India-EU trade deal

মদ, গাড়ি, চিকিৎসা সরঞ্জাম থেকে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, কী কী সস্তা হতে পারে ইউরোপের বাণিজ্যদ্বার খুলে যাওয়ায়?

বহু প্রতীক্ষিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর করল নয়াদিল্লি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এর ফলে ইউরোপ থেকে ভারতে রফতানি হওয়া ৯৬.৬ শতাংশ পণ্যের উপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার বা হ্রাস করা হবে। এর ফলে ইউরোপীয় পণ্যের উপর বছরে ৪০০ কোটি ইউরো পর্যন্ত শুল্ক সাশ্রয় হবে। কমবে পণ্যের দাম।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:৩৬
Share:
০১ ১৮

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি সম্পন্ন করল নয়াদিল্লি। উচ্চ আমদানি শুল্ক কমিয়ে ইউরোপীয় বাজার উন্মুক্ত করে বাণিজ্যকে সহজ এবং সস্তা করাই ছিল বহু প্রতীক্ষিত এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির উদ্দেশ্য। প্রায় ১৮ বছর ধরে আলোচনার পরে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা চূড়ান্ত করল ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

০২ ১৮

সোমবার দিল্লিতে সাধারণতন্ত্র দিবসের অতিথি হয়ে এসেছিলেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েন। উরসুলা জানিয়েছিলেন, মূলত ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত করতেই ভারতে আসছেন তিনি। মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে উরসুলা এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট অ্যান্টোনিও কোস্টার সঙ্গে সোমবার বৈঠকে বসেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

Advertisement
০৩ ১৮

বিশ্বের দরবারে এই চুক্তিকে ‘সব চুক্তির জননী’ বলে উল্লেখ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মঙ্গলবার চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর সেই সুসংবাদটি নিজেই দেশবাসীর কাছে তুলে ধরেন মোদী। এই চুক্তির ফলে লাভবান হবেন ভারত ও ইউরোপের ২৭টি দেশের মোট ১৯০ কোটি ক্রেতা ও গ্রাহক।

০৪ ১৮

চুক্তি অনুযায়ী ভারতের ৯০ শতাংশ পণ্য বিনা শুল্কে রফতানি করা যাবে। অন্য দিকে ইউরোপের অন্য দেশগুলি থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও শুল্কহ্রাস বা প্রত্যাহার করল নয়াদিল্লি। সংশ্লিষ্ট সমঝোতায় কতটা লাভবান হবে নয়াদিল্লি? বাণিজ্যচুক্তির ফলে ভারতের বাজারে যেমন ইউরোপের পণ্যগুলির দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমবে, তেমনই ইউরোপের বাজারেও ভারতীয় পণ্যের দাম কমবে। দু’পক্ষের মুনাফার দাঁড়িপাল্লা তুল্যমূল্য বিচার করে কোন কোন জিনিসের কমবে দাম? রইল সেই তালিকা।

০৫ ১৮

বিশেষজ্ঞদের আভাসের সঙ্গেই মোটামুটি মিলে যাচ্ছে তালিকায় থাকা পণ্যগুলি। শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, বিদ্যুৎ সরঞ্জাম, কারখানা এবং জ্বালানি প্রকল্পে ব্যবহৃত উচ্চমানের যন্ত্রাংশের বর্তমান সর্বাধিক কর ৪৪ শতাংশ থেকে একধাক্কায় নেমে আসবে শূন্যে। ফলে লাভবান হবেন ইউরোপীয় যন্ত্রপাতির উপর নির্ভরশীল ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। ফলে উৎপাদন খরচ কমবে, কমবে পণ্যের দাম।

০৬ ১৮

ইউরোপে উৎপাদিত গাড়ি, বিয়ার এবং বেশ কিছু খাদ্যদ্রব্য সস্তা হতে চলেছে ভারতীয়দের জন্য। ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে যে ভারতে রফতানি হওয়া ৯৬.৬ শতাংশ পণ্যের উপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার বা হ্রাস করা হবে। এর ফলে ইউরোপীয় পণ্যের উপর বছরে ৪০০ কোটি ইউরো পর্যন্ত শুল্ক সাশ্রয় হবে।

