আবার সে এসেছে ফিরিয়া! ঘন ঘন রহস্যময় বার্তা পাঠাতে শুরু করেছে রাশিয়ার ‘ডুমস্ডে রেডিয়ো’। নামের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে গোপন কোনও রহস্য। ইউভিবি ৭৬ হল রাশিয়ার সেই রহস্যময় স্বল্পদৈর্ঘ্যের তরঙ্গ (শর্টওয়েভ) রেডিয়ো স্টেশন যার নামের মধ্যেই ভয়ের কাহিনি জুড়ে রয়েছে। মাঝেমাঝে ঘুম থেকে জেগে উঠে গোপন কোডের বার্তা ভেসে আসে এই বেতারতরঙ্গে।
প্রায় ৫৫ বছর ধরে পৃথিবীর বুকে নিঃশব্দে ভয় ছড়িয়ে যাচ্ছে ‘ডুমস্ডে রেডিয়ো’ ওরফে ‘দ্য বাজ়ার রেডিয়ো’। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় থেকে রাশিয়ার বুকে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে স্টেশনটি। ৭০-এর দশকে চালু হওয়া গোপন এই রুশ রেডিয়ো স্টেশন থেকে সম্প্রতি একাধিক বার্তা সম্প্রচারিত হয়েছে। সেই কয়েকটি শব্দবন্ধ ঘুম উড়িয়ে দিয়েছে মস্কোর প্রধান শত্রু আমেরিকা ও রাশিয়াবিরোধী ইউরোপের দেশগুলির।
সেই গোপন বার্তা প্রচারিত হতেই রাশিয়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কায় কাঁটা হয়ে রয়েছে বহু দেশ। আতঙ্কের প্রহর গুনতে শুরু করেছে মস্কোর প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলি। ১৯৭০ সাল থেকে স্টেশনটিতে কেবলমাত্র অস্পষ্ট গুঞ্জনের শব্দের মাঝে হঠাৎ করে শব্দ ও গান বাজতে থাকায় ক্রেমলিনের পারমাণবিক হামলার আশঙ্কায় থরহরিকম্প অনেকেই।
সেই বার্তায় এমন একটি দেশের নাম উঠে এসেছে যে দেশটি রাশিয়ার পূর্ব দিকের প্রতিবেশী। গত বছরের (২০২৫ সালে) ১৭ নভেম্বর মস্কোর স্থানীয় সময় দুপুর ২টো বেজে ৪০ মিনিটে একটি বার্তা ভেসে আসে রেডিয়োয়। সেখানে অন্যান্য সাঙ্কেতিক শব্দের মধ্যে লাটভিয়া কথাটি ডিকোড করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ভালগার, বোলগনিজ়ের (ইটালীয় মাংসের সস্) মতো শব্দগুলি রেডিয়োয় সম্প্রচারিত হয়েছে।
ইউভিবি ৭৬ প্রথম বার ৭০-এর দশকে পৃথিবীর মনোযোগ আকর্ষণ করে। স্টেশনটি থেকে সব সময়ই একটি যান্ত্রিক গুঞ্জন (বাজ়) প্রচারিত হয়। প্রায় ১ থেকে ১.২ সেকেন্ড স্থায়ী হয় সেগুলি। প্রতি মিনিটে প্রায় দু’থেকে তিন ডজন বার এটির পুনরাবৃত্তি হয়। এর ফলে ‘দ্য বাজ়ার’ উপাধিটি এর সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে। স্বল্পদৈর্ঘ্যের তরঙ্গ অনুসরণ করা উৎসাহীরা লক্ষ করেছেন যে, একঘেয়ে স্বরটি ভেদ করে কালেভদ্রে রুশ উচ্চারণে আলফানিউমেরিক কোড, একগুচ্ছ অবোধ্য শব্দ বা কিছু নাম উল্লেখ করা হয়।
যদিও ক্রেমলিনের তরফ থেকে এখনও পর্যন্ত এই ধরনের বেতার সম্প্রচারের কোনও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। আমেরিকা-সহ ইউরোপের বিশ্লেষকেরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে ইউভিবি ৭৬-এর নিয়ন্ত্রক সংস্থা হল রুশ সামরিক বাহিনী। কারণ এর সম্প্রচারের শক্তি, স্থায়িত্ব এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য পরিচিত অন্যান্য সামরিক যোগাযোগ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটি ইলেকট্রনিক এবং রেডিয়ো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ডেভিড স্টাপলস এই নিয়ে বিশদ গবেষণা করেছেন। তাঁর মতে, রুশ বেতার সম্প্রচারের ধাঁচটির সঙ্গে যে কোনও দেশের সামরিক চ্যানেলের সামঞ্জস্য লক্ষণীয়। যেন এটি মূলত একটি তরঙ্গের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার জন্য সক্রিয় রাখা হয়েছে।
যে কোনও সামরিক সংঘাত বা জরুরি অবস্থার সময় গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের জন্য যেন এটিকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে জরুরি সামরিক অবস্থা জারি হলে বিমান প্রতিরক্ষা সমন্বয় থেকে শুরু করে গুরুতর জাতীয় পরিকাঠামোর ক্ষতি হলে তা সম্প্রচারের জন্য বেছে নেওয়া হয় এই ধরনের বেতারতরঙ্গ।
এই ধরনের বেতারতরঙ্গের সঙ্গে আরও একটি বিশেষ তত্ত্ব খাড়া করেছেন সমরকৌশল বিশারদেরা। তাঁদের একাংশের মতে, এটি রাশিয়ার পরিধি ব্যবস্থার (পেরিমিটার সিস্টেম) সঙ্গে সম্পৃক্ত। পরিধি ব্যবস্থা হল এমন একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা যা কোনও সুরক্ষিত এলাকার (বিশেষত সামরিক ঘাঁটি) সীমানা বরাবর অনুপ্রবেশ শনাক্ত করে।
এটি ঠান্ডা যুদ্ধের পরবর্তী প্রচলিত একটি নিরাপত্তা পরিকাঠামোর অংশ। যুদ্ধ বাধলে বা সামরিক অবরোধের সময় সামরিক ঘাঁটির সঙ্গে মস্কোর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে কার্যকরী হয়ে ওঠে এটি। স্বয়ংক্রিয় ভাবে প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু করতে পারে। এই ব্যাখ্যা সত্ত্বেও, সাঙ্কেতিক শব্দগুলির প্রকৃত অর্থ কখনও জনসমক্ষে ব্যাখ্যা করা হয়নি। সুস্পষ্ট কোনও ব্যাখ্যা না থাকায় সাধারণ সামরিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে স্লিপার ইউনিট বা মনস্তাত্ত্বিক সঙ্কেত সম্পর্কিত আরও নানা ধরনের জটিল জল্পনা উস্কে দিয়েছে এটি।
ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা বৃদ্ধির আবহে ঘুমভাঙা দৈত্যের মতো জেগে উঠছে ‘ডুমস্ডে রেডিয়ো’। গত এক বছরে এর থেকে গোপন সাঙ্কেতিক শব্দ ভেসে আসার প্রবণতার হঠাৎ বৃদ্ধি নজরে পড়েছে বেতারতরঙ্গ বিশ্লেষকদের। তাঁরা বেশ কয়েকটি অস্বাভাবিক বার্তা স্বল্পদৈর্ঘ্যের তরঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছেন। বিশেষ করে সঙ্কটকালে এই বার্তার ঘনঘটা আরও বেড়ে যায় বলে দাবি তাঁদের।
রহস্যময় রুশ ‘ডুমস্ডে রেডিয়ো’য় যে বার্তাটি পাঠানো হয়েছে তাতে একটি কণ্ঠস্বরকে লাটভিয়া শব্দটি উচ্চারণ করতে শোনা গিয়েছে। সারা দিন ধরে পাঠানো বার্তাগুলি মোট ছ’টি ভাগে বিভক্ত ছিল। এনজ়েডএইচটিআই, ১৫৮৫৪, লাটভিয়া, ৫৮৯৪, ৪১৬৭, গ্যালভানাইজ়ারের মতো শব্দগুলি গুঞ্জনের মধ্যে বার বার ভেসে আসতে শোনা গিয়েছে।
১৭ নভেম্বর যে বার্তাটি পাঠানো হয়েছিল তাতে সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীদের একাংশ মনে করছেন যে, মস্কো হয়তো প্রতিবেশী দেশটির উপর আক্রমণ চালানোর জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। লাটভিয়া নেটো-ভুক্ত একটি দেশ। তা হলে দেশটির উপর যে কোনও আক্রমণ সমস্ত নেটোর সদস্য দেশের উপর আক্রমণ হিসাবে বিবেচিত হবে।
বার্তাটি বিশ্ব জুড়ে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। লাটভিয়ার উপর রুশ আক্রমণ হলে তা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞেরা। এর কারণ হল নেটোর পাঁচ নম্বর অনুচ্ছেদের চুক্তি অনুযায়ী সমস্ত সদস্য দেশ তাদের যে কোনও একটির বিরুদ্ধে আগ্রাসনের ক্ষেত্রে একে অপরকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
ইউরোপের সুরক্ষার্থে নেটো তৈরির সময় যে চুক্তি হয় তার ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, একটি সদস্য রাষ্ট্রের উপর আক্রমণকে নেটোর সমস্ত সদস্য রাষ্ট্রের উপর আক্রমণ হিসাবে গণ্য করা হবে। প্রতিটি দেশকে সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে। সোজাসুজি ভাবে বলতে গেলে আক্রমণকারী দেশকে নেটোর যৌথ আক্রমণের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
আমেরিকার ভেনেজ়ুয়েলা অভিযান ও গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ভূ-রাজনৈতিক উত্তাপের পারদ চড়ার মাঝে মস্কোর আগ্রাসন নিয়ে অনেকেই চিন্তিত। ২০২৫ সালের শেষের দিকে ইউভিবি-৭৬-এর সম্প্রচারের ধরন স্বাভাবিক অবস্থা থেকে বিচ্যুত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এ ছাড়াও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় বেশ কিছু দিন এই বেতারে স্বল্প সময়ে একাধিক বার বার্তা প্রেরণ করা হত বলে জানিয়েছেন বেতারতরঙ্গ অনুসরণকারীরা।
এ ছাড়াও এই স্বল্পদৈর্ঘ্যের তরঙ্গে বিখ্যাত ব্যালে ‘সোয়ান লেক’ গানও বাজতে শুরু করে, যা অত্যন্ত বিরল ঘটনা বলে মনে করছেন অনেকেই। স্টেশনে আরও কয়েকটি গানের ট্র্যাক বাজানো হয়েছিল। তার মধ্যে একটি পুরনো সোভিয়েতের গান ছিল।
রুশ সংবাদমাধ্যম অনুসারে, সেটি ইউক্রেনের রাজধানী কিভে আক্রমণ উদ্যাপনের জন্য যে নতুন গান তৈরি করা হয়েছিল তার একটি। শ্রোতারা সেই গানের নেপথ্যে কিছু অস্পষ্ট গুঞ্জন শুনতে পেয়েছিলেন। ‘ডুমস্ডে রেডিয়ো’য় গান পরিবেশন বিরল। স্টেশনের ইতিহাসে এটি মাত্র তিন বার ঘটেছে বলে জানা গিয়েছে।
মস্কোর কিছু সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে যে ২০২৪ এবং ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই ধরনের গান শোনা গিয়েছিল। ‘সোয়ান লেক’ তখনই বাজানো হয়েছে যখন অতীতে রাশিয়ায় রাজনৈতিক সঙ্কট বা ‘খারাপ কিছু’ ঘটেছে।
তবে কি বড় কোনও সঙ্কটের পূর্বাভাস, না কি কেবল রহস্যময় সঙ্কেত? সমস্ত আশঙ্কা তুল্যমূল্য বিচার করে বিশেষজ্ঞেরা জানিয়েছেন এই ধরনের পরিস্থিতি ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে। এমনকি সর্বাত্মক পারমাণবিক যুদ্ধের দিকেও নিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা সমরকুশলীদের।