গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
ক্রিস এভার্ট এবং মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা— টেনিস কোর্টের দুই প্রবল প্রতিপক্ষ। তাঁদের নিয়ে তথ্যচিত্র ‘ক্রিস অ্যান্ড মার্টিনা: দ্য ফাইনাল সেট’। এই দু’জন আসলে শত্রু না বন্ধু? ১ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট ধরে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন পরিচালক রেবেকা গিটলিটজ। জবাব পাওয়া গিয়েছে শেষ সেটে এসে!
টেনিস কোর্টে এমন একটা সময়ে এভার্ট এবং নাভ্রাতিলোভার প্রতিদ্বন্দ্বিতা চরমে উঠেছিল, যখন ‘হিটেড রাইভালরি’-র তারকাদের জন্ম হয়নি। মেয়েদের টেনিসকে প্রচারের আলোয় নিয়ে আসতে এই দু’জন কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তা দেখিয়েছে এই তথ্যচিত্র। ১৯৭০ ও ’৮০-র দশক জুড়ে ৮০টি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিলেন দু’জনে। দীর্ঘ ১৫ বছরে তাঁরা র্যাকেট স্পোর্টসে সর্বকালের সেরাদের তালিকায় নিজেদের নাম ইতিহাসের পাতায় লিখে নিয়েছেন। তাঁদের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাই পরবর্তী কালে সেরিনা-ভিনাস উইলিয়ামস বা ইগা শিয়নটেক-নেয়োমি ওসাকার মতো টেনিস দ্বৈরথের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে।
কোর্টে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা (বাঁ দিকে) ও ক্রিস এভার্ট। —ফাইল চিত্র।
তবে, এভার্ট-নাভ্রাতিলোভা সম্পর্কটি আজকের বন্ধুত্বে রূপ নেওয়ার আগে অসংখ্য চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। গিটলিটজের তথ্যচিত্রে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দু’জনের টেনিসজীবন এবং বন্ধুত্বের বিবর্তনকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে এটি যেমন অতীতে তাঁদের তীব্র প্রতিযোগিতাকে তুলে ধরেছে, ঠিক তেমনই বর্তমানে তাঁদের দু’জনেরই ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কষ্টকে সামনে নিয়ে এসেছে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ গাঢ় হওয়া একটি বন্ধনকেও ফুটিয়ে তুলেছে।
২০২১ সালে এভার্টের ওভারিয়ান (ডিম্বাশয়) ক্যানসার এবং ২০২৩ সালে নাভ্রাতিলোভার স্তন ও গলার ক্যানসার ধরা পড়ে। তথ্যচিত্রটির বর্তমান সময়ের ফুটেজে দু’জনের মধ্যেই ক্যানসার নিয়ে ভয় এবং মানসিক চাপ ফুটে উঠেছে। দেখা যাচ্ছে এই কঠিন পরিস্থিতিতে তাঁরা প্রতিনিয়ত একে অপরের খোঁজ নিচ্ছেন এবং মানসিক ভাবে পাশে থাকার চেষ্টা করছেন।
নেটফ্লিক্সের অন্য প্রোফাইল ডকুমেন্টারিগুলির মতোই এটিতেও রয়েছে বিভিন্ন সাক্ষাৎকার, আর্কাইভাল ফুটেজ এবং চেনা ছকের কাঠামো। কিন্তু গিটলিটজের নিখুঁত নির্দেশনা এটিকে আলাদা করে ভাল লাগিয়েছে। পরিচালক নাভ্রাতিলোভা ও এভার্টকে নিজেদের সাধারণ দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে রেখেই তাঁদের টেনিসজীবন এবং পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জীবনের গল্পগুলি ক্যামেরাবন্দি করেছেন। প্রধান দুই চরিত্র যে ভাবে নিজেদের জীবনের, লড়াইয়ের গল্প শুনিয়েছেন, তা কখনও স্রেফ একটি সাক্ষাৎকারে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
