হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের আরও কিছু আকর্ষণীয় ছবি দেখতে, অ্যাপ্ল অ্যাপ স্টোর (আই ফোন) অথবা গুগ্ল প্লে স্টোর (অ্যান্ড্রয়েড) থেকে ABP AR App-টি ডাউনলোড করে এই ছবিটি স্ক্যান করুন।
ও, আপনাদের বলিনি, হেমন্তদা-ই আমার প্রথম বাড়ি কেনার ডাউন পেমেন্ট করে দিয়েছিলেন আমায় না জানিয়ে।
সে এক ঘটনা বটে। তখন আমি একটু-আধটু বাড়ি খোঁজাখুঁজি করছি। এ কথা হেমন্তদা’র সহকারী শ্যাম জানত। এই সময়টায় সুরকার নচিকেতা ঘোষ তাঁর নর্থ বম্বে সোসাইটির বাড়িটি বিক্রি করার কথা ভাবছিলেন। শ্যাম এক দিন আমায় বলল, ‘কী, বাড়িটা কিনবে নাকি?’ বললাম, ‘খেপেছ? পয়সা কোথায়?’
এর পর এক দিন হেমন্তদা মিউজিক রুমে বসে বললেন, ‘গুলজার, তুমি এই বাড়িটা কিনবে নাকি?’ আমি শ্যামের দিকে তাকালাম। শ্যাম বলল, ‘আমি দাদার সঙ্গে কথা বলেছি।’ আমি আবারও বললাম, ‘দাদা, কী করে কিনব বলুন। অনেক টাকা লাগবে তো?’ হেমন্তদা আমায় এর পর অর্ডার দিলেন, ‘শোনো, কাল গিয়ে নচিকেতা ঘোষের সঙ্গে কাগজপত্রে সইসাবুদ করে আসবে। আমি টাকা দিয়ে দিয়েছি।’ আমি ঘোরের মধ্যে। কিছু বলার আগেই বললেন, ‘চিন্তা নেই, আমি তোমার থেকে টাকা কেটে নেব। তোমার চাকরি পাকা, বুঝলে?’ সঙ্গে মৃদু হাসি। সেই আমার প্রথম নিজের বাড়ি। পেয়িংগেস্ট থাকা থেকে ছুটি।
আমার আনকোরা একটা ছোট্ট বাড়ি হল, সে বাড়ি ঘরদোর হয়ে উঠল এক জন ব্যাচেলরের অনভ্যস্ত চা তৈরির মহিমায়, বইয়ের স্তূপ জমা হল এখানে-ওখানে, আর ব্যাচেলর গুলজারের বাড়ির সিগনেচার হয়ে উঠল বন্ধুদের অনন্ত আড্ডা। তাঁদের মধ্যে হেমন্তদা তো ছিলেনই, মাঝে মাঝেই চলে আসতেন তনুদা (তরুণ মজুমদার)। বেজায় আড্ডা, চা আর রবীন্দ্রসংগীত চলত ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
এমনই কোনও একটা দিনে মাটিতে মাদুর বিছিয়ে হেমন্তদা দরাজ গলায় রবীন্দ্রসংগীত গাইছেন, সঙ্গে গাইছেন তনুদা। (যাঁরা জানেন না যে তরুণ মজুমদার অসাধারণ রবীন্দ্রসংগীত গাইতে পারেন, তাঁরা এই বেলা নোট নিয়ে নিন।) এমন সময়, রবীন্দ্রসংগীতের একটা লাইনের কথা হেমন্তদা কিছুতেই মনে করতে পারছেন না। সেই লাইনে গিঁট এমনই লাগল যে তনুদাও কিছুতেই মনে করতে পারছেন না কথাগুলো। আমি চা করছিলাম, বুঝতে পেরে বাইরের ঘরে এসে বুকশেল্ফ থেকে গীতবিতান নামিয়ে সূচিপত্র খুঁজে গানটা বের করে দিলাম। দুজনেই হতভম্ব। স্তব্ধবাক। ‘তুমি এত ভাল বাংলা পড়তে পার নাকি?’
চোখেই একটা কলার তোলার দৃষ্টি ছড়িয়ে, মৃদু হেসে চা-পর্ব শেষ করতে গেলাম। মনে মনে বললাম, শুধু পড়া কেন, বাংলা লেখায় আমি এখন এমন চোস্ত হয়েছি, জানলে তাক লেগে যাবে। আসলে, তখন যে আমার রোজ রোজ বাংলায় প্রেমপত্র লেখালিখি, চালাচালি হচ্ছে এক বাঙালি মেয়ের সঙ্গে (যিনি কিনা পরে আমার ঘরনি হবেন), সে কথা ওঁরা জানেন না।
হেমন্তদার কাছে রবীন্দ্রসংগীত শোনাটা আমার কাছে একটা বিরল নেশার মতো ছিল। যখন পেতাম তখন অনেকটা, আর যখন পেতাম না— মাদক না-পাওয়ার মতো ছটফট করতাম। সেই সময়টায় আমি খুব কলকাতা যাওয়া-আসা করতাম। হেমন্তদার সঙ্গে কত জলসায় গিয়েছি। তখনই প্রথম আমার বাংলার শহরতলি আর গ্রাম দেখা, চাখা।
হেমন্তদা তখন সূর্যের পাশাপাশিই থাকেন। তাই যে কোনও জলসায় ওঁর ডাক পড়ত সব শেষে। জলসার বিশাল প্যান্ডেল বা শামিয়ানার পাশে একটা ছোট প্যান্ডেল মতো করা থাকত, যেখানে সব আর্টিস্টরা বসতেন। কাঠের বেঞ্চি বা চেয়ার, সঙ্গে চা-বিস্কুট— এই বরাদ্দ ছিল।
হেমন্তদা জলসা শুরুর কিছু ক্ষণ পর থেকে একটা কাঠের বেঞ্চিতে টান হয়ে শুয়ে পড়তেন আর ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’, ‘যখন ভাঙল মিলনমেলা’, ‘আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান’, একের পর এক এই সব গান গাইতেন। আর রাতের পর রাত আমি ঐশ্বরিক ক্ষণগুলোতে ডুবে থাকতাম, যা বোধ হয় কেবল আমার জন্যই রচিত হত।
হেমন্তদার মতো অমন ভদ্রলোক আমি প্রায় দেখিইনি। আমি তখন হেমন্তদার পরবর্তী প্রযোজনায় একটা সিনেমার জন্য চিত্রনাট্য লেখালিখির কাজ শুরু করেছি। অনেক দূর এগিয়েছে কাজ। এক দিন বাড়ি ফিরে এসে হেমন্তদার লেখা একটা নোট পেলাম— ‘গুলজার, আমি এই সিনেমাটা আর করতে পারব না। আমার খুব খারাপ লাগছে, কিন্তু সত্যিই এই প্রোজেক্টটা এই মুহূর্তে আমার পক্ষে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।’ তখন সম্ভবত ‘সান্নাটা’ বলে একটা সিনেমা উনি প্রযোজনা করেছিলেন, যেটা বক্স অফিসে ফ্লপ করল।
এক বার ভাবুন তো, হেমন্তদার মতো এক জন ক্যারিশ্মাটিক, বিখ্যাত সিঙ্গার-প্রোডিউসার আমার মতো নেহাতই বাচ্চা এক গীতিকার-চিত্রনাট্যকারের বাড়ি এসে খবরটা দিয়ে যাচ্ছেন। চাইলে উনি আমায় কিছু না-ই বলতে পারতেন, বা ফোন করতে পারতেন। কিন্তু উনি তো হেমন্তদা, ইমোশনাল এক জন মানুষ। হয়তো ভেবেছিলেন, ফোনে বা লোক মারফত শুনলে আমার কষ্ট হবে, সম্মানে লাগবে, তাই নিজে বলতে এসেছিলেন। বয়সে ছোট, তেমন ফেমাস নয়, স্ট্রাগলিং এক জন আর্টিস্টের জন্য এতটা মন খারাপ? নিজেকে বেশ ভাগ্যবান মনে হয়েছিল।
সত্তরের মাঝামাঝি হবে বোধ হয়। সময় বদলাচ্ছিল। তার চেয়েও বেগে বদলে যাচ্ছিল বলিউড, বম্বে। বুঝতে পারছিলেন হেমন্তদা। আর তাই উনি বম্বে থেকে কলকাতায় পাকাপাকি চলে আসার প্ল্যান করলেন। বেশ কয়েক বছর ধরে ওঁর এই শিফ্টিং প্রসেসটা চলেছিল। ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিয়ে চলে এলেন। আমার মনে হয়, ভালই করেছিলেন। বম্বে খুব রুথলেস। ওরা হেমন্তদার মতো এক জন শিল্পীকে ওঁর প্রাপ্য সম্মান দিতে পারত না। বরং অনেক বেশি অসম্মান আর বিস্মৃতির অতলে চলে যেতেন হেমন্তদা।
বাংলা ওঁকে প্রাপ্য সম্মান, শিল্পীর মর্যাদা দিয়েছে। সেটা পাওয়ার হক ওঁর ছিল। হেমন্তদা একটা বিশালকে নিজের মধ্যে অনায়াসে সেঁধিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু ওঁর মতো বিশাল শিল্পীকে ধরে রাখার আধার তো আর সব জায়গায় নেই। সবার হৃদয় এত বড় হয় না, বাঙালিদের হয়।