ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপ বহু প্রাচীন কিছু গুহাচিত্রের সন্ধান পেলেন গবেষকেরা। ছবি: সংগৃহীত।
চোখের সামনেই ছিল। কিন্তু বহু বছর ধরে তা নজরেই আসেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা আবছাও হয়ে গিয়েছে। এ বার সেই আদিম কারুকার্য আবিষ্কার করলেন নৃতত্ত্ববিদেরা। মিলল কিছু হাতের ছাপ। গবেষকদের দাবি, সম্ভবত এটিই পৃথিবীর প্রাচীনতম গুহাচিত্র। এবং অনুমান করা হচ্ছে, তা তৈরি করেছে আধুনিক মানুষই।
ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপ। বোর্নিও-র পূর্বে অবস্থিত এই দ্বীপে অতীতেও বিভিন্ন গুহাচিত্রের সন্ধান মিলেছে। সম্প্রতি সেখানে এক গুহায় পাওয়া গিয়েছে কিছু আদিম হাতের ছাপ। এগুলি অন্তত ৬৭,৮০০ বছরের পুরনো বলে মনে করছেন গবেষকেরা। আঙুলের ছাপগুলি যে অবস্থায় আবিষ্কৃত হয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে এগুলি কোনও অনিচ্ছাকৃত ছাপ নয়। ভেবেচিন্তেই এই ছাপগুলি তৈরি করা হয়েছিল। সম্ভবত গুহার দেওয়ালে হাত রেখে, সেই হাতের চারপাশে লালচে রঙ করা হয়েছিল। যা থেকে বোঝা যায়, এই সৃষ্টির নেপথ্যে অবশ্যই সৃজনশীল ভাবনা ছিল।
ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপে এই গুহাচিত্র অনুসন্ধানের নেতৃত্ব দেন অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ভূ-রসায়নবিদ ম্যাক্সিম অবার্ট। দীর্ঘদিন ধরে ‘অদৃশ্য’ থাকা এই হাতের ছাপগুলি খুঁজে পেয়ে দৃশ্যতই উচ্ছ্বসিত তিনি। অবার্টের কথায়, “এগুলি কোনও লাল রং দিয়ে করা হয়েছিল। তারা গুহার দেওয়ালে হাত রেখে তার উপরে সেই রং ছড়িয়ে দিয়েছিল। তারা কোন কৌশলে এটি করেছিল, তা আমরা এখনই সঠিক ভাবে বলতে পারছি না। সম্ভবত তারা নিজেদের মুখে কোনও রং নিয়ে তা ছিটিয়ে দিতে পারত। বা হয়তো কোনও ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করতে পারত।”
ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপে গত বেশ কয়েক বছরে বিভিন্ন গুহায় ঘুরে ঘুরে প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযান চালাচ্ছেন অবার্ট এবং তাঁর দল। এর আগে সুলাওয়েসিতেই এক গুহার মধ্যে ক্যালশিয়াম কার্বনেটের নরম পাথরের গায়ে চার ফুটের এই শূকর-চিত্র দেখতে পান তাঁরা। ওই শূকর-চিত্র ছিল অন্তত ৪৫,৫০০ বছরের পুরনো। তবে ওই গুহাচিত্র আধুনিক মানুষ (হোমো সেপিয়েন্স)-এর আঁকা, না কি অন্য কোনও মানবপ্রজাতির— তা নিয়ে সন্দিহান অবার্টেরা। তাঁদের অনুমান, ওই গুহাচিত্রটি নিয়ানডারথাল বা ডেনিসোভানেরা এঁকে থাকতে পারে। যদিও এ বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনও পাননি প্রত্নতাত্ত্বিকেরা।
এ বার সেই একই গবেষকদল সুলাওয়েসির অন্য একটি গুহায় খুঁজে পেলেন ৬৭,৮০০ বছরের পুরনো হাতের ছাপ। প্রত্নতাত্ত্বিকদের অনুমান, সম্ভবত এটিই আধুনিক মানুষের তৈরি সবচেয়ে প্রাচীন গুহাচিত্রের নিদর্শন। মোট সাতটি হাতের ছাপ রয়েছে সেখানে। সবগুলিই একই রকমের। গুহার দেওয়ালে হাত রেখে তার উপর দিয়ে রং ছড়িয়ে ছবিগুলি আঁকা হয়েছে। বস্তুত, এই একই গুহায় অতীতেও কিছু গুহাচিত্রের নিদর্শন মিলেছে। কিছু ঘোড়া, হরিণ এবং শূকরের চিত্রও আঁকা আছে গুহায়। তবে সেগুলি তুলনামূলক নতুন। সম্ভবত, ৩,৫০০-৪০০০ বছর আগে সেগুলি আঁকা হয়েছিল। ওই গুহাচিত্রগুলি দেখার জন্য অনেক পর্যটকও যান সেখানে। তবে এত গুহাচিত্রের মধ্যে ঈষৎ আবছা হয়ে যাওয়া হাতের ছাপগুলি একপ্রকার ‘অদৃশ্য’ই হয়ে ছিল।
এর আগে ফ্রান্সের লাসকক্সে এবং স্পেনের কিছু গুহায় এমন কিছু শৈল্পিক নিদর্শন পাওয়া গিয়েছিল। স্পেনের তিনটি গুহায় পাওয়া যায় লাল রঙের হাতের ছাপ, কিছু চিহ্ন এবং বিন্দু। গবেষণায় উঠে আসে সেগুলি ৬৪,০০০ বছরেরও বেশি পুরনো। অর্থাৎ, ইউরোপে আধুনিক মানুষের আবির্ভাবের অন্তত ২০,০০০ বছর আগে ওই লালচে ছাপগুলি তৈরি হয়েছিল। ওই সময়ে ইউরোপে ঘুরে বেড়াত আধুনিক মানুষের আত্মীয় নিয়ানডারথালেরা। ফলে অনুমান করা হয়, স্পেনের গুহায় ওই কীর্তি নিয়ানডারথালদেরই। তবে ইন্দোনেশিয়ায় খুঁজে পাওয়া গুহাচিত্রটি ফ্রান্স বা স্পেনের চেয়েও বেশি পুরনো।
বছর সাতেক আগে দক্ষিণ আফ্রিকার এক গুহাতেও কিছু হাতের ছাপ মিলেছিল। কেউ কেউ সেটিকেই প্রাচীনতম গুহাচিত্র বলে মনে করেছিলেন। তবে পরে জানা যায়, সেগুলি কোনও শৈল্পিক ভাবনার প্রকাশ ছিল না। সেগুলি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে গুহার দেওয়ালে তৈরি হওয়া কিছু ছাপ। তবে সুলাওয়েসির এই হাতের ছাপগুলি দেখে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা নিশ্চিত, এগুলি চিন্তাভাবনা করেই আঁকা হয়েছিল।