পাকিস্তান এখন তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারে! সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে পাক সশস্ত্র বাহিনী প্রধান বা সেনা সর্বাধিনায়ক (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস) আসিম মুনিরের তেমনই এক ইঙ্গিতবাহী মন্তব্য। কিন্তু ঠিক কী ইঙ্গিত দিতে চাইছেন ফিল্ড মার্শাল মুনির?
পাক সেনা সর্বাধিনায়ক দেশের সশস্ত্র বাহিনীতে একটি সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় চরিত্র নিয়ে এসেছেন। সেটিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউজ় ইন্টারন্যাশনাল’-এর সঙ্গে সাম্প্রতিক এক আলাপচারিতায় মুনির বলেছেন, ইসলামের নামে তৈরি হওয়া পাকিস্তান এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে দেশটি তার সৃষ্টির মহৎ উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারে।
সম্প্রতি প্রাক্তন পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ় শরিফের নাতি তথা পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ়ের ছেলে জুনেদ সফদারের বিয়ের আসর বসেছিল লাহৌরে। সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ়, পঞ্জাব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম, ঊর্ধ্বতন সামরিক এবং অসামরিক কর্তা, মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা এবং শরিফ পরিবারের অনেক সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
জুনেদের বিয়ে উপলক্ষে উপস্থিত পাকিস্তানের একঝাঁক বিশিষ্ট ব্যক্তির সামনে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় ওই মন্তব্য করেন মুনির। সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে পাক সেনা সর্বাধিনায়কের সেই মন্তব্য।
কেন তিনি এমন কথা বললেন? কেনই বা মুনির মনে করেন যে, পাকিস্তান তার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জনের দ্বারপ্রান্তে? দায়িত্বগ্রহণের পর থেকে কী ভাবে দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে পুনর্গঠন করেছেন তিনি? পাকিস্তানের প্রকৃত উদ্দেশ্যই বা কী ভাবে সংজ্ঞায়িত করেন মুনির? এখন এই সমস্ত প্রশ্নই ঘোরাফেরা করছে আন্তর্জাতিক মহলের অলিন্দে।
সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মুনির মন্তব্য করেন, যে মহৎ উদ্দেশ্যে পাকিস্তান তৈরি হয়েছিল, তা অর্জনের জন্য সর্বশক্তিমান আল্লা তাঁকে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ দিয়েছেন। আর সে কারণেই দেশটি দ্রুত গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
মুনিরকে উদ্ধৃত করে ‘দ্য নিউজ় ইন্টারন্যাশনাল’ লিখেছে, ‘‘পাকিস্তান ইসলামের নামে তৈরি হয়েছিল এবং ইসলামি দেশগুলির মধ্যে একটি বিশেষ মর্যাদা ও গুরুত্ব রয়েছে পাকিস্তানের।’’ ‘আল্লার বিশেষ আশীর্বাদের জন্য’ই পাকিস্তানের এই অগ্রগতি।
মুনির আরও মন্তব্য করেছেন, অর্থ এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ইসলামি উম্মাহকে আহ্বান জানানোর চেষ্টা করেছে পাকিস্তান। সম্প্রতি সৌদি আরবের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে পাকিস্তান। রিয়াধের প্রতিরক্ষার জন্য তাদের পরমাণু অস্ত্রও নাকি সরবরাহ করা হচ্ছে। পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে তুরস্কও ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির জন্য অগ্রিম আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
মুনিরের দাবি, বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানের অবস্থান তার অর্থনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য ভাবে উন্নত হয়েছে এবং তাঁর বিশ্বাস, ভবিষ্যতে পাকিস্তানের প্রাসঙ্গিকতা এবং গুরুত্ব আরও ব্যাপক ভাবে স্বীকৃত হবে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে মুনির এ-ও মন্তব্য করেন, ব্যক্তিগত ভাবে তাঁর প্রতি যে কোনও প্রশংসা আল্লা়র কৃপা এবং বাস্তবে তা পাকিস্তানের স্বীকৃতির সমান।
পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ড এবং প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর ২০২৫ সালের মে মাসে সংক্ষিপ্ত সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছিল ভারত এবং পাকিস্তান। মুনির অনেক দিন ধরেই প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন, সেই সংঘাতে সফল হয়েছে পাকিস্তান। তার জেরে তাঁর পদোন্নতি হয়েছে বলেও মত অনেকের। পাকিস্তানের সেনাসর্বাধিনায়ক হয়েছেন ফিল্ড মার্শাল মুনির।
তবে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান হিসাবে পূর্বসূরিদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে চলেন মুনির। পূর্ববর্তী সেনাপ্রধানেরা মূলত ছিলেন প্রশিক্ষিত সেনাকর্তা, যাঁরা পেশাদার সেনার ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিলেন। আনুষ্ঠানিক ভাবে রাজনীতি এবং বিশ্বাস— উভয় থেকে দূরে ছিলেন এবং পশ্চিমি সঙ্গীত ও হুইস্কির অনুরাগী ছিলেন। অন্য দিকে, মুনির একজন হাফিজ-ই-কোরান। অর্থাৎ, যিনি কোরান মুখস্থ করেছেন। তাঁর কাছে ধর্ম তাঁর ব্যক্তিত্বের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ।
মুনির পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ এবং গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই— উভয়েরই প্রধান ছিলেন। তবে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান হিসাবে দায়িত্বগ্রহণের পর থেকে মুনির সশস্ত্র বাহিনীর চরিত্রের মৌলিক পরিবর্তনের জন্য কাজ করে চলেছেন বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
মুনিরের নেতৃত্বে, পাক সেনাবাহিনী ক্রমবর্ধমান ভাবে কেবল দেশরক্ষার জন্য নয়, বরং ইসলামরক্ষার জন্যও ভূমিকা পালন করেছে। ৭ম শতাব্দীর আরবি এবং ইসলামি প্রতীকবাদের উপরও জোর দিয়েছেন তিনি।
বালোচিস্তান এবং খাইবার পাখতুনখোয়ার সশস্ত্র বিদ্রোহীদেরও ‘ফিতনা আল-খোয়ারিজ়’ এবং ‘ফিতনা আল-হিন্দুস্তান’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে মুনিরের নেতৃত্বে। এর অর্থ, ওই বিদ্রোহীরা ধর্মবিরোধী এবং ভারতের প্রতিনিধি।
মুনিরের বিভিন্ন বক্তৃতায় বার বার তাঁর চোখে পাকিস্তান তৈরির উদ্দেশ্য ধরা পড়েছে। বিষয়টি স্পষ্টও করেছেন তিনি। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ইসলামাবাদে প্রবাসী পাকিস্তানি কনভেনশনে এক ভাষণে তিনি দ্বি-জাতি তত্ত্বকে পাকিস্তান সৃষ্টির মূল আদর্শ হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন, যার মূলে ছিল মুসলিম এবং হিন্দুদের মধ্যে অমীমাংসিত পার্থক্য।
ওই অনুষ্ঠানে মুনির বলেছিলেন, ‘‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা বিশ্বাস করতেন যে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা হিন্দুদের থেকে আলাদা। এটিই ছিল দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তি।’’ তিনি জোর দিয়ে এ-ও বলেছিলেন, ‘‘মুসলিম এবং হিন্দুরা দুটি আলাদা জাতি। এক নয়।’’
মুনির আরও মন্তব্য করেছিলেন, পাকিস্তানের আদর্শের ভিত্তি ইসলামের বিশ্বাসের ঘোষণাপত্র, কালেমার উপর নিহিত। ‘পাকিস্তানের কাহিনি’ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে দেওয়ার জন্য জনসাধারণের কাছে আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।
ফিল্ড মার্শাল মুনিরের ইসলামিক মতাদর্শ, দ্বি-জাতি তত্ত্ব এবং ভারতীয় সভ্যতার বিরোধিতার উপর বার বার জোর দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন পাকিস্তান তার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য পূরণের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলে যে দাবি তিনি করেছেন তা কেবল পাকিস্তানের সামরিক এবং জাতীয় পরিচয়ের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার জন্য নয়। বরং সম্প্রতি পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়া ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক এবং কৌশলগত প্রভাব বহন করে।