Bengali New Year Special Recipes

ফিউশনের বদলে প্রিয়জনের মুখে তুলে দিন বাহারি সব সাবেক মিঠাই, জানুন নেপথ্যের কাহিনি

বাঙালির প্রাণের পয়লা বৈশাখে মিষ্টি হাওয়ায় এখন ভেসে আসে নিত্যনতুন মিষ্টির নাম আর স্বাদ। প্রযুক্তি আর গবেষণার দৌলতে তৈরি নিত্য নতুন হাজার মিষ্টির দিকে ঝুঁকছেন ক্রেতারাও। বাঙালি মিষ্টির সাম্রাজ্যে ধীরে ধীরে জায়গা দখল করছে রকমারি ফিউশন মিষ্টি। দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার একান্ত আপন কিছু মিষ্টির নাম আর স্বাদ।

Advertisement

সায়ন্তনী মহাপাত্র

শেষ আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৫৯
Share:

মিষ্টিমুখেই বর্ষবরণ। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

বাংলার রকমারি খাবারের গল্প, তার ইতিহাস ছড়িয়ে আছে নানা লেখা, কাব্য আর লোকগাথায়। সে সব খুঁজে একত্র করা, সহজ কর্ম নয়। উপকরণের খুব বেশি তারতম্য না হলেও বাংলার মানুষের খাদ্যাভ্যাস পাল্টে গিয়েছে যুগে যুগে। একবিংশ শতক থেকে পিছিয়ে যেতে যেতে ষোড়শ শতকের মঙ্গলকাব্যের যুগ পেরিয়ে আরও পিছিয়ে গেলে যে সব খাবারের নাম, পাকপ্রণালী উঠে আসে, তা আজকের প্রজন্মের কাছে ভীষণ অচেনা, হয়তো খানিক বিস্ময়করও।

Advertisement

বাঙালির প্রাণের পয়লা বৈশাখে মিষ্টি হাওয়ায় এখন ভেসে আসে নিত্যনতুন মিষ্টির নাম আর স্বাদ। প্রযুক্তি আর গবেষণার দৌলতে তৈরি নিত্যনতুন হাজার মিষ্টির দিকে ঝুঁকছেন ক্রেতারাও। বছর শুরুর হালখাতায় ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়া হয় মিষ্টির প্যাকেট। আগে সেই প্যাকেটে থাকত নিমকি, লাড্ডু, শনপাপড়ি, অমৃতি, দানাদার, লবঙ্গলতিকা। বদলে যাচ্ছে সেই পয়লার প্রথাও, সেই জায়গা ধীরে ধীরে দখল করছে রকমারি ফিউশন মিষ্টি। দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার একান্ত আপন কিছু মিষ্টির নাম আর স্বাদ।

স্মৃতির অতল থেকে যে সমস্ত নাম উঠে আসবে তার অর্ধেকই আমাদের কাছে অশ্রুত। এ দেশের সবচেয়ে পুরাতন মিষ্টি হিসেবে পরিচত ‘অপুপ’-এর নাম হয়তো বেশির ভাগ বাঙালির কাছেই অচেনা। অথচ এই মিষ্টি বাঙালির খুব চেনা। যবের আটা, ঘি ও মধু দিয়ে তৈরি এই মিষ্টিকে বর্তমানের মালপোয়ার আদি রূপ বলেই ধরা যায়। এই মিষ্টির উল্লেখ পাওয়া যায় ঋগ্বেদে।

Advertisement

নববর্ষের দিন কয়েক়টি হারিয়ে যাওয়া মিষ্টির পদ বানিয়ে করে ফেলতে পারেন উদ্‌যাপন। ছবি: সংগৃহীত।

একই ভাবে মহাভারতের সময়ের মিষ্টি শশকুলির নামও খুব কম লোকেই জানেন। শ্রীমদ্ভাগবত গীতায় এই মিষ্টির কথা উল্লিখিত আছে। চাল বা যবের গুঁড়োর সঙ্গে তিল আর চিনির মণ্ড তৈরি করে তাকে বেশ বড় আকারের কানের আকৃতি দেওয়া হয়, তার পর ঘিয়ে ভাজা হয়। দেখতে হয় খানিকটা ভাজা পিঠের মতো। আবার মহাভারতের শান্তি পর্বে খোঁজ পাওয়া যায় ক্রিসারা নামের একটি মিষ্টির। আধভাঙা চালের সঙ্গে চিনি, দুধ, তিল আর বিভিন্ন সুগন্ধি দ্রব্য দিয়ে তৈরি এই মিষ্টি আবার এখনকার তিলের পায়েস এবং ফিরনির এক মধ্যবর্তী সংস্করণ।

মধুপর্ক, মহাভারতের যুগের আরও একটি জনপ্রিয় মিষ্টি। এর সঙ্গে এ কালের মধুপর্ক নামের মিষ্টির মিল থাকলেও দু'টির পাকপ্রণালী কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে কালের মধুপর্ক ছিল সমপরিমাণ মধু, দই এবং ঘিয়ের এক মিশ্রণ, যা মহাভারতের কালে অতিথি আপ্যায়নের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল। এখন যে মধুপর্ক বাজারে বিক্রি হয়, তার চেহারার সঙ্গে দইয়ের অনেকটা সাদৃশ্য আছে। এ কালের শ্রীখণ্ডের মতো সেই সময় ছিল রাসোলা, যা জল ঝরানো দইয়ের সঙ্গে চিনি এবং বিভিন্ন সুগন্ধি মিশিয়ে তৈরি করা হতো। তেমনি গুঁড়ো যব বা গমের ছাতু ঘিয়ে ভেজে চিনি ও ঘন দুধ সহযোগে তৈ্রি আজকের সুজির মোহনভোগের সেকালের আদি সংস্করণ ছিল সাম্যব।

Advertisement

আবার শ্রীহর্ষের 'নৈষধ চরিত' থেকে চালুক্যরাজ সোমেশ্বরের 'মানসোল্লাস' গ্রন্থে যে লড্ডুকার খোঁজ পাওয়া যায়, তা আসলে আজকের লাড্ডু বা নাড়ুর আদি সংস্করণ। সুশ্রুত সংহিতার আমলে এটি ব্যবহৃত হত বিশেষ উপায়ে। তেতো পাঁচন এই মিষ্টি লড্ডুকার মধ্যে ভরে রোগীকে খাওয়ানো হতো।

এই সব হারিয়ে যাওয়া বা বদলে যাওয়া বিভিন্ন পদের ইতিহাস শুধু রসনাতৃপ্তির বিষয় নয়— এ এক গভীর সাংস্কৃতিক অভিযাত্রা। কালের নিয়মে হারিয়ে গেলেও,তাদের স্মৃতি রয়ে গেছে সাহিত্যে, পুরাণে ও লোককথায়। সেই স্মৃতির সূত্র ধরেই আমরা ফিরে যেতে পারি আমাদের শিকড়ে, আর নতুন করে চিনতে পারি নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে। নববর্ষের দিন এমনই কয়েক়টি হারিয়ে যাওয়া মিষ্টির পদ বানিয়ে করে ফেলতে পারেন উদ্‌যাপন।

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement