতিকদের বড় অংশই মনে করেন, আলি খামেনেইয়ের শেষকৃত্যে প্রধানমন্ত্রী মোদী গেলে বেজায় চটবে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। কারণ, ইরান যুদ্ধের আঁচ সবচেয়ে বেশি সহ্য করতে হয়েছে আবু ধাবিকে। লড়াই চলাকালীন আরব রাষ্ট্রটিকে হাজার তিনেক ড্রোন এবং অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্রে নিশানা করেছে তেহরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি।

০৫ ১৯

গত সাড়ে তিন মাসে মাঝেমধ্যেই ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের ঝাঁককে আবু ধাবি, দুবাই ও শারজার মতো ঝাঁ-চকচকে শহরগুলিতে আছড়ে পড়তে দেখা গিয়েছে। এ ছাড়া আমিরশাহির বিমানবন্দর ও খনিজ তেল শোধনাগারগুলিকেও নিশানা করে তেহরান। আইআরজিসির হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরব রাষ্ট্রটির কৃত্রিম মেধার তথ্যভান্ডার (এআই ডেটা সেন্টার)। ঐতিহ্যবাহী বিলাসবহুল হোটেলে লেগে যায় আগুন।

০৬ ১৯

এই ঘটনার জেরে রাতারাতি খাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ায় আমিরশাহির পর্যটনশিল্প। এত দিন অন্যতম নিরাপদ শহর হওয়ার কারণে বিশ্বের ধনকুবেরদের একাংশ বসবাসের জন্য দুবাই বা আবু ধাবিকে বেছে নিচ্ছিলেন। তাঁরা থাকার ফলে আর্থিক সমৃদ্ধিতে সমস্যা হয়নি সংশ্লিষ্ট আরব রাষ্ট্রের। কিন্তু, তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ঝাঁক ছুটে আসতেই রাতারাতি বদলে যায় সমস্ত হিসাব। তখন উপসাগরীয় দেশ ছাড়তে বিদেশিদের মধ্যে পড়ে হুড়োহুড়ি।

০৭ ১৯

আর তাই যুদ্ধ থামতেই সামরিক শক্তি বাড়াতে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমিরশাহি। সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, নয়াদিল্লি থেকে ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র এবং আকাশতির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনতে আগ্রহী আবু ধাবি। এ ব্যাপারে দু’পক্ষের মধ্যে চলছে আলোচনা। পশ্চিম এশিয়ার ওই আরব রাষ্ট্রটির সঙ্গে এ দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আমিরশাহি থেকে খনিজ তেল-সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ পণ্য আমদানি করে নয়াদিল্লি।

০৮ ১৯

আবু ধাবিকে বাদ দিলে খামেনেইয়ের রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিতে যাওয়ার পথে দ্বিতীয় কাঁটা হল ইজ়রায়েল। অত্যাধুনিক হাতিয়ার থেকে সামরিক প্রযুক্তি বা কৌশলগত গোয়েন্দা তথ্য, প্রতিটা ক্ষেত্রে সব সময়ে ভারতের পাশে থেকেছে পশ্চিম এশিয়ার ওই ছোট্ট ইহুদি রাষ্ট্র। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তেল আভিভের শত্রুদেশে প্রধানমন্ত্রী মোদী পা রাখলে, ইজ়রায়েল তার ব্যাখ্যা কী ভাবে করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।

০৯ ১৯

তবে এগুলির উল্টো যুক্তিও রয়েছে। দক্ষিণ ইরানের চাবাহার বন্দরে বিপুল লগ্নি করেছে ভারত। পাকিস্তানকে এড়িয়ে মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্য করতে ওই এলাকাটি হাতে থাকা নয়াদিল্লির কাছে খুবই জরুরি। জায়গাটির কৌশলগত গুরুত্বও অপরিসীম। চাবাহার থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে ইসলামাবাদের গ্বদর বন্দর, যেখানে অত্যন্ত সন্তর্পণে ঘাঁটি গাড়ছে চিনের পিপল্‌স লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) নৌবাহিনী।

১০ ১৯

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইরানি প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেন পেজ়েশকিয়ান। ওই অনুষ্ঠানেও মোদীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল তেহরান। নিজে না গিয়ে প্রতিনিধি হিসাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিতিন গডকড়িকে সেখানে পাঠান প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু, তাতেও বিতর্ক এড়াতে পারেনি নয়াদিল্লি। আর তাই একই রকমের পদক্ষেপের আগে কূটনীতিকদের যে প্রভূত চিন্তাভাবনা করতে হবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

১১ ১৯

পেজ়েশকিয়ানের শপথের দিনেই তেহরানে ঢুকে প্যালেস্টাইনপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী হামাসের শীর্ষনেতা ইসমাইল হানিয়েকে নিকেশ করে ইজ়রায়েল। আইআরজিসির সামরিক গেস্টহাউসে ছিলেন তিনি। সেখানেই বিস্ফোরণ ঘটায় ইহুদি গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ। সূত্রের খবর, মৃত্যুর আগে নিতিন গডকড়ির সঙ্গে দেখা করেন হানিয়ে। ফলে তাঁর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠে গিয়েছিল।

১২ ১৯

সাবেক সেনাকর্তাদের দাবি, খামেনেইয়ের রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যে মোসাদ যে কাউকে নিশানা করবে না তাঁর কোনও নিশ্চয়তা নেই। কারণ, মোদীর পাশাপাশি অন্ত্যেষ্টিতে আমন্ত্রণ পেয়েছেন হামাসের শীর্ষনেতারাও। থাকবে পাকিস্তানের একটি প্রতিনিধিদলও। ইজ়রায়েলি গুপ্তচরেরা সেখানে হামলা চালালে মৃত্যু হতে পারে ভারতের প্রতিনিধিরও। আর তাই সফর এড়ানোর পরামর্শই দিচ্ছেন তাঁরা।

১৩ ১৯

ইরান ও আমেরিকার মধ্যে লড়াই থামলেও সংঘর্ষবিরতিতে রাজি নয় ইজ়রায়েল। সম্প্রতি, মোসাদের নতুন প্রধান রোমান গফম্যানের সঙ্গে বৈঠক করেন ইহুদি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। পরে প্রকাশ্যে তেহরানকে হুমকি দিতে শোনা যায় তাঁকে। নেতানিয়াহুকে বলেন, ‘‘সাবেক পারস্যের কাছে কখনওই পরমাণু অস্ত্র থাকতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজনে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়বে তেল আভিভ।’’

১৪ ১৯

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলা শান্তি সমঝোতায় লেবাননকে নিয়ে একটি শর্ত দিয়েছে ইরান। পশ্চিম এশিয়ার ওই দেশ থেকেই এত দিন লাগাতার ইহুদিদের নিশানা করছিল তেহরানের মদতপুষ্ট বিদ্রোহী গোষ্ঠী হিজ়বুল্লা। তাদের নিকেশ করতে লেবাননে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে নেতানিয়াহুর বিমানবাহিনী। শুধু তা-ই নয়, সীমান্ত পেরিয়ে সংশ্লিষ্ট আরব রাষ্ট্রটিতে ঢুকেছে তাঁর ফৌজ। কোনও অবস্থাতেই সেখান থেকে পিছিয়ে আসতে নারাজ তেল আভিভ।

১৫ ১৯

ফলে ইরান-আমেরিকা শান্তি সমঝোতা কতটা ফলপ্রসু হবে, তা নিয়ে সামরিক বিশ্লেষকদের মনে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। খামেনেইয়ের শেষকৃত্য চলাকালীন নতুন করে ইজ়রায়েল হামলা চালালে জটিল হতে পারে পরিস্থিতি। আর তাই আগের বারের মতো কোনও প্রতিনিধি পাঠানো মোদী সরকারের পক্ষে যে ঝুঁকিপূর্ণ, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

১৬ ১৯

১৯৭৯ সালে ইসলামীয় বিপ্লবের জেরে রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে কট্টরপন্থী শিয়া ধর্মগুরুদের শাসনে চলে যায় ইরান। ক্ষমতা পান আয়াতোল্লা রুহুল্লাহ খোমেইনি। এর ঠিক এক বছরের মাথায় (১৯৮০) তেহরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেন। আট বছর ধরে চলা ওই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়ে রাতারাতি খবরের শিরোনামে চলে আসেন খামেনেই। রাজনৈতিক ভাবে দ্রুত উত্থান হয় তাঁর।

১৭ ১৯

১৯৮৯ সালে খোমেইনির মৃত্যু হলে খামেনেইকে সর্বোচ্চ নেতা বেছে নেয় ইরানি শিয়া ধর্মগুরুদের বিশেষ কাউন্সিল। গোড়া থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বড় শয়তান’ এবং ইজ়রায়েলকে ‘ছোট শয়তান’ বলে উল্লেখ করতেন তিনি। তাঁর আমলেই হামাস, হিজ়বুল্লা এবং ইয়েমেনের হুথিদের মতো প্যালেস্টাইনপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী গড়ে তোলে আইআরজিসি, যারা সব সময়ে ইহুদিদের ধ্বংসের স্বপ্ন দেখে এসেছে।

১৮ ১৯

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ ভাবে ইরানে সামরিক অভিযান চালায় ইজ়রায়েল। ওই দিনই ইহুদি ও আমেরিকার বায়ুসেনার আক্রমণে নিজের গোপন আস্তানায় প্রাণ হারান খামেনেই। মৃত্যু হয় তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্যের। এ ছাড়া আইআরজিসির একগুচ্ছ কমান্ডারকেও নিকেশ করে তেল আভিভ ও ওয়াশিংটন।

১৯ ১৯

খামেনেইয়ের মৃত্যুতে শোকে ডুবে যায়নি ইরান। ইহুদি ও মার্কিন ফৌজকে শিক্ষা দিতে পাল্টা প্রত্যাঘাতে নামে তাঁরা। তড়িঘড়ি হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে আইআরজিসি। ১০০ দিনের উপর লড়াই চালিয়েও তা খুলতে পারেনি আমেরিকা। ফলে ৬০ দিনের সংঘর্ষবিরতি করে তেহরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির আলোচনায় বসেছে ওয়াশিংটন। সেখানে অবশ্য ডাক পায়নি ইজ়রায়েল। ফলে ওই সমঝোতাকে সম্মান করার দায় নেই বলেও জানিয়ে দিয়েছেন নেতানিয়াহু।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement