অণুগল্প
Bengali Literature

প্ল্যান বি

অর্জুন হো হো করে হেসে উঠল। বলল, “এসে গেছে তোমার মনীষার বাড়ি। বন্ধুর সঙ্গে লাঞ্চ করে, আড্ডা মেরে এসো। আজ রবিবার তোমার ছুটি, অর্ককে টিউশনে দেওয়া-নেওয়ার সব দায়িত্ব আমার।”

কৃষ্ণ রাজেশ্বরী মিত্র

শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৬ ০৫:৪৬
Share:

ছবি: পিয়ালি বালা।

বাতাসে বহিছে প্রেম, নয়নে লাগিল নেশা’...

এইটুকু গান হতে না-হতে অন্বেষা গাড়ির রেডিয়োটা বন্ধ করে দিল।

অর্জুন অবাক হয়ে, বলল, “কী হল, গানটা তো ভালই!”

ঝাঁঝিয়ে উঠল অন্বেষা, “তোমার পক্ষে ভাল, আমার পক্ষে নয়। কবে বসন্ত আসে, কবে চলে যায়, আজ পর্যন্ত বুঝতেই পারলাম না। এই কিছু দিন আগে অবধি নিজে লেখাপড়া করলাম, এখন ছেলেকে করাচ্ছি। এক বার স্কুল নিয়ে যাও, টিউশন নিয়ে যাও, পড়া মুখস্থ ধরো, এ বার ক্লাস টেন হবে, আরও আমার চাপ বাড়বে। তুমি তো সুখে দিন কাটাও, আমার জীবনে আছেটা কী! আমার বয়সি হিরোইনরা এখনও বলিউড কাঁপাচ্ছে, আর আমি একটা পনেরো বছর বয়সি ছেলের মা, সকলের আন্টি হয়ে বসে আছি। এ-সব আর সহ্য করব না আমি। প্রেম করব।”

অর্জুন বলল, “প্রেম তো এক কালে আমার সঙ্গে করেছিলে বলে জানতাম, এক বার করে সাধ মেটেনি! আবার করবে?”

“হ্যাঁ করব!”

অন্বেষার আত্মবিশ্বাস দেখে অর্জুন একটু সন্দিগ্ধ হল, বলল, “প্রেম করবে? না অলরেডি করছ? একটু খুলে বলো তো!”

অন্বেষা বলল, “এক জনকে আবার খুঁজে পেয়েছি, ও আগে আমার প্ল্যান বি ছিল। তোমার সঙ্গে না জমলে আমি ওকেই প্রোপো‌জ় করতাম। মাঝখানে যোগাযোগ ছিল না। এখন সে নিজেই অনলাইনে আমায় ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে।”

“তা সেই দুর্ভাগ্যবান প্ল্যান বি-কে কি আমি চিনি?” অর্জুন বলল।

“একটা হিন্ট দিচ্ছি। এক সঙ্গে পড়লেও আমাদের থেকে সে এক বছরের ছোট ছিল, বুঝলে? এখনও অবিবাহিত, মুম্বইয়ের বিজ়নেসম্যান, একটুও ভুঁড়ি নেই।”

“তার মানে? আমিও সফল চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। শুধু একটু ভুঁড়ির জন্য আমায় ত্যাগ করবে? আর, তুমিও কিছু প্রিয়ঙ্কা চোপড়া নও যে, ছোট ছেলে তোমায় পছন্দ করবে।”

“সে দায়িত্ব আমার, যদি আমি ঠিক করি, রণবীর কপূরও আমায় পছন্দ করবে।”

অর্জুন হো হো করে হেসে উঠল। বলল, “এসে গেছে তোমার মনীষার বাড়ি। বন্ধুর সঙ্গে লাঞ্চ করে, আড্ডা মেরে এসো। আজ রবিবার তোমার ছুটি, অর্ককে টিউশনে দেওয়া-নেওয়ার সব দায়িত্ব আমার।”

*****

বিকেলে মনীষার বাড়ি থেকে বেরিয়েই ক্যাব নিল না অন্বেষা। লেকের ধার দিয়ে হাঁটতে বেশ ভাল লাগছে। কেমন যেন একটা মন কেমন করা হাওয়া দিচ্ছে, মনে হচ্ছে জীবনে কে যেন নেই। প্রকৃতির সর্বত্র এখন পলাশের রং। অস্থায়ী দোকানে সাজানো রং আবির পিচকিরি টুপি নকল চুল। সামনেই দোলপূর্ণিমা।

এই বসন্তকাল, দোল উৎসব, এ-সব মনীষার জন্যই ঠিক আছে। মুম্বইয়ে চুটিয়ে মডেলিং করেছে, সদ্য ডিভোর্স করে ওখানকার পাট তুলে কলকাতা চলে এসেছে। নতুন যে ফ্ল্যাটটা দেখাতে আজ সবাইকে ডাকল, দেখে অন্বেষার মাথা ঘুরে গেছে। নতুন বাড়িতে হোলি পার্টি দিচ্ছে, তার নেমন্তন্নও করল। ওকে এত হাসিখুশি দেখে অবাক হয়ে গেছে অন্বেষা। একটা সম্পর্ক শেষ করে এত নির্ভার হওয়া যায়? অন্বেষা কি এ রকম পারবে? মোবাইলটা খুলে এক বার প্ল্যান বি-র ছবি দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার ফোনটা ব্যাগে রেখে দিল সে।

মনীষার বাড়ির গল্প ভাল করে অর্জুনকে বলবে ভেবেছিল, কিন্তু রাত একটায় ছেলের পড়া শেষ করিয়ে যখন অন্বেষা ঘরে এল, অর্জুন তখন ঢুলছে। কাল সকালেই আবার তাকে অডিটের কাজে মুম্বই যেতে হবে। অন্বেষা শুধু এটুকু বলতে পারল, পয়সা করলেও মনীষার রুচি তৈরি হয়নি। ফ্ল্যাটে গাদাগাদি করে দামি জিনিস ভরে রেখেছে। এর থেকে অন্বেষাকে ভার দিলে ও আরও দারুণ করে ওর ফ্ল্যাট সাজিয়ে দিতে পারত।

জড়ানো গলায় অর্জুন বলল, “যার বাড়ি খেয়ে এলে, তারই আবার নিন্দে করছ! তোমরা পারোও বটে...”

গা জ্বলে গেল অন্বেষার। প্ল্যান বি চালু করতেই হবে।

*****

মনীষা যখন ফোন করে পার্টির আগে ঘর সাজাতে সাহায্য করার জন্য অন্বেষাকে যেতে বলল, সে কিছু সন্দেহ করেনি। কিন্তু অর্জুন যখন সহজেই হোলি পার্টিতে মনীষার বাড়ি আসতে রাজি হয়ে গেল, তখন অন্বেষার মন কু ডাকল। মনীষা, অন্বেষা, অর্জুন আর প্ল্যান বি— ওরা সবাই এক সঙ্গেই কলেজে পড়েছে। মনীষাকে অর্জুন পছন্দ করত না, তাই ওকে নিয়ে কখনওই ভাবেনি অন্বেষা। কিন্তু এখন মনে অনেক প্রশ্ন জাগছে, মনীষার এই ডিভোর্সের কারণ কী? অর্জুনকে বলার পরই মনীষা ওকে ফোন করে ফ্ল্যাট সাজাতে বলল কেন? অন্বেষা বুঝল, ও ঘামছে।

এদিকে পার্টিতে এসে থেকে অর্জুন উসখুস করছে। হঠাৎ তার হাত ছাড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজায় বিক্রমকে দেখে মুখ শুকিয়ে গেল অন্বেষার। তার মুম্বইবাসী প্ল্যান বি এখানে কী করছে? অর্জুনই বা কেন ওর কাছে এগিয়ে গেল, তা হলে অর্জুন কি সব বুঝে গেছে!

বিক্রম আর অর্জুন অন্বেষার দিকে এগিয়ে আসছে। অন্বেষা বুঝতে পারছে, ওর কথা আটকে যাচ্ছে, বুক ধড়ফড় করছে। বিক্রম এসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “কী রে, কেমন আছিস? ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টটা অ্যাকসেপ্ট করলি না এখনও!”

অন্বেষা কোনও রকমে বলল, “হ্যাঁ... মানে, করব।”

অন্বেষার উত্তর শোনায় মন ছিল না বিক্রমের। সে বলতে লাগল, “অর্জুন আমার লাইফ সেভার ভাই। মুম্বইয়ে একটা পার্টিতে ও-ই আবার আমাকে আর মনীষাকে মিলিয়ে দিল। কলেজে যে কথা বলতে পারিনি, সেটা এ বার বলে দিলাম।”

ওরা যখন কথা বলছিল, মনীষাও এগিয়ে এল। বলল, “কেমন সারপ্রাইজ় দিলাম!”

অর্জুন আর অন্বেষাকে রেখে ওরা হাসতে হাসতে এগিয়ে গেল।

অন্বেষার নিজেকে এত বিব্রত কখনও লাগেনি, মনে হচ্ছিল এক্ষুনি পালিয়ে যায়। অর্জুনের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছিল না। অর্জুন তখন মিটিমিটি হাসছে, বলল, “তা হলে বিক্রম তোমার প্ল্যান বি। আহা! লজ্জা পাচ্ছ কেন? আমারও তো বলা হয়নি, মুম্বইয়ে আমি বিক্রমের কোম্পানিরও অডিট করি। সেই সুত্রেই আবার যোগাযোগ।”

“আর মনীষা?” কাঁপা-কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল অন্বেষা।

অর্জুন বলল, “ওর নম্বরটা ছিল। লাস্ট ডিসেম্বরে মুম্বই গিয়ে ওর ডিভোর্সের খবর পেয়েছিলাম। তার পর বিক্রমের পার্টিতে আমিই ওকে ইনভাইট করি। তোমাকেও কেমন একটা কাজ পাইয়ে দিলাম, বলো!”

অন্বেষা বলল, “দাঁড়াও, মনীষাকে পছন্দ করো না বলতে, অথচ তোমাদের কথা হয়?”

“কী আর কথা, ক’টা যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছি ব্যস...” অর্জুন প্রতিবাদ করল। তার পর একটু চুপ করে থেকে বলল, “একটা কথা বলছি, রাগ কোরো না। কলেজে তোমাকে প্রোপোজ় করার আগে আমি মনীষাকে প্রোপোজ় করেছিলাম। ও আমাকে ‘না’ বলেছিল, তাই ওকে আর পছন্দ করিনি। এর কিছু দিন পরই তোমাকে…”

আর বলতে দিল না অন্বেষা, “ও, তা হলে আমি ছিলাম তোমার প্ল্যান বি? এক্ষুনি বাড়ি চলো! এখানে আর এক মুহূর্ত নয়!”

অন্বেষা হাঁটা দিল। অর্জুন পিছনে যেতে যেতে বলল, “কী আশ্চর্য! প্ল্যান বি কি শুধু তোমার একার অধিকার? আরে, চললে কোথায়! ভাল ভাল খাবারগুলো আমাদের মুখ চেয়ে অপেক্ষা করছে... আরে, একটু আগে যা বলেছি সব বাজে কথা। আমার জীবনের প্ল্যান এ টু জ়েড... সবই তুমি... শুধু তুমি।”

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন