অণুগল্প
Bengali Literature

স্বাক্ষর

না এসেই বা করে কী। ঘরে একটা পেট তো নয়। অতগুলো রাবণের চুলো নেবানো কী মুখের কথা। বাপ তো কবেই পড়া ছাড়িয়ে চালকলে লেবার খাটতে পাঠাচ্ছিল। নেহাত এক বেলার ভাতটা ইস্কুলের দৌলতে জুটে যাচ্ছিল বলে তাই।

অদিতি সরকার

শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৬ ০৫:৩৩
Share:

ছবি: মহেশ্বর মণ্ডল।

এখানে ভোরটা অন্য রকম। দেশ-ঘরের মতো নরম-সরম নয়। রোদ্দুরটা উঠেই একেবারে হাঁ-হাঁ করে ফেটে পড়ে যেন। একে তো মার্বেল পাথরের সাদা-সাদা গুঁড়োয় বাতাস ভারী, শ্বাস নেওয়া দায়— তাতে ওই আগুনে গরম। কী যে এক দেশে কাজ করতে নিয়ে এল মামা!

না এসেই বা করে কী। ঘরে একটা পেট তো নয়। অতগুলো রাবণের চুলো নেবানো কী মুখের কথা। বাপ তো কবেই পড়া ছাড়িয়ে চালকলে লেবার খাটতে পাঠাচ্ছিল। নেহাত এক বেলার ভাতটা ইস্কুলের দৌলতে জুটে যাচ্ছিল বলে তাই।

তা সে ওদিকেও তো ব্যবস্থা চমৎকার। ক্লাস নাইনে উঠেছ কি ইস্কুলে দুপুরের মিড-ডে মিল বন্ধ। যেন তার পর থেকে আর কারও খিদে পাবে না। নাও, এ বার পেটে গামছা বেঁধে লেখাপড়ার গুষ্টি উদ্ধার করো।

শেষটায় মামাই নামল উদ্ধারকর্তার ভূমিকায়, বললে, “অনেক হয়েচে, এ বারে চল দেকি আমার সঙ্গে। শানতারাশের কাজ শিকবি। এক বার হাত পেকি গেলি ভাল রোজকার।”

অনেকেই যায় তাদের এদিক থেকে। মামা তো আজ কত বছর হল থাকেই ওদিকে। বছরে এক বার আসে দু’মাসের জন্য। কী কী সব জায়গার নাম— উদয়পুর, কিষণগড়। কী সব মার্বেল পাথরের কাজ করে।

কী কাজ জিজ্ঞেস করতে মামা হাত ঘুরিয়ে দিল।

“সে আচে অনেগ রকম। কাটাই, খোদাই, পাথরে নাম লেকা... গেলিই দেকতে পাবি।”

লোভ তো হয়ই। একটা ভাল ফোন, দুটো ভাল জামাকাপড়, চুলটায় ওই কানাইয়ের মতো একটু কালার—লোভ তো হয়ই।

বাবা তো এক কথায় রাজি। মায়েরও বিশেষ আপত্তি দেখা গেল না। বরং চোখে কেমন যেন লোভ-লোভ আলো ঝিকিয়ে উঠছিল মার। বলে উঠেছিল একেবারে কাজের কথাটাই, “টাকা পয়সার কী বেবস্তা, হ্যাঁ ছোড়দা?”

“মাস গেলি পেমেন, ফিকস রেট। মাল ভাঙলি-চুরলি লুকসান হলি ওর থিকে কেটে লিবে।”

“তাও কত?” স্পষ্ট আন্দাজ না পেলে স্বস্তি পাচ্ছিল না মা।

“আগে যাক ত। কাজ-কাম শিখুক। আমি যা পাই ভাগ্না কি একনেই তা পাবে? তোর বুদ্দিশুদ্দি কি লোপ পেল পারুল? কাজের নামে খোঁজ নেই, টাকা টাকা করে হেদিয়ে মরলি যে।”

“মরি কি সাধে ছোড়দা। দেকচ ত এদিগের অবস্তা।”

তা সেই আসা হল।

এ পাড়াটায় শুধু পাথরেরই কাজ হয়। সারি সারি ছোট-ছোট শেড মতো। এখান থেকে মাল রেডি হয়ে চলে যায় বড় বড় শো-রুমে। মামাই বলছিল ওকে।

কত রকম কাজ, বাপ রে বাপ। সারাটা দিন শুধু পাথর-কাটা মেশিনের চ্যাঁ-চ্যাঁ, আর ডিরিলের ঘিলু-ছ্যাঁদা করা শব্দ। ছেনির ঠং-ঠংও তাল ঠোকে তার সঙ্গে।

প্রথম এসে তো কানে তালাই লেগে গেছিল প্রায়। এখন একটু অভ্যেস হয়েছে তাও।

আর ওই পাথরের গুঁড়ো। চুলে, জামায়, ভুরুতে, চোখের পাতায়, নাকের ফুটোয়— সর্বত্র। জল খাবে তো তাতেও দেখবে সর হয়ে ভাসছে।

মামা যেখানে নিয়ে এসে তুলল, সেটা পাথরে নাম লেখানোর ওয়ার্কশপ। বাইরে সাইনবোর্ডে হিন্দি আর ইংরেজিতে নাম লেখা আছে। হিন্দি অক্ষর তো অচেনা, ইংরেজিটা বানান করে কিছুটা পড়া গেল তাও।

সুনীতা মার্বেল এনগ্রেভিং।

এনগ্রেভিং শব্দটা অচেনা। মামা বলল, ওর মানে খোদাই।

অবাক কাণ্ড, প্রচুর বাঙালি ছেলেও এখানে কাজ করে। বেশির ভাগেরই বয়স ওই পনেরো-ষোলো। এক বড় মিস্তিরি ছাড়া।

এখানে আসলে সব ছাঁট পাথরের কারবার। বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পাথর এনে তাকে ছোট-বড় সাইজ়ে কাটা। তার পর ছবি দেখে দেখে নাম আঁকো, ডিরিল দিয়ে লাইন ধরে-ধরে গুরুব কেটে যাও, রং ভরো, কালো কি সোনালি— কাস্টোমার যেমনটি বলবে। তার পর ফিনিশিং। তার আবার আলাদা লোক আছে।

পুরো ফ্যাক্টরি সিস্টেম।

ইংরেজি, হিন্দিতে লেখানোর কাজই বেশি। অন্য আরও কী সব ভাষায় লেখার কাজও আসে, তবে সে অল্প। ইংরেজিগুলো বানান করে পড়তে মজা লাগে। কোথাকার কোন লোকের নাম, কোথায় গিয়ে লাগবে—শ্যামকিশোর আগরওয়াল, শ্রীবালাজি টেম্পল ট্রাস্ট— বড় মিস্তিরি সময় নষ্ট হতে দেখলেই তেড়ে আসে যদিও।

কী খারাপ-খারাপ গালি দেয় বড় মিস্তিরি, বাপ রে! মামাকেও ছাড়ে না।

মামা এখানে ডিরিল চালায় পাথরে লেখার লাইন ধরে-ধরে। কোথাও যদি ডিরিলের মাথা একটু ফসকেছে কি লাইন বেঁকে গেছে! গেরামে যে মামার রোয়াব দেখলে চোখ ঠিকরে যায়, সেই মামা এখানে কেমন ভেজা বেড়ালের মতো মাথাটি নিচু করে বড় মিস্তিরির গাল শোনে চুপচাপ। মুখে কথাটি নেই, রাগ-অপমান কিচ্ছুটি নেই। যেন পুরো অন্য এক মানুষ।

ডেরায় ফিরে অবশ্য বড় মিস্তিরির গুষ্টির তুষ্টি করে ছেড়ে দেয়। তখন তো আর কেউ শুনছে না।

আজ নিয়ে এক মাস পুরো হল এখানে। বিকেলে ঠিকেদার আসবে কারখানায়, সব লেবারদের পেমেন মিটিয়ে দিতে।

মামা বলেছে ছোট ছেলের হাতে অত টাকা ভাল নয়, এখেনে মামাই রাখবে। খরচাটাই বা কী। সে দু’-দশ টাকা দরকার হলে চেয়ে নেবে নয় মামার কাছ থেকে। জমুক বরং। ছ’মাস কি বছর গেলে এক সঙ্গে ঘর যাওয়া হবে, তখনে সব হিসেব বাবাকে বুঝিয়ে দেবে।

কী আর করা।

ঠিকাদার লোকটার সিড়িঙ্গে-পানা চেহারায় মস্ত গোঁফ আর খ্যানখেনে গলা। মুখ বড় মিস্তিরির থেকেও খারাপ। সামনের একটা খাতায় লাইন দিয়ে টিপসই করাচ্ছে, আর গুনে গুনে টাকা হাতে দিচ্ছে।

মামা মুখ বন্ধ রাখতে বলেছিল, তাও তার পালা যখন এল, গোলমালটা হয়েই গেল।

“আমি সই করতে পারি। ইংলিশ, বাংলা দুটোতেই। করব?”

ঠিকাদার অদ্ভুত একটা চোখে তাকাল কিছু ক্ষণ, তার পর বলল, “আচ্ছা? বহুত পড়েলিখে হো? তো লেবারি কাহে কো, যা কে কালেক্টর বন যা না! সাল্‌লা! মার অঙ্গুঠা ইধার, মার। বড়ে আয়ে সাইন করনেওয়ালে।”

মামা কাছেই ছিল। গোলমাল বুঝে হাঁ-হাঁ করে এসে পড়ায় ঝামেলাটা আর বেশি দূর গড়াল না।

ডেরায় ফিরে অবশ্য মামা ছাড়ল না, প্রবল ঝাড় খেতে হল।

“এত বলেকয়ে নিয়ে গেলাম কি মুখ বন্ধ রাকবি। যা বলার আমি বলব। কতা কি কানে ঢোকেনে? ‘সই কত্তে পারি, সই কত্তে পারি!’ পারিস তো পারিস, তাতে হলটা কি? কোন কাজে লাগল তোর সই? দানাপানি তো জুটতেচে শানতরাশি করে। যত্ত সব বেঁড়েপাকামি।”

ডেরায় মাংস রান্না হয়েছিল সে রাতে। পেমেন পাওয়ার দিন এরকম ভাল-মন্দ হয়। সবাই মজা করে খায়। কিন্তু মামার বকুনিতে খুব একটা মজা টের পেল না সেদিন।

অনর্গল গালাগালি শুনতে শুনতে একটি জায়গায় জায়গায় ছাল উঠে-যাওয়া শীর্ণ কিশোর আঙুল শুধু বার বার থালার উপর হালকা সরের মতো বিছিয়ে থাকা সাদাটে পাথরের গুঁড়োয় একটিই আঁকিবুকি কেটে চলেছিল বার বার।

বিপ্লব হালদার।

অষ্টম শ্রেণি।

দুর্গাপদ উচ্চ বিদ্যালয়।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন