যখন-তখন লড়াকু জেটের হামলা। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বোমাবর্ষণ। পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে শত্রুর সেনাঘাঁটি বা খনিজ তেল শোধনাগারকে কাঁপিয়ে দেওয়া। পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে ইরান বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলের যুদ্ধ। সংঘর্ষকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলতে হরমুজ় প্রণালী বন্ধ করেছে তেহরান। শুধু তা-ই নয়, জোড়া শত্রুকে মাত দিতে অভিনব কৌশল নিচ্ছেন সাবেক পারস্যের কমান্ডারেরা, যা অচিরেই ‘খেলা’ ঘোরাবে, বলছে ওয়াকিবহাল মহল।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, প্রাথমিক ভাবে গোটা আরব দুনিয়ায় যুদ্ধকে ছড়িয়ে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ইরান। সেই কারণেই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন এবং ওমানের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে লাগাতার হামলা চালাচ্ছে শিয়া ফৌজ। সেখানকার শহরগুলিতে আছড়ে পড়ছে ‘হাইপারসনিক’ (শব্দের চেয়ে পাঁচগুণ গতিশীল) ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘কামিকাজ়ে’ (আত্মঘাতী) ড্রোন। তাদের রোষ থেকে রক্ষা পায়নি ইজ়রায়েলও।
ইরানের এ-হেন সংঘর্ষ কৌশল নিয়ে ইতিমধ্যেই একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জনপ্রিয় মার্কিন গণমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস। সেখানে বলা হয়েছে, আমেরিকার যুদ্ধের খরচকে বাড়িয়ে তোলার ছক রয়েছে তেহরানের। সেই লক্ষ্যে দুনিয়া জুড়ে জ্বালানি সঙ্কট তৈরি করতে চাইছেন পারস্যের সেনা কমান্ডারেরা। প্রাথমিক ভাবে এই পরিকল্পনায় তাঁরা যে যথেষ্টই সফল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ফলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ট্রাম্পের গলার কাঁটা হতে পারে ওই শিয়া মুলুক।
নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত ‘ইরান দীর্ঘ খেলা খেলতে চায় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চরম মূল্য দিতে হবে’ শীর্ষক প্রতিবেদনটির লেখক স্টিভেন এরলাঙ্গার। ইউরোপ এবং আমেরিকায় বিশিষ্ট কূটনীতিক এবং প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হিসাবে যথেষ্ট নামডাক আছে তাঁর। তিনি বলেছেন, ‘‘ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটা লড়াকু জেট হারিয়েছে ওয়াশিংটন। তেহরানের ড্রোন হামলায় ধ্বংস হয়েছে কয়েকশো কোটির রেডার স্টেশন। বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা। এগুলির কোনওটাই ট্রাম্পের জন্য স্বস্তিজনক নয়।’’
এই ইস্যুতে মুখ খুলেছেন ওয়াশিংটনের ‘জন্স হপকিন্স স্কুল অফ অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ়’-এর অধ্যাপক ভ্যালি নাসর। তাঁর কথায়, ‘‘ধারে ও ভারে অনেক উন্নত বাহিনীর সঙ্গে লড়তে হচ্ছে তেহরানকে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলের কাছে আছে শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা। প্রথমে সস্তা ড্রোন পাঠিয়ে সেগুলির ‘ইন্টারসেপ্টার’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ব্যবহারে তাদের বাধ্য করছে ইরানি ফৌজ। শেষে আঘাত হানছে ‘হাইপারসনিক’ ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে।’’
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ইরানি ড্রোনের নিরিখে ইহুদি ও মার্কিন এয়ার ডিফেন্সের ‘ইন্টারসেপ্টর’ ক্ষেপণাস্ত্র অনেক বেশি দামি। পাইলটবিহীন বিমানগুলিকে আটকাতে সেই বহর দ্রুত শেষ হচ্ছে তাদের। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে তেহরান। ফলে কিছুটা পিছিয়ে পারস্য উপসাগরে রক্ষণাত্মক জায়গায় যেতে হয়েছে তাকে। এর জেরে হরমুজ় প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ রাখার সুযোগ পেয়ে গিয়েছে শিয়া ফৌজ।
পারস্য এবং ওমান উপসাগর সংযোগকারী হরমুজ় প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। ১৬৭ কিলোমিটার লম্বা এবং ৩৩-৩৯ কিলোমিটার চওড়া ওই সঙ্কীর্ণ সামুদ্রিক রাস্তাটি আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত পথ হিসাবে স্বীকৃত। বিশ্ববাজারের ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তরল সোনা এই রাস্তায় সরবরাহ হয়ে থাকে। এ-হেন হরমুজ় প্রণালীকে ছ’সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখতে পারলেই লড়াই পুরোপুরি ঘুরতে পারে ইরানের দিকে, বলছেন সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়া ইস্তক আন্তর্জাতিক বাজারে হু-হু করে বাড়ছে খনিজ তেলের দাম। ইরানি ফৌজ হরমুজ় বন্ধ রাখায় পরিস্থিতি আরও জটিল হতে শুরু করেছে। এর জেরে বিশ্ব জুড়ে বাড়তে পারে মুদ্রাস্ফীতি, যার আঁচ থেকে বাঁচবে না ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রও। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তখন মারাত্মক চাপের মুখে পড়বেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট লড়াইকে ‘ধর্মযুদ্ধের’ দিকে নিয়ে যাচ্ছে তেহরান। এ প্রসঙ্গে নিউ ইয়র্ক টাইমসে স্টিভেন লিখেছেন, ‘‘মনে রাখতে হবে যে সারা বিশ্বে শিয়া মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের একটাই দেশ আছে। সেটা হল ইরান। আর তাই এ বারের সংঘাতকে তাঁদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই বলে তুলে ধরার চেষ্টা করছে সেখানকার সরকার থেকে শুরু করে কট্টরপন্থী ধর্মগুরুরা, যার জেরে ইজ়রায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের নাম ‘অপারেশন ফতেহ খাইবার’ রেখেছে তারা।’’
৬২৯ সালে সৌদি আরবের মদিনার অদূরে খাইবারের যুদ্ধে ইহুদিদের পর্যুদস্ত করে ইসলামি সেনা। বিশ্লেষকদের দাবি, এ বারের লড়াইয়ে ১,৩৯৭ বছরের পুরনো সেই গৌরবগাথা বাহিনী ও দুনিয়ার তামাম শিয়া ধর্মাবলম্বীদের স্মরণ করাতে চাইছে ইরান। ‘ফতেহ’ শব্দটির অর্থ হল বিজয়। ভ্যালি নাসর মনে করেন, এখানেও সাফল্যের স্বাদ পেতে শুরু করেছে তেহরান। আরব দুনিয়া তো বটেই, ভারতেও সাবেক পারস্যের পক্ষ নিয়ে বিক্ষোভে শামিল হয়েছেন অনেকেই।
যুদ্ধের গোড়ার দিকে একাই লড়ছিল ইরান। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সংঘর্ষে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হওয়ায় পাল্টাচ্ছে পরিস্থিতি। ইজ়রায়েল-আমেরিকার বিরুদ্ধে ইরাক ও লেবাননে এককাট্টা হতে দেখা গিয়েছে স্থানীয় ভাড়াটে বাহিনীকে। ইহুদিদের চক্রব্যূহে ঘিরতে ইতিমধ্যে আসরে নেমেছে লেবাননের হিজ়বুল্লা এবং ইয়েমেনের হুথি। তাদের সঙ্গে ইরাক ও সিরিয়ার বিদ্রোহীরা যোগ দিলে তেহরানের যে পাল্লা ভারী হবে, তা বলাই বাহুল্য।
ভ্যালি নাসরের কথায়, ‘‘টানা এক সপ্তাহ হরমুজ় বন্ধ থাকলে বিশ্ব জুড়ে বেলাগাম হবে মুদ্রাস্ফীতি। সেটা আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলির পক্ষেও মেনে নেওয়া অসম্ভব। তা ছাড়া আরব দেশগুলির মধ্যে সৌদি, আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন এবং ওমানে আছে মার্কিন সেনাঘাঁটি। তা সত্ত্বেও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা ঠেকাতে পারেনি তারা। এতে সংশ্লিষ্ট আরব মুলুকগুলিতে বাড়ছে জনরোষ। ফলে চাপে পড়েছে সেখানকার সরকারও।’’
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সুচতুর ভাবে ধর্মীয় জিগির তুলে আরব দেশগুলির আমজনতাকে খেপিয়ে তুলছে ইরান। পাশাপাশি, গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) জুনে হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক এবং সামরিক নেতৃত্বকে মজবুত করছে তেহরান। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি লড়াইয়ের প্রথম দিনেই সাবেক পারস্যের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইকে হত্যা করে মার্কিন এবং ইহুদি ফৌজ।
ওয়াশিংটন ও তেল আভিভ ভেবেছিল এই ধাক্কা সামলাতে পারবে না ইরান। সুপ্রিম লিডারকে হারিয়ে অচিরেই ছন্নছাড়া হয়ে যাবে তেহরান। সেই বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে খুব সহজেই নিজেদের পছন্দসই কাউকে সেখানে বসাতে পারবে তারা। বাস্তবে তা হয়নি। উল্টে আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর তিন সদস্যের একটি কাউন্সিল বা পরিষদ গঠন করে সাবেক পারস্যের প্রশাসন। সূত্রের খবর, সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে ইতিমধ্যেই খামেনেই-পুত্র মোজতবা হুসেইনিকে বেছে নিয়েছে তারা।
ইরানি ফৌজের দু’টি শ্রেণিবিভাগ রয়েছে। একটি হল আর্টেশ, যা প্রকৃতপক্ষে তেহরানের সরকারি সেনাবাহিনী। দ্বিতীয়টির নাম ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। সে দেশের সর্বোচ্চ নেতার নিয়ন্ত্রণে থাকে এই বাহিনী। গত বছরের জুনে ১২ দিনের লড়াইয়ে দুই ফৌজের সমন্বয়ের অভাব লক্ষ করা গিয়েছিল। এ বার সেটা যে তারা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির দাবি, এ বারের যুদ্ধ পরিচালনার ভার পুরোপুরি নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে আইআরজিসি। তাদের কথামতো হামলা চালাচ্ছে আর্টেশ। হরমুজ়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার নীলনকশাও ছকে ফেলেছেন সর্বোচ্চ নেতার নিয়ন্ত্রণে থাকা বাহিনীর কমান্ডারেরা। সেইমতো ডুবোজাহাজ এবং অন্যান্য রণতরী পারস্য উপসাগরে নামিয়েছেন তাঁরা। ফলে ওই সামুদ্রিক রাস্তায় তেলের ট্যাঙ্কারগুলির লম্বা লাইন পড়ে গিয়েছে।
এই যুদ্ধকৌশলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইহুদিদের সামনে ইরান কত ক্ষণ টিকবে, তা নিয়ে অবশ্য প্রাক্তন সেনা অফিসারদের একাংশের মনে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তাঁদের যুক্তি, তেহরানের শীর্ষ রাজনৈতিক এবং সামরিক অফিসারদের এক এক করে শেষ করছে ইজ়রায়েল। খামেনেই-পুত্রকেও হত্যার হুমকি দিয়ে রেখেছে তেল আভিভ। এই অবস্থায় বাহিনীর পক্ষে মনের জোর ধরে রাখা বেশ কঠিন।
অন্য দিকে ইরানে গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে আমেরিকা। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেখানকার বিদ্রোহী কুর্দ বাহিনীকে হাতিয়ার দিয়ে সহায়তা করতে পারে ওয়াশিংটন। বেশ কিছু সূত্র উদ্ধৃত করে এমনটাই জানিয়েছে সংবাদসংস্থা রয়টার্স। সে ক্ষেত্রে রণকৌশলে বড় বদল আনতে হবে তেহরানকে। ফলে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায় সেটাই এখন দেখার।