০৭ ১৮

১১ শতাংশ কর দিতে হত বিমান এবং মহাকাশযানের যন্ত্রাংশের জন্য। সেই শুল্ক প্রত্যাহার করা হবে। বিমানের যন্ত্রাংশের খরচ কমলে তার দীর্ঘমেয়াদি সুপ্রভাব পড়বে বিমান পরিষেবা ও বিমানের টিকিটের দামে। বিমানসংস্থা, বিমান রক্ষণাবেক্ষণ সংস্থা এবং প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত খরচ কমবে। মহাকাশ গবেষণায় প্রয়োজনীয় বেশ কিছু যন্ত্রাংশও সেখান থেকে ন্যূনতম মূল্যে আমদানি করতে পারবে নয়াদিল্লি।

০৮ ১৮

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তিতে সবচেয়ে লাভবান হতে চলেছে এ দেশের চিকিৎসাক্ষেত্র। এখানকার হাসপাতাল, গবেষণাগার বা চিকিৎসকেরা কম খরচে বিলেত থেকে চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনতে পারবেন। চিকিৎসা সরঞ্জামের ৯০ শতাংশ পণ্যের শুল্ক ২৭.৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নামিয়ে আনা হবে। সাগরপার থেকে আমদানি করা চিকিৎসার যন্ত্র, ডায়াগনস্টিক মেশিন, লেন্স এবং অস্ত্রোপচার সরঞ্জামের মতো জিনিসপত্র সস্তা হতে পারে। ফলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের পকেটে কম টান পড়বে।

০৯ ১৮

বর্তমানে প্লাস্টিকের উপর ১৬.৫ শতাংশ এবং রাসায়নিকের উপর ২২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়। এই শুল্কও মূলত শূন্য বা তার আশপাশে নেমে আসবে। প্যাকেজিং, ওষুধ, টেক্সটাইল এবং ভোগ্যপণ্যের মতো শিল্পের কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহার করা প্লাস্টিকের দাম কমলে অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমতে পারে।

১০ ১৮

সুরাপ্রেমীদের জন্য দারুণ সুখবর বয়ে এনেছে এই মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি। একধাক্কায় ইউরোপ থেকে আমদানিকৃত সুরার দাম অনেকটা কমে যাচ্ছে। ভারতে আমদানি করা হুইস্কির ব্র্যান্ডগুলির মধ্যে অন্যতম হল সিভাস রিগাল এবং দ্য গ্লেনলিভেট। এ ছাড়া স্কচ ব্র্যান্ডের মধ্যে জনি ওয়াকার, সিঙ্গলটন এবং টালিসকার এ দেশের বাজারে বিক্রি করে থাকে মদ প্রস্তুতকারী সংস্থা। বিলিতি ব্র্যান্ডের দেশি ভক্তদের সুরার খরচ অনেকটাই কমবে।

১১ ১৮

প্রিমিয়াম গোত্রের জন্য ওয়াইনের শুল্ক ১৫০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। মাঝারি মানের ওয়াইনের শুল্ক ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। স্পিরিট শুল্ক ১৫০ শতাংশ থেকে কমে ৪০ শতাংশে নেমে আসবে। বিয়ারের শুল্ক ১১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫০ শতাংশ করা হতে পারে। ভারতে জনপ্রিয় ইউরোপীয় বিয়ারের ব্র্যান্ড কার্লসবার্গ ও টুবোর্গ (ডেনমার্ক), হেইনকেন (নেদারল্যান্ডস), বাড ওয়াইজ়ারের(চেক রিপাবলিক) মতো বিয়ারের ব্র্যান্ড আরও সস্তা হবে ভবিষ্যতে।

১২ ১৮

মদ ছাড়াও ইউরোপীয় বাণিজ্যচুক্তির ফলে উল্লেখযোগ্য ভাবে কমতে চলেছে বিদেশি গাড়ির দাম। বিক্রির দিক থেকে আমেরিকা এবং চিনের পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গাড়ির বাজার রয়েছে ভারতে। ভারতীয় বাজারে সস্তা হতে পারে বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ় বেনজ়ের মতো গাড়ি। বর্তমানে ভারতীয় বাজারে ইউরোপ থেকে আসা গাড়ির উপর ১১০ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। সেই শুল্ক ১০ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে চুক্তিতে বলা হয়েছে এই শুল্কহারে বছরে আড়াই লক্ষ গাড়ি আমদানি করা যাবে। সূত্রের খবর, যে গাড়িগুলির আমদানিমূল্য ১৫০০০ ইউরো (ভারতীয় মুদ্রায় ১৬ লক্ষ ২৬ হাজার টাকা)-র বেশি, এমন সীমিত কিছু গাড়ির উপরে অবিলম্বে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিল ভারত।

১৩ ১৮

জলপাই এবং উদ্ভিজ্জ তেলের দাম কমতে পারে। শুল্কহার ৪৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনা হবে। ভোজ্য তেলের দাম কমলে আমজনতা এবং রেস্তরাঁগুলির সাশ্রয় বাড়বে। ভারতের অধিকাংশ জলপাই তেলই ইউরোপ থেকে আমদানি করা হয়।

১৪ ১৮

এ ছাড়াও বিস্কুট, পাউরুটি, পাস্তা, চকোলেট, পেস্ট্রি এবং পোষ্যের খাবারের মতো প্রক্রিয়াজাত খাবারের উপর থেকে শুল্ক বাতিল করা হবে বলে সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এই ধরনের পণ্যের জন্য এখন ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়ে থাকে। ইউরোপীয় দেশ থেকে আমদানি করা প্যাকেটজাত খাবার আরও পকেটসই হয়ে উঠতে পারে এবং ভারতীয় দোকানগুলিতে জোগান ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে আশাবাদী বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা।

১৫ ১৮

ভারতের বাজারে দাম কমতে পারে ফলের রস এবং অ্যালকোহল-মুক্ত বিয়ারেরও। ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক প্রত্যাহার করা হবে। এর ফলে আমদানি করা রস এবং বিশেষ পানীয়ের দাম কমতে পারে। কিউই এবং নাশপাতির মতো ফল সস্তা হলে তা মধ্যবিত্তের নাগালে আসবে বলে আশা করছেন অনেকেই।

১৬ ১৮

ভেড়ার মাংস, সসেজ এবং অন্য মাংসজাত খাদ্যপণ্যের দামও ধীরে ধীরে কমতে পারে এ দেশে। ৩৩ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। ফলে রসনাপ্রেমীদের পোয়া বারো। হোটেল বা রেস্তরাঁয় ভেড়ার মাংসের পদের জন্য বাড়তি টাকা গুনতে হবে না।

১৭ ১৮

চুক্তি সম্পাদিত হলেও এটি ফলপ্রসূ হতে বেশ কিছু দিন সময় লাগবে। চুক্তিটি অনুমোদন পেতে বেশ কয়েক মাস সময় লাগবে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। ২০২৭ সালের গোড়ার দিকে নতুন করছাড় কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে, নয়াদিল্লি ও ইইউ কর্তৃপক্ষ একটি সুবিন্যস্ত এবং চূড়ান্ত সংস্করণ তৈরির জন্য কাজ করবে। আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার পরবর্তী পাঁচ থেকে ছ’মাস ধরে নানা আইনি প্যাঁচ-পয়জারের মধ্যে চুক্তিটি প্রয়োগের কাজ চলবে।

১৮ ১৮

প্রথমেই চুক্তিটি এখন অনুমোদনের জন্য ইউরোপীয় পার্লামেন্টে যাবে। যদিও ইইউয়ের শীর্ষনেতারা স্পষ্ট করেছেন যে ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের পৃথক সরকারের অনুমোদনের প্রয়োজন পড়বে না। তাই সমস্ত পণ্যের দাম এক্ষুনি কমবে তা আশা করা বাতুলতা। করের হ্রাস ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রমে করা হবে। চূড়ান্ত দাম সরবরাহ, ভারতের অভ্যন্তরীণ করকাঠামো এবং উৎপাদনকারী সংস্থার মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্তের উপরও কিছুটা নির্ভর করবে।

সব ছবি: রয়টার্স ও সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement