স্ফটিকের মধ্যে পিঁপড়ের জীবাশ্ম। — প্রতীকী চিত্র।
আজ থেকে প্রায় ১০ কোটি বছর আগের কথা। পৃথিবীতে তখন ঘুরে বেড়াত বিশাল চেহারার ডাইনোসরেরা। সঙ্গে ঘুরে বেড়াত ওরাও। ডাইনোসরদের হাতে আক্রান্ত হওয়ার কোনও ভয় ছিল না। খাদ্য খাদক শৃঙ্খলে ওরা ছিল ডাইনোসরদের চেয়ে অনেক নীচে। কথা হচ্ছে ওই সময়ের পিঁপড়েদের নিয়ে। সাম্প্রতিক এক জীবাশ্ম গবেষণায় উঠে এসেছে আদিম কালের সেই কীটপতঙ্গদের কথা।
ডাইনোসর যুগের কথা বললে অনেকেরই মাথায় প্রথমে আসে ‘জুরাসিক পার্ক’-এর কথা। স্টিফেন স্পিলবার্গ পরিচালিত ওই সিনেমায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন জন হ্যামন্ড। তিনিই ছিলেন সিনেমার ওই পার্কের প্রতিষ্ঠাতা। সব সময় ঘুরতেন হাতে এক ছড়ি নিয়ে। ছড়ির মাথায় বসানো ছিল মশার জীবাশ্ম-সহ এক স্ফটিক। এই গবেষণাও চলেছে তেমনই কিছু জীবাশ্ম-স্ফটিক নিয়ে।
জীবাশ্ম-স্ফটিক বা ‘অ্যাম্বার’ হল আসলে গাছের জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া রজন। গাছের ওই তরল রজন জীবাশ্ম হয়ে স্ফটিকে পরিণত হয়। এগুলির মধ্যে কখনও সখনও কীটপতঙ্গও আটকে থাকে। রজনের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলিও জীবাশ্ম হয়ে যায়, তবে শক্ত মোড়কে থাকার কারণে শরীর অক্ষতই থেকে যায়। এমন ছ’টি জীবাশ্ম-স্ফটিক বিশ্লেষণ করে দেখেন স্পেনের ইনস্টিটিউট ফর গেম অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ রিসার্চের গবেষক জোসে ডে লা ফন্টে। সম্প্রতি তাঁর গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ফ্রন্টিয়ার ইন ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশনে।
ওই ছ’টি জীবাশ্ম-স্ফটিকের মধ্যে চারটিই ছিল ক্রিটেসিয়াস যুগের। আজ থেকে প্রায় ৯ কোটি ৯০ লক্ষ বছর আগের। বাকি দু’টির মধ্যে একটি ছিল ইয়োসিন যুগের। এটি আনুমানিক সাড়ে তিন থেকে সাড়ে পাঁচ কোটি বছরের পুরানো। ষষ্ঠটি অলিগোসিন যুগের, সেটির বয়স প্রায় আড়াই থেকে সাড়ে তিন কোটি বছর। এর মধ্যে ক্রিটেসিয়াস যুগ ছিল ডাইনোসরদের সময়কালের শেষ অধ্যায়। ওই সময়ে কীটপতঙ্গ কেমন ছিল, তা ধরা পড়েছে এই জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া স্ফটিকগুলিতে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, একটি স্ফটিকে পাওয়া গিয়েছে আদিম কালের পিঁপড়ে ‘স্টেম অ্যান্ট’-এর জীবাশ্ম। ক্রিটেশিয়াস যুগের শুরুর দিকে আবির্ভাব হয়েছিল এই পিঁপড়েদের। পরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্তও হয়ে যায়। এমনকি এদের কোনও উত্তরসূরিও নেই বর্তমান পৃথিবীতে। এখন যে পিঁপড়েদের দেখা যায়, সেই সবই এসেছে ‘ক্রাউন অ্যান্ট’ বিবর্তিত হয়ে। ক্রিটেশিয়াস যুগেই স্টেম পিঁপড়ে থেকে আলাদা হয়ে আবির্ভাব হয় ক্রাউন পিঁপড়ের। সেই ক্রাউন পিঁপড়েও ধরা পড়েছে একটি জীবাশ্ম-স্ফটিকে।
ডে লা ফন্টের মতে, ওই সময়ে বিভিন্ন কীটপতঙ্গ কী ভাবে থাকত, তার একটি ধারণা পাওয়া যেতে পারে এই জীবাশ্ম-স্ফটিকগুলি থেকে। ওই ছ’টি স্ফটিকের মধ্যে তিনটিতে পিঁপড়েদের সঙ্গে মাইট (আটপেয়ে পরজীবী)-ও দেখা গিয়েছে। তা-ও খুব কাছাকাছি। একটিতে ক্রাউন পিঁপড়ে, বোলতা এবং দু’টি মাইটকে এতটাই কাছাকাছি দেখা গিয়েছে যেন তারা একে অন্যের উপর দিয়ে চলাফেরা করছিল। অন্য একটি স্ফটিকে স্টেম পিঁপড়ের থেকে মাইটকে মাত্র চার মিলিমিটার দূরে দেখা গিয়েছে। আরেকটিতে দেখা গিয়েছে, তিনটি ভিন্ন প্রজাতির পিঁপড়ে। তার সঙ্গেই মিলেছে উইপোকার মতো দেখতে কিছু পোকা, কয়েকটি ডানাওয়ালা পতঙ্গ। সঙ্গে একটি মশাও মিলেছে।
অপর একটিতে দেখা গিয়েছে একটি স্টেম পিঁপড়ের সঙ্গে একটি বোলতা এবং মাইটকে। সেখানে স্টেম পিঁপড়েটি সম্ভবত কিছু খাচ্ছিল। শক্তিশালী অনুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে গবেষকদের অনুমান, সম্ভবত কোনও পোকা খাচ্ছিল না পিঁপড়েটি। সেটি কোনও লার্ভা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে অনুমান ডে লা ফন্টে এবং তাঁর সহযোগীদের। বাকিগুলির মধ্যেও একটিতে ছিল পিঁপড়ে এবং মাইট। অন্যটিতে ছিল পিঁপড়ে, কেন্নো এবং কিছু অচেনা পোকামাকড়।
ডে লা ফন্টের কথায়, এই স্ফটিক বিশ্লেষণের ফলে ওই সময়ের কীটপতঙ্গদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের একটি আভাস পাওয়া যায়। যেমন এ ক্ষেত্রে গবেষণা থেকে তাঁদের অনুমান, ওই ডাইনোসর যুগে পিঁপড়ে এবং মাইটের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল। কারণ, প্রায় সবগুলি স্ফটিকেই কীটপতঙ্গদের মধ্যে দু’টি সাধারণ পোকা ছিল— পিঁপড়ে এবং মাইট। জীবাশ্ম নমুনাগুলি বিশ্লেষণ করে তাঁদের অনুমান, পরজীবী মাইটগুলি পিঁপড়ের উপরে নির্ভর করে থাকত।