কাঁকড়াবিছে। — প্রতীকী চিত্র।
আজ থেকে প্রায় ৪০ কোটি বছর আগের কথা। তখনও ডাইনোসরদের আবির্ভাব হয়নি। সেই সময় পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াত বিশাল চেহারার কাঁকড়াবিছেরা। অধুনাবিলুপ্ত সেই প্রজাতির অস্তিত্বের বিষয়ে এত দিনে নিশ্চিত হলেন গবেষকেরা। এত বড় কাঁকড়াবিছে যে পৃথিবীতে ছিল, তা এই গবেষণার আগে জানতেনই না কেউই।
বিলুপ্ত এই প্রজাতির এক একটি কাঁকড়াবিছে প্রায় কুকুরের (৩-৩.৫ ফুট মাপের সারমেয় প্রজাতি) সমান লম্বা হত। বিষয়টি প্রথম বার কল্পনা করলে মনে পড়ে যেতেই পারে ‘জুমানজি: ওয়েলকাম টু দ্য জাঙ্গল’ সিনেমার সেই দৃশ্যের কথা। যেখানে মানুষের চেয়েও পোকামাকড়ের চেহারা বড়। কিংবা, হ্যারি পটার সিরিজ়ের সেই ভয়াল-দর্শন বিশালদেহী মাকড়সা ‘অ্যাক্রোম্যান্টুলা’র কথা। কিন্তু এটি কোনও সিনেমার দৃশ্য নয়। এক সময়ে সত্যিই এমন বিশাল চেহারার কাঁকড়়াবিছে ঘুরে বেড়াত পৃথিবীতে। তাদের অস্তিত্বের প্রমাণও মিলেছে। পাওয়া গিয়েছে জীবাশ্ম। এরা কবে পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে অনুমান করা হয়, ডাইনোসরেরা পৃথিবীতে আসার অনেক আগেই এরা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে।
এদের জীবাশ্ম অবশ্য আবিষ্কার হয়েছিল অনেক আগেই। প্রায় ১৫০ বছর আগে প্রথম এমন জীবাশ্ম পাওয়া যায়। কিন্তু সেই জীবাশ্ম কোন জীবের, তা এত দিন অজানাই ছিল। এ বার সেই রহস্য কাটল। জানা গেল, ওই জীব আসলে একটি কাঁকড়াবিছে। ‘প্রেইআর্কটুরাস গিগাস’। যারা লম্বায় প্রায় তিন-সাড়ে তিন ফুট পর্যন্ত বাড়তে পারে।
কাঁকড়াবিছে হল ‘আর্থ্রোপড’ বা সন্ধিপদী গোত্রের জীব। বর্তমানে যে সব কাঁকড়াবিছে পাওয়া যায়, তারা গড়ে দুই থেকে সাড়ে তিন ইঞ্চি লম্বা হয়। ‘প্রেইআর্কটুরাস গিগাস’ লম্বায় ছিল এদের চেয়ে প্রায় ১২-১৩ গুণ। বিলুপ্ত এই প্রজাতির জীবাশ্ম প্রথম পাওয়া যায় ব্রিটেনে। ১৮৭০ সালে। এরা আসলে কী, তা নিয়ে বিতর্ক চলে আসছিল তখন থেকেই। কারণ, জীবাশ্মটি ছিল অসম্পূর্ণ। কাঁকড়াবিছের লেজের অংশটি জীবাশ্মে স্পষ্ট ভাবে ধরা পড়েনি। ফলে প্রাথমিক ভাবে বিজ্ঞানীদের একাংশ সেটিকে বড় আকারের কোনও কেন্নো বা ওই জাতীয় কোনও জীব ভেবে ভুল করেছিলেন। এত দিনে সেই ভুল ভাঙাল নতুন গবেষণা।
প্রায় দেড়শো বছর ধরে ধোঁয়াশায় রাখা ওই জীবাশ্মকে নিয়ে সম্প্রতি একটি গবেষণা করেন ব্রিটেনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজ়িয়ামের জীবাশ্মবিদ রিচি হাওয়ার্ড। ‘প্যালিওন্টোলজি’ জার্নালে সেটি প্রকাশিত হয়েছে। জীবাশ্মটির কার্বন ডেটিং করে আগেই সেটির বয়স নির্ধারণ করা হয়েছিল। দেখা গিয়েছে, সেটি ৪১ কোটি ৫০ লক্ষ বছরের পুরনো। অর্থাৎ, ডাইনোসরদের আবির্ভাবেরও আগে এরা পৃথিবীতে ছিল (ডাইনোসরদের আবির্ভাব হয়েছিল আজ থেকে আনুমানিক ২৫ কোটি বছর আগে)।
গবেষকদলের প্রধান হাওয়ার্ডের মতে, “প্রেইআর্কটুরাস এমন এক সময়ে পৃথিবীতে বাস করত যখন স্থলভাগে সবেমাত্র প্রাণের বিকাশ শুরু হয়েছিল। তখনও সরীসৃপ, স্তন্যপায়ী বা পাখিদের পূর্বসূরিরা জল ছেড়ে ডাঙায় উঠে আসেনি।” হাওয়ার্ড এবং তাঁর সঙ্গীদের ধারণা, ওই সময়ে অন্য কোনও বড় শিকারি প্রাণী ছিল না স্থলভাগে। সম্ভবত সেই কারণেই কাঁকড়াবিছের এই প্রজাতিটির এমন বড় চেহারার হয়ে উঠেছিল এবং সেই সময়ের পরিবেশে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছিল।
উল্লেখ্য, গত ১৫০ বছরে ব্রিটেনের অন্য কিছু অঞ্চলেও ডেভোনিয়ান যুগ (যা শুরু হয়েছিল আজ থেকে ৪১ কোটি বছর আগে। চলেছিল ৩৫ কোটি বছর আগে পর্যন্ত)-এর শুরুর দিকের কিছু জীবাশ্ম আবিষ্কার হয়। সেগুলির সঙ্গে এই বিশাল চেহারার কাঁকড়াবিছের জীবাশ্ম তুলনা করে দেখেন গবেষকেরা। তা থেকে হাওয়ার্ড এবং তাঁর সঙ্গীরা নিশ্চিত হয়েছেন— ওটি কাঁকড়াবিছেই। এই প্রজাতির কাঁকড়াবিছেরা এতটাই বড় ছিল যে তাদের এক একটি দাঁড়া ছিল প্রায় সাড়ে ছয় ইঞ্চি লম্বা। এখন যে কাঁকড়াবিছে পাওয়া যায়, তার গোটা চেহারা যে দৈর্ঘ্যের, প্রেইআর্কটুরাসের এক একটি দাঁড়া ছিল তার প্রায় দ্বিগুণ মাপের।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রেইআর্কটুরাসের মধ্যে উভচর প্রকৃতির বেশ কিছু লক্ষ্মণ রয়েছে। অর্থাৎ, এরা জলেও সময় কাটাতে পারত। এদের শরীরে ফ্ল্যাপ বা পাখনার মতো কিছু গঠন দেখা যায় (যেমনটা কাঁকড়া বা লবস্টারের শরীরে থাকে)। হাওয়ার্ডের মতে, “স্থল ভাগে সেই সময় টিকে থাকার মতো বাস্তুতন্ত্র পুরোপুরি তৈরি হয়ে ওঠেনি। সম্ভবত সেই কারণে শিকার ধরার জন্য জলে নামতে হত এই জীবদের।” গবেষকদের অনুমান, জীবাশ্মটি যে সময়ের (৪১ কোটি ৫০ লক্ষ বছর আগের), তার পরে আরও প্রায় ৪ কোটি বছর এই প্রজাতিটি পৃথিবীতে টিকে ছিল। পরবর্তী সময়ে শিকারের জন্য প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলেই সম্ভবত এই প্রজাতিটি হারিয়ে গিয়েছে পৃথিবীতে।