সত্তরের দশকের রক্ষণশীল সমাজে বিতর্কিত বিষয় নিয়ে চিত্রনাট্য নির্মাণ করেছিলেন ছবিনির্মাতা। বড় মাপের অভিনেত্রী সেই ছবিতে অভিনয় করলেও তিনি যেন ‘অদৃশ্য’ ছিলেন। ছবিমুক্তির পর জোড়া তারকা তৈরি হলেও সেই নায়িকা থেকে গিয়েছিলেন আড়ালেই। পরে আড়ালে থাকা নায়িকাই বলিউডের সর্বোচ্চ উপার্জনকারী অভিনেত্রীদের তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলেছিলেন। পাঁচ দশক ধরে বলিউডের পাশাপাশি দক্ষিণী ফিল্মজগতেও রাজত্ব করেছিলেন সেই অভিনেত্রী।
১৯৭৫ সালে কেএস সেতুমাধবনের পরিচালনায় প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল ‘জুলি’। সেই ছবিতে মুখ্যচরিত্রে অভিনয় করেছিলেন লক্ষ্মী এবং বিক্রম মকন্দর। তা ছাড়াও পার্শ্বচরিত্রে দেখা গিয়েছিল নাদিরা, ওমপ্রকাশ, রীতা ভাদুড়ি, সুলোচনার মতো তারকাদের। অভিনয় করেছিলেন বাঙালি অভিনেতা উৎপল দত্তও।
‘জুলি’ ছবির চিত্রনাট্য নির্মাণ সত্তরের দশকে দাঁড়িয়ে সাহসী পদক্ষেপ হিসাবে গণ্য করা হয়। অবিবাহিতা হয়েও অন্তঃসত্ত্বা হওয়া, ভিন্ধর্মের মানুষের প্রেমের পাশাপাশি অ্যাংলো ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের ছবিও তুলে ধরেছিল এই সিনেমা।
জুলি নামভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন লক্ষ্মী। তাঁর অভিনীত প্রথম হিন্দি ছবি ছিল সেটি। জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে জুলি যে ভাবে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছে এবং শেষ পর্যন্ত নিজের অধিকার বুঝে নিয়েছে, তা তৎকালীন সিনেমাজগতে নারীচরিত্রের ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিল।
জুলি চরিত্রে লক্ষ্মীর অভিনয় দর্শকের বিপুল প্রশংসা পেয়েছিল। তাঁর সঙ্গে বিক্রমের রসায়নও দর্শকের মন কেড়েছিল। ছবিমুক্তি পাওয়ার পর তাঁদের জুটি রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে যায়। পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে পুরস্কৃত হয়েছিলেন নাদিরাও।
অভিনয়ের পাশাপাশি সঙ্গীতপ্রেমীদেরও আকৃষ্ট করেছিল ‘জুলি’। এই ছবির সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন রাজেশ রোশন। সত্তরের দশকের হিন্দি ছবিতে ইংরেজি গানের ব্যবহার করেছিলেন তিনি। ছবির গানগুলিও শ্রোতামহলে সাড়া ফেলেছিল।
বক্সঅফিসে ব্লকবাস্টার ছবির তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলেছিল ‘জুলি’। কিন্তু আড়ালে থেকে গিয়েছিলেন শ্রীদেবীর মতো বড় মাপের অভিনেত্রী। ‘জুলি’ ছবিতে অভিনয় করলেও দর্শক নাকি তাঁর উপস্থিতি টেরই পাননি।
‘জুলি’ ছবিতে জুলির বোন আইরিনের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন শ্রীদেবী। সেই সময় শ্রীদেবীর বয়স ছিল ১১-১২ বছর। শিশুশিল্পী হিসাবে সেই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁকে নিয়ে মাতামাতি একেবারেই হয়নি।
বলিপাড়ার অধিকাংশের দাবি, ‘জুলি’ ছবির মুখ্যচরিত্রে অভিনয় করেননি শ্রীদেবী। ছবির মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন লক্ষ্মী। ফলে, স্বাভাবিক ভাবেই দর্শকের সবটুকু মনোযোগ ছিল প্রধান চরিত্রের দিকেই। শ্রীদেবী যখন ‘শ্রীদেবী’ হয়ে উঠলেন, তার পর দর্শক ‘জুলি’র বিষয়ে অবগত হন।
মূলত দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী বা কিশোরীর চরিত্রে নিয়মিত অভিনয় শুরু করেছিলেন শ্রীদেবী। বলিউডে নায়িকা হিসাবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল আরও অনেক পরে।
১৯৭৬ সালে তামিল ভাষার একটি ছবিতে মুখ্যচরিত্রে প্রথম অভিনয় করতে দেখা গিয়েছিল শ্রীদেবী। তার তিন বছর পর বলিউডে পদার্পণ করেছিলেন তিনি। ১৯৭৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সোলভা সাওয়ান’ নামের হিন্দি ছবিতে কাজ করে হিন্দি চলচ্চিত্রজগতে পা রেখেছিলেন শ্রীদেবী।
১৯৮৩ সালে ‘হিম্মতওয়ালা’ ছবিতে জীতেন্দ্রের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করেছিলেন শ্রীদেবী। তার পর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। হিন্দি ভাষার পাশাপাশি তামিল, তেলুগু, মালয়ালম এবং কন্নড় ভাষার ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন তিনি। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে অভিনয়জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শ্রীদেবী।
২০১৮ সালে এক আত্মীয়ের বিয়ে উপলক্ষে দুবাইয়ে গিয়েছিলেন শ্রীদেবী। সেখানকার এক বিলাসবহুল হোটেলের বাথটাবে জলে ডুবে মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৪ বছর। শ্রীদেবীর মৃত্যুর কয়েক মাস পর তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা জাহ্নবী কপূর বলিউডে আত্মপ্রকাশ করেন। শ্রীদেবীর কনিষ্ঠ কন্যা খুশি কপূরও অভিনয়জগতের সঙ্গে যুক্ত।