ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।
আজকাল হাসপাতালগুলোর অন্দরসাজ কোনও নামীদামি হোটেলের চেয়ে কম নয়। এই মুহূর্তে একটি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের ওপিডিতে বসে আছি আমি। সারি সারি চেয়ার। শীতাতপ এমন ভাবে নিয়ন্ত্রিত যে, কে বলবে বাইরে এখন প্রায় পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি! রোগী এবং রোগীর আত্মীয়রাও এসির মতোই মৃদুভাষী হয়ে চাপা স্বরে কথাবার্তা বলছে। কাউন্টার থেকে স্পিকারে সুরেলা কণ্ঠ পেশেন্টের নাম ধরে ডাকলে একে একে উঠে বিভিন্ন ওপিডি-তে ডুকে যাচ্ছে। সামনে-পিছনে দুটো বড় স্ক্রিনের টিভি ঝুলছে; সেখানে একের পর এক ডাক্তারের ছবি, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং স্বাস্থ্যপরীক্ষার প্যাকেজ দেখিয়ে বোঝানোর চেষ্টা চলছে, কেন এরাই পূর্ব ভারতের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল। কর্পোরেট হাউসগুলো জানে, কী ভাবে ব্যবসা করতে হয়!
আমি মাকে নিয়ে এসেছি। ওয়েটিং লাউঞ্জে আমি আর মা বসে আছি। অর্থোপেডিকের কাছে মায়ের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। উনি এখনও আসেননি। আমি আমার ট্যাবে চোখ বোলাচ্ছিলাম। পত্রিকার সম্পাদক আমায় পুজো সংখ্যার একটি উপন্যাসের সারাংশের পিডিএফ পাঠিয়েছেন। আমি সেটাই পড়ছি। আমি পেশাদার চিত্রশিল্পী। বিভিন্ন প্রথম সারির পত্রপত্রিকার ইলাস্ট্রেশন আর প্রচ্ছদ আঁকি আমি। আমি অকৃতদার। এইখানে একটু আগেই এসে পৌঁছেছি, আর তখনই বিপত্তি।
আমি উপন্যাসের সারাংশটি পড়ছি। মায়ের নাম পাঁচে। ডাক্তার এখনও ওটি-তে। হাতে যা সময় আছে, তাতে আমি নিশ্চিন্তে বেশ কিছুটা পড়ে ফেলতে পারব। পড়ছিলামও তাই। বেশ খানিকটা সময় পড়ার পর যেই চোখ তুলেছি, তখনই বিপত্তি। মায়ের ঠিক পিছনের সারিতে বসে আছে অমলা, পাশে একটি বাচ্চা। অমলাকে দেখে আমি স্থবির হয়ে যাই। একরাশ বিরক্তি তৈরি হয়। ওর বিরুদ্ধে আমার অনেক অভিযোগ। অনেক। অনেক।
******
আমার বাড়ি ২/ডি আর অমলাদের উল্টো দিকের ৭/সি। আমাদের বাড়ি ওদের বাড়ির মুখোমুখি। আমরা সমবয়সি। ওর সায়েন্স। আমার আর্টস। ওর আর আমার সমস্ত টিউশন আলাদা। শুধু ইংলিশ স্যরের কোচিংয়ে আমাদের দেখা হয়। আর দেখা হয় আমার চিলেকাঠার জানালায়। ওরা আমাদের চেয়ে অবস্থাপন্ন। ওর বাবা শ্যামসুন্দরবাবু আমাদের শহরের নামকরা ব্যবসাদার। ওদের ঝলমলে অবস্থা। ওর তখন থেকেই নিজস্ব ঘর। আমার সে-সব বিলাসিতার প্রশ্নই নেই। আমার বাবা জুটমিলের কর্মী। মিল বছরে চার মাস বন্ধ থাকত। ওর বাবার রাইস মিল। এলাহি অবস্থা। আমরা আশৈশব বন্ধু নই। ওই যে কোচিং, ওখান থেকেই আমাদের বন্ধুত্ব। শুরুতে ও আমাকে আদৌ খেয়াল করত কি না, আমি জানতাম না। তবে আমি বেজায় তাকিয়ে থাকতাম খানিকটা সৌন্দর্যের বিস্ময়েই। কিন্তু লুকিয়ে। ও চিরকালই একটু সাহসী, ডাকাবুকো ধরনের। এক দিন, হঠাৎই আমাকে কোচিংয়ের পরে ডাকল। এর চেয়ে লোকাল থানার আই সি ডাকলে আমি কম ভয় পেতাম। তখন অমলার পরিচয়— আমাদের শহরের ডাকসাইটে সুন্দরী এবং নামকরা ব্যবসায়ীর একমাত্র কন্যা।
“অ্যাই, তুই আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখিস কেন রে?”
“আ... আমি মানে... না মানে, সেভাবে তো নয়!” আমার উত্তরে কোনও কথা না বলে ও ঠায় আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। শুভদৃষ্টি ধরনের চাহনি। ও চোখে কাজল পরলে আমার খুব ভাল লাগে। কখনও একটা মেরুন টিপ পরে। ছোট্ট টিপ। আমি ও-সব দেখেই অবশ হয়ে যাই।
আমরা সাধারণত ওদের একটু এড়িয়েই চলতাম। শুনেছি, আমাদের নাকি আগে প্রচুর সম্পত্তি ছিল। যার ছিটেফোঁটাও আমি বা আমার শেষ তিন পুরুষ দেখেনি। থাকার মধ্যে একটা আখাম্বা বাড়ি। যার আশি শতাংশ জায়গা থেকে পলস্তারা উঠে চুনসুরকি বেরিয়ে আসে। কড়িবরগা দেওয়া ঘর। আর অন্য দিকে অমলারা এ-পাড়ায় নতুনই একরকম। আপাদমস্তক রাজস্থানি মার্বেল দেওয়া দুধসাদা বাড়ি। বাড়ির ভিতর থেকে বিদেশি কুকুরের গম্ভীর আওয়াজ আসে। ওর বাবা শ্যামসুন্দর রায় একটা সাদা সেডান গাড়ি করে যাতায়াত করেন।
সেদিনের পর থেকে আমার আর অমলার সম্পর্ক খুব বন্ধুত্বপূর্ণ। ও আমাদের বাড়ি আসতে থাকল। আমিও প্রয়োজন মতো ওদের বাড়িও যেতাম। নোটস দেওয়া-নেওয়াটাকে আমরা খুব জোরালো অছিলা হিসেবে ব্যবহার করতাম। আমি সাধারণত আমাদের বাড়ির চিলেকোঠায় পড়াশোনা করতাম। ও বাড়িতে এলে দুদ্দাড় করে উপরে একেবারে চিলেকোঠায় চলে আসত।
তখন আমাদের এইচ এস হয়ে গেছে। আমি গভীর ভাবে আমার আঁকায় ডুবে থাকি। বিকেল হলে নিয়মিত আমরা দেখা করি, আড্ডা দিই। মাঝেমধ্যে ও আমায় সিনেমা দেখায়।
এক দিন সিনেমাহল থেকে বেরিয়ে এসে বলে কিনা, “আচ্ছা আমি কি অ্যাট্রাকটিভ?”
“অ্যাঁ! হ্যাঁ। ঠিকই আছে!”
“তা-ই যদি হই, তা হলে সিনেমা হলের অন্ধকারে আমার হাতটাও এক বার ধরতে মন চায় না, না? ছেলেপিলে অন্ধকারে কী কী করে সে-সব তুই স্বপ্নেও ভাবতে পারবি না, ছাড়।”
“ধরে ফেলার চেয়ে ধরব-ধরব ভাবটাই কি বেশি আকর্ষণীয় নয়?”
“আমার বাকি জীবনটা কি একটা নীরস হেডমাস্টারমশায়ের সঙ্গে কাটবে না কি!”
সে সময় এক দিন বিকেলে আমার ছবির ইজেলটা দাঁড় করানো রয়েছে। একটা ভগ্নপ্রায় মন্দিরের ছবি নিয়ে আমি দীর্ঘদিন পড়ে আছি কিছুটা উস্কোখুস্কো অবস্থায়। বিভোর হয়ে আছি ছবিটায়। আমার চিলেকোঠায় ও কখন কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, বুঝতেই পারিনি। হয়তো অনেক ক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। জানি না। হঠাৎ পিঠে একটা স্পর্শ পেয়ে আমি কিছুটা চমকে গেছি। অমলা বলল, “অদ্ভুত। অদ্ভুত!”
তার পর হঠাৎ আমার অনেক কাছে, একেবারে ঘন হয়ে এসে ও আমার কানের কাছে মুখ আনে। আমি ওর শ্বাসের অভিঘাত অনুভব করছি। এপ্রিল মাসের এক অলৌকিক বিকেলবেলায় আমি অবশ হয়ে যেতে থাকি।
“একটা কথা দিবি? নাঃ, দুটো কথা!”
আমি অনেকটা নীচে নেমে এসেছি, ওর গলার কাছে। বললাম, “কী?”
“কখনও ছেড়ে যাবি না তো? আর কখনও আঁকা ছেড়ে দিবি না তো?”
আমি যেন নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিলাম। অমলার উষ্ণ নিঃশ্বাসের সঙ্গে আমার অন্যমনস্কতা মিশিয়ে নিলাম। আমরা একে অপরকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললাম। সদ্য আঠারোর দুই কিশোর কিশোরীর অধুনা জাগ্রত দেহ-মন নিজেদের দ্বিধার গোলকধাঁধায় পাগল হতে থাকল। সেই বিকেল যেন আমাদের আরও অনেক নিবিড় করে বেঁধে রাখল।
আমাদের উচ্চ মাধ্যমিকের রেজ়াল্ট বেরল। ও কেমিস্ট্রি অনার্স, আর আমি কলকাতা আর্ট কলেজ। আমার আঁকাই জগৎ। সপ্তাহান্তে আমাদের দেখা হয়। আমরা ভাল থাকি। এভাবে আরও কয়েকটা বছর কাটল। ওর গ্র্যাজুয়েশন হল, আমারও। আমি কমার্শিয়াল আর্টের উপরে একটা কোর্স করতে হায়দরাবাদ গেলাম। ওর সঙ্গে কথা হত। তখন আমাদের মোবাইল ওয়টস্যাপ সব এসেছে।
আজ হঠাৎ এ-সব মনে হচ্ছে। যত বার আমার চোখ আমার সামনে বসা অমলার দিকে যাচ্ছে, তত বার যেন কিছুটা স্মৃতি চলকে আসছে। দু’-এক বার আমার আর ওর চোখাচোখি হল। অনেক বছর পরে হলেও আমি জানি, ও-ও আমায় বিলক্ষণ চিনেছে। পত্রপত্রিকায় আমার নাম বেরোয়, কাজ বেরোয়, বিভিন্ন পুজোর থিমে আমার কাজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে পুরস্কৃত হয়, শহরের বিভিন্ন গ্যালারিতে আমার কোনও না কোনও সময় প্রদর্শনী চলে। টিভির টক শোয়ে বক্তব্য রাখার জন্য আমি যাই। আমাকে অনেকেই চেনেন। আমায় দেখে অমলার অস্বস্তি আমার নজর এড়ায়নি।
সেই যে হায়দরাবাদ গেলাম, তখন থেকেই আমার অমলাকে অচেনা লাগতে শুরু করেছিল। সেই আন্তরিকতাটা যেন উধাও হয়ে গেল। ফোনে ব্যস্ত পেতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আমার মিসড কল দেখেও ফোন করত না। গভীর রাতেও ফোনে ব্যস্ত।
আমি পরের দিন জিজ্ঞেস করলে বলত, বন্ধুদের সঙ্গে কনফারেন্স কলে ছিল। আমি হতাশ হতে শুরু করি। আমার কাজকর্মের ক্ষতি হতে থাকে। যার হাত ধরে এগোব বলে ভেবেছিলাম, সেই হাতের স্পর্শ আমি আর অনুভব করতে পারছিলাম না। অত দূর থেকে পরিস্থিতি আঁচও করতে পারলাম না।
এক দিন হঠাৎই হঠকারিতায় কোর্স মাঝপথে ছেড়ে কলকাতা ফিরে এলাম। থাকতে পারছিলাম না, অসহায় লাগছিল। দিনের পর দিন কথা হত না। কখনও ফোন ধরলে দু’-একটা কথা বলেই রেখে দিত। আমি বুঝতাম, অমলা আমায় এড়াতে চাইছে। কিন্তু কেন? আমরা তো অভিন্ন আত্মাই ছিলাম।
ফিরে এসে ফোন করলাম অমলাকে। ও ফোন ধরল না। ওর বাড়িতে আমার অবারিত দ্বার। দেখা করতে গেলাম। ওর মা’র মুখোমুখি হলাম।
“কাকিমা, অমলা নেই?”
“নাঃ! কী দরকার বলো!” কাকিমার গলায় ঔদাসীন্য ঝরে পড়ল। আমি যেন অচেনা এবং অবাঞ্ছিত কেউ। তবে কি তার ছিঁড়ে গেছে কবেই! জানতে পারিনি? আমি অমলার সঙ্গে দেখা করার জন্য পাগল হয়ে গেলাম। সারা শহর এলোমেলো ঘুরে বেড়াতাম। এক মুহূর্তের জন্য, খালি এক বার দেখা করতে চাইছিলাম। সেটুকুও হচ্ছিল না।
সাত-সাতটা দিন কেটে গিয়েছে আমি কলকাতা ফিরে এসেছি। কিছুই ভাল লাগে না। বুঝতে পারি, ভিতরে ভিতরে ধ্বংস হচ্ছি। বন্ধুদের মধ্যে যার সঙ্গে আমার নাম এক সঙ্গে উচ্চারিত হত, যাকে আমি নিজের সবটুকু উজাড় করে চেয়েছি, সেও চেয়েছে আমাকে, তার সঙ্গে এক মুহূর্তের সাক্ষাতের জন্য আমায় এভাবে প্রাণপাত করতে হবে? আমরা দিনের পর দিন অগণিত ভাল মুহূর্ত কাটিয়েছি। আমার জীবনের সমস্ত ওঠাপড়ায় যার ছোঁয়া লেগে আছে, তাকে একটা গোটা সপ্তাহ জুড়ে আমি পাগলের মতো খুঁজে চলেছি; অথচ আমাদের বাড়ি শুধু একই পাড়ায় নয়, সামনাসামনি। আমি রাতের জানালায় বিনিদ্র বসে থাকি যদি ও এক বার ওর শোবার ঘরের জানালাটা খোলে। কিন্তু না। ও ততদিনে আমাদের দিকের সমস্ত জানালা বন্ধ করে দিয়েছে।
এক দিন রবীন্দ্রসদনে একটা প্রদর্শনীতে এলোমেলো ঘুরছি। হঠাৎই একেবারে সামনে, কয়েক গজ দূরেই আমি অমলাকে দেখলাম। দৌড়ে সামনে গেলাম, ওর মুখোমুখি হলাম। ওর চোখ সানগ্লাসে ঢাকা। একটা মেরুন রঙের সালোয়ারে ওকে সেদিনও অপূর্ব লাগছিল। আমি ওর হাত ধরলাম, যেমন ধরতাম। ও তাকাল। চোখে বিরক্তি। চাপা স্বরে বলল, “আহ্! কী হচ্ছে কী? স্ট্রেঞ্জ!”
“তুই দেখা করছিস না। কথা বলছিস না। কত বার ফোন করছি। আমি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। কিসের শাস্তি দিচ্ছিস আমায় তুই?”
“আমার এ-সব সিন ভাল লাগছে না। ও এক্ষুনি চলে আসবে! তুই এখন যা...”
সেই রাতে অমলার সেই ‘ও’ আমায় ফোন করলেন। জানালেন, উনি অমলার জীবনে এসেছেন। উনি অমলার বাবার বন্ধুর সুপুত্র। ইঞ্জিনিয়ার। এও জানালেন, উনি প্রজেক্টের কাজ নিয়ে জাপান যাবেন। যাওয়ার আগে অমলাকে বিয়ে করবেন। উনি আমার কাউন্সেলিং করে বললেন, ছোটবেলার একটা ইনফ্যাচুয়েশনকে অযথা গুরুত্ব দিয়ে আমি নাকি সময় নষ্ট করছি। বোঝালেন, আমি যেন ধীরে ধীরে অমলাকে ভুলে যাই। আমি পাথরের মতো অমলার ‘ও’-র কথা শুনলাম।
এর পর এক দিন অমলার বিয়ে হল। সারা পাড়া জুড়ে আলোয় মাখামাখি। আমায় মা বলল, কোথাও ক’দিন ঘুরে আসার জন্য। আমি গেলাম না। সারা সপ্তাহ জুড়ে অমলার বিয়ের তোড়জোড় দেখলাম।
ভিতরের অভিমান লাভার মতো জমে জমে ঘৃণার ব্যাসল্ট শিলায় রূপান্তরিত হল। মনের ভিতরের রক্তক্ষরণ কালো হয়ে জমা হচ্ছিল কোনও গোপন কুঠুরিতে। আমি প্রেম নামক প্রতিষ্ঠানটিকেই অবিশ্বাস করতে শুরু করলাম, আর বিবাহকে মনে হল ব্যর্থ ধারণা! সেদিনের পর থেকে আমি অমলাকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করি।
আজ আমার চোখের সামনে অমলাকে ঠিক ক’বছর পর দেখলাম জানি না। অনেক বছরই হল। কিন্তু আজও মনে হয় যেন সেদিনের ঘটনা। ওকে দেখে গা ঘৃণায় রি-রি করে উঠছে তখন থেকেই। সমস্ত ঘটনা যেন ফ্লিপবুকের মতো চোখের সামনে ভেসে উঠল। আমি সে সময় শুধু একটি বার, শেষ বারের মতো দেখা করার অনেক চেষ্টা করেছিলাম। আমাদের বন্ধুবৃত্তের অন্যদের দিয়েও অনেক বার বলিয়েছিলাম, কিন্তু সে সেটুকুও করেনি। আমার মনে এক দিনের জন্যও এই ঘৃণার বোধ প্রশমিত হয়নি, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে গিয়েছে। আমি সম্পূর্ণ এক অন্য মানুষ।
ইতিমধ্যে মায়ের ডাক্তার দেখানো হয়েছে। কিছু টেস্ট করানোর জন্য আমি কাউন্টারে দাঁড়িয়েছি। আমার পাশের কাউন্টারে এসে দাঁড়িয়েছে অমলা। বেশ অনেকটা কাছে। আমার ক্রোধের উদ্গীরণ হচ্ছে। অসহ্য লাগছে। বার বার ওর দিকে চোখ চলে যাচ্ছে আর তত বারই দেখছি, ও আমার দিকেই তাকিয়ে। আমি নিজেকে আপ্রাণ ভাবলেশহীন রাখার চেষ্টা করছি। অমলার চোখে যেন ছলছল করছে অনেক কথা। অমলা যে বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে আছে, ভারী মিষ্টি তার মুখটা। বছর পাঁচেকের এই বাচ্চাটি ওরই। ওকে মা বলছে।
দূর থেকে দেখে আন্দাজ করেছিলাম, এখন পাশ থেকে কথাবার্তা শুনে বুঝলাম— বাচ্চাটি বিশেষ ভাবে সক্ষম। বাচ্চাটি অমলার কোল থেকে নেমে গেল, কিছুটা বায়না করেই। অমলা বলল, “কোথাও যেয়ো না। এখানে এসো। দৌড়িয়ো না।”
বাচ্চাটি অস্ফুটে কিছু একটা বলল। আমি বুঝলাম না। অমলা বলল, “না, একদম না!”
বাচ্চাটি এলোমেলো ছোটাছুটি করতে শুরু করল। বুঝলাম দৌড়োদৌড়িটা সে উপভোগ করছে। অমলাও ওর কাউন্টার ছেড়ে ছুটে গেল। বাচ্চাটির এখনও সেভাবে দেহের ভারসাম্য আসেনি।
ছোটাছুটি করতে করতে বাচ্চাটা আমার খুব কাছে এসে মেঝেতে সপাটে আছাড় খেল। একেবারে মুখ থুবড়ে। আমি স্বাভাবিক প্রবণতায় ছুটে গিয়ে বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নিলাম। অমলা কিছুটা দূরে থমকে গেল। আমি কাউন্টার ছেড়ে এসে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে চেয়ারে বসেছি। ওর ঠোঁটের কাছে কেটে গেছে সামান্য। খুব কাঁদছে। আমি বুকের কাছে ওকে ধরে রাখলাম। ঠোঁটের রক্ত মুছিয়ে দিলাম। হাসপাতালের হাউসকিপিংয়ের এক জন এসে একটা ব্যান্ড-এড দিয়ে গেলে সেটা লাগিয়ে দিলাম। বাচ্চাটা ফোঁপাচ্ছে।
আমি পকেটে হ্যান্ডবুক রাখি। সেটা ওর সামনে রেখে কার্টুন আঁকতে থাকলাম। ক্যারিকেচার এঁকে এঁকে ওর কান্না থামানোর চেষ্টা করলাম। ওর মা আমার সামনে উল্টো দিকের চেয়ারে বসে। আমার মায়ের পাশে। আমার মা অমলাকে চিনলেও কথা বলছে না। অমলা নিশ্চল হয়ে আমার আর বাচ্চাটার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে। শেষমেশ আমার কার্টুনে বাচ্চাটি মজা পেল। আমি পেনসিলের এক-একটা স্ট্রোকে একটা করে জন্তু-জানোয়ারের কার্টুন আঁকছি আর বাচ্চাটা অদ্ভুত ভাবে হাসছে। ওর মুখের লালা আমার হাতে এসে পড়ছে, আমার জামায় এসে লাগছে। ধীরে ধীরে ও শান্ত হল। এ বার ওর মায়ের কাছে ওকে ফেরত দিতে হবে। আমি ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। ওর গায়ের গন্ধ আমার মনের ভিতর পর্যন্ত পৌঁছে গেল। এক বুক নিঃশ্বাসে টেনে নিলাম সে সুবাস। অমলার স্পর্শেরও ঠিক এমনই সৌরভ ছিল। বাচ্চাটার কপালে একটা হামি খেলাম আমি। সেও অদ্ভুতভাবে আমার গালে হামি খেতে গিয়ে আমার মুখ ভিজিয়ে দিল। ওর মায়ের হাতে বাচ্চাটাকে ফেরত দিলাম। বললাম, “এ বারে সামলে রাখিস। আর কাছছাড়া করিস না।”
হাসপাতালের কাজ মিটিয়ে বাড়ি ফিরছি। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। সঙ্গে হালকা হাওয়া। ক’দিন যা গরম পড়েছিল! অদ্ভুত ব্যাপার, আমার মনে হচ্ছে বুকের ভিতরের সেই অভিমান আর ঘৃণার আগ্নেয়গিরি ভেদ করে একটা নদী বেরিয়ে আসছে। কোত্থাও কোনও ঘৃণা নেই; অভিযোগ নেই!
আমিই বুঝতে পারিনি এ যাবৎ, আপনারা বুঝতে পেরেছিলেন কি? আসলে আমি আজও অমলাকে ভালবাসি, খুব ভালবাসি!
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে