মোবাইলের স্ক্রিন থেকে মনকে টেনে নিয়ে লেখাপড়া বা কাজে মন বসানোর মতো কঠিন চ্যালে়ঞ্জ বোধহয় খুব কমই আছে। দৈনন্দিন কাজকর্ম, এমনকি খাওয়া, ঘুম সবেতেই ভাগ বসাচ্ছে মোবাইল। সময়ের সঙ্গে পড়ুয়াদেরও ‘স্ক্রিন টাইম’ বাড়ছে। ফলে কমছে মনোসংযোগ, অবনতি হচ্ছে লেখাপড়ায়।
‘স্ক্রিন টাইম’-এর ফাঁদে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অভিভাবকেরাও হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হন কখনও-সখনও। তবে হাল ছাড়েননি মহারাষ্ট্রের একটি অখ্যাত (অধুনাখ্যাত) গ্রামের গ্রামপ্রধান। তিনি এমন একটি পন্থা নিয়েছেন, যা আগে সেই গ্রামে কেউ করে দেখাতে পারেননি। ছোট ছোট শিশু থেকে শুরু করে কলেজপড়ুয়া, এমনকি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন এমন শিক্ষার্থীদের বইপত্রের দিকে মন ফেরাতে কঠোর এক নিয়ম আরোপ করেছেন নিজের গ্রামে।
শিবদাস ভোঁসলে। মরাঠাভূমের অগরন ধুলগাঁওয়ের গ্রামপ্রধান তিনি। গ্রামের প্রতিটি ঘরের শিশু ও শিক্ষার্থীরা যাতে অন্তত চার ঘণ্টা বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকে তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন এই তরুণ। এই নির্দিষ্ট সময়ে গ্রামে সমস্ত ফোন, টিভি ও বৈদ্যুতিন যন্ত্র বন্ধ করে রাখার কড়া নির্দেশ রয়েছে গ্রামপ্রধানের।
তিনি লক্ষ করেছিলেন গ্রামের খুদে থেকে শুরু করে তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল আসক্তি ক্রমবর্ধমান। পড়াশোনার পরিবেশ ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ধুলগাঁওয়ে। শিবদাস ঠিক করেন এই ফাঁদ থেকে শিক্ষার্থীদের বার করে আনতে হবে। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। প্রথমেই তিনি নিজের বাড়ির সদস্যদের মোবাইলের প্রতি আসক্তি দূর করার চেষ্টা করেন।
পরে গ্রামের প্রতিটি পরিবারের সাধারণ এই সমস্যার সমাধানে তিনি গ্রাম জুড়ে প্রতি দিন নির্দিষ্ট সময়ে ‘ডিজিটাল নীরবতা’ পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কয়েক ঘণ্টার জন্য গোটা গ্রাম জুড়ে টিভি ও মোবাইল ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকেন আবালবৃদ্ধবনিতা। সন্ধ্যা নামলেই বন্ধ হয়ে যায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার। বইমুখী হয়ে ওঠেন পড়ুয়ারা।
‘ডিজিটাল ডিটক্স’–এর সময়সূচি নির্দিষ্ট করা হয়েছে দিনে দু’বার। গ্রামের স্পিকারে বেজে ওঠে ঘোষণা। প্রতি দিন দু’বার পড়াশোনা শুরু করার নির্দেশ ভেসে আসে মাইকে। এক বার ভোর পাঁচটায় আর এক বার সন্ধ্যা সাতটায়।
ডিজিটাল দুনিয়ার অমোঘ হাতছানি থেকে গ্রামের সমস্ত সদস্যকে দূরে রাখার কাজটা মোটেই সহজ ছিল না। গ্রামের পরিবারগুলি প্রাথমিক ভাবে এই নির্দেশের বিরুদ্ধে মত পোষণ করেছিল। কারণ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সময় বাড়ির সমস্ত মোবাইল এবং টিভি বন্ধ করে দিতে হত। এতে বাকি সদস্যদের নিয়মিত ধারাবাহিক ও সংবাদের অনুষ্ঠান দেখায় ব্যাঘাত ঘটত। এমনকি বড়দের মধ্যে যাঁরা সমাজমাধ্যমে আসক্ত তাঁদের দিক থেকেও প্রতিবাদ উড়ে এসেছিল।
প্রথম প্রথম বাধা এলেও হাল ছেড়ে দিতে নারাজ ছিলেন শিবদাস। ধৈর্য ধরে প্রতি দিন গ্রামের প্রতিটি পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলতে হয়েছে তাঁকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাতেনাতে ফল পেতে শুরু করেন গ্রামের বাসিন্দারা। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও পরীক্ষার ফলাফলে দ্রুত পরিবর্তন নজরে পড়তেই নড়েচড়ে বসেন অভিভাবকেরাও।
গ্রামের পরিবারগুলি ‘ডিজিটাল নীরবতা’ পালন করছে কি না তা নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত ঘরে ঘরে হানা দিয়ে থাকেন ‘সরপঞ্চ’ শিবদাস। তাঁর নজর এড়িয়ে এই চার ঘণ্টা মোবাইল, টিভি চালানো দুষ্কর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিয়ম কঠোর করেছেন তিনি। প্রথমে খুদে সদস্য ও পরে গৃহকর্তা ও কর্ত্রীদেরও এই নিয়মের মধ্যে বেঁধে ফেলতে সফল হয়েছেন শিবদাস।
গ্রামেরই এক বাসিন্দা সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, বাড়ির কনিষ্ঠ দুই সদস্য মোবাইলের গেমে ও টিভির কার্টুনের অনুষ্ঠানে চরম আসক্ত হয়ে পড়েছিল। পড়াশোনা তো দূরস্থান, মোবাইলের থেকে দূরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছিল।
কিন্তু গ্রামে নতুন নিয়ম চালু হওয়ার পর থেকে বাড়ির সদস্যেরাও ওই সময় সন্তানদের লেখাপড়ায় ব্যয় করেন। গৃহিণীরাও ওই অবসরে তাঁদের সাংসারিক কাজ শেষ করে নেন চটপট। ফলে গ্রামে শৃঙ্খলা ফিরেছে বলে মনে করছেন বাসিন্দারা।
মহারাষ্ট্রের এই গ্রামে ডিজিটাল ডিটক্সের তাৎক্ষণিক প্রভাব সূক্ষ্ম হলেও শক্তিশালী। নিয়ম চালু হওয়ার আগে সন্ধ্যা নামলেই ঘরে ঘরে শোনা যেত উচ্চৈঃস্বরে টিভির শব্দ। ঘরে উঁকি দিলেই দেখা যেত বাড়ির বড়রা টিভির নেশায় বুঁদ। ছোটরা সেই সুযোগে বই ফেলে মোবাইল ঘাঁটতে ব্যস্ত। কিন্তু সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে গ্রামপ্রধানের উদ্যোগ।
সাইরেনের শব্দ কানে বাজলেই একে একে টিভি বন্ধ হয়ে যায়। মোবাইল ফোনগুলি চলে যায় সাইলেন্ট মোডে। ঘরগুলি থেকে ভেসে আসে কচিকাঁচাদের পড়া মুখস্থ করার শব্দ। কলেজপড়ুয়া বা চাকরির জন্য যাঁরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা একসঙ্গে পড়াশোনা করেন। যাঁরা আগে মোবাইলে ঘাড় গুঁজে বসে থাকতেন তাঁরাই এখন পরিবার ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলার দু’দণ্ড ফুরসত পেয়েছেন।
শিবদাসের এই কড়াকড়িতে সাফল্য বেশি দিন দূরে থাকতে পারেনি। মহারাষ্ট্রের এই গ্রামের ছাত্রছাত্রীদের বেড়েছে আত্মবিশ্বাস। ফলাফলের লেখচিত্র ঊর্ধ্বমুখী। ৫৩ জন ছাত্রছাত্রী জাতীয় স্তরে স্কলারশিপ পেয়েছেন। সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক চাকরির পরীক্ষায় সফল হয়েছেন গ্রামের বাসিন্দারা। ইউপিএসসি ও এনডিএ (ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমি)–এর মতো কঠিন পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হয়েছেন অগরন ধুলগাঁওয়ের তরুণ-তরুণীরা।
পড়ুয়াদের মনোযোগ এবং শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে লক্ষণীয় পরিবর্তন এনেছে ‘ডিজিটাল ডিটক্স’। অগরন ধুলগাঁও-এর এই সফল মডেল দেখে মুগ্ধ আশপাশের গ্রামগুলিও। কাছের একটি গ্রাম, ভাদগাঁও-ও একই পদ্ধতি অনুসরণ করতে শুরু করেছে। শুধু ছাত্রছাত্রীদের জন্য নয়, গ্রামের সমস্ত বাসিন্দার টেলিভিশন এবং মোবাইল- ইন্টারনেট ব্যবহার কমানোর উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিবিসির একটি প্রতিবেদন অনুসারে, প্রতি সন্ধ্যা সাতটায় সেখানেও একটি সাইরেন বাজানো হয়। বাসিন্দাদের প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। রাত সাড়ে আটটায় আবার সাইরেন বাজলেই বাসিন্দারা মোবাইল, টিভি ব্যবহার করার অনুমতি পান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি থেকে এই ধরনের সংক্ষিপ্ত বিরতি মূল্যবান হতে পারে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরোসায়েন্সেসের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির অধ্যাপক মনোজ কুমার শর্মা জানিয়েছেন, কোভিডের সময় থেকেই তরুণদের মধ্যে অনলাইন কার্যকলাপের প্রতি আসক্তি ও সময় ব্যয় করার প্রবণতা বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উপর এই ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা গুরুতর চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে একটি হয়ে উঠেছে।