শত্রু যখন বন্ধু। ক্রিস এভার্ট (বাঁ দিকে) ও মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা। —ফাইল চিত্র।
বিলি জিন কিং-এর মতো প্রাক্তন খেলোয়াড় সেই সময়ের টেনিস সংস্কৃতি তুলে ধরেছেন। বেশির ভাগ পার্শ্বচরিত্রে পরিচালক মহিলাদের ব্যবহার করেছেন। জন ম্যাকেনরো একমাত্র পুরুষ মুখ। সেই সময় মেয়েদের টেনিসকে কোন নজরে দেখা হত, তা বুঝতে সাহায্য করে।
এই ডকু-ফিল্মের কেন্দ্রীয় চরিত্র এভার্ট এবং নাভ্রাতিলোভার ‘অভিনয়’ অত্যন্ত প্রাণবন্ত, অকপট। এভার্ট যেখানে অবিচল আত্মবিশ্বাসের জীবন্ত রূপ, সেখানে নাভ্রাতিলোভা তাঁর চাঁছাছোলা মুখ নিয়েও কিছুটা শান্ত। এই বৈপরীত্য দেখার ক্ষেত্রে যেমন একটি মজাদার রসায়ন তৈরি করে, তেমনই শোনার জন্যও আরও বেশি উপভোগ্য হয়ে ওঠে।
ছবিটি শুরু হয়েছে এভার্টকে দিয়ে। যিনি বরাবরই নির্ভীক ও আত্মবিশ্বাসী। অথচ ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের সময় সেই এভার্টকেই জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল একটি মুহূর্তে দেখা গিয়েছে। সেখান থেকেই তিনি ‘অল-আমেরিকান গার্ল’ হিসেবে নিজের গল্প শুনিয়েছেন। এক টেনিস বিস্ময়,যিনি ১৯৭১ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তাঁর প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যামে খেলেছিলেন। অন্য দিকে নাভ্রাতিলোভা তৎকালীন কমিউনিস্ট চেকোস্লোভাকিয়ার এক প্রতিভাবান খেলোয়াড়, যিনি পরিবারকে ছেড়ে একা আমেরিকায় চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই তথ্যচিত্রে সেই ছবি দেখানো হয়েছে, যেখানে ১৯৭৪ সালে অরল্যান্ডোতে নিজের প্রথম পেশাদার ডব্লিউটিএ সিঙ্গলস খেতাব জেতার পর তরুণী নাভ্রাতিলোভা একটি খুঁটিকে জড়িয়ে ধরে আছেন। কারণ, সেখানে জড়িয়ে ধরার মতো আর কেউ তাঁর কাছে ছিল না।
এভার্ট-নাভ্রাতিলোভার বন্ধুত্বের সূত্রপাত সেখানে। কিন্তু এভার্ট স্বীকার করে নিয়েছেন সেটা তাৎক্ষণিক, মাত্র কিছু দিনের জন্য। কারণ, তাঁর মাথায় তখন একটিই স্বপ্ন— বিশ্বের এক নম্বর হতে হবে। এভার্ট বুঝে গিয়েছিলেন, সেই স্বপ্নে একমাত্র অন্তরায় তাঁর বন্ধুই। শুরু হয় ঠান্ডা লড়াই। প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগুন চরমে ওঠে যখন নাভ্রাতিলোভার সঙ্গে ডাবলস জুটি ভেঙে দেন এভার্ট। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, নাভ্রাতিলোভা তাঁর রণকৌশল খুব ভাল ভাবে ধরে ফেলছেন। এর পর থেকে দু’জনের সম্পর্ক ক্রমশ ঠান্ডা হয়ে যায়।
এই তথ্যচিত্রে দেখানো হয়নি, ঠান্ডা হয়ে যাওয়া সম্পর্ক ব্যক্তিগত ভাবে দু’জনের কতটা ক্ষতি করেছে। কিন্তু দেখানো হয়েছে, তাঁদের তীব্র প্রতিযোগিতা কেবল মেয়েদের টেনিসই নয়, সামগ্রিক ভাবে টেনিসের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
এই তথ্যচিত্রে তাঁদের প্রাণবন্ত বর্ণনার মাধ্যমে সেই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনুভব করা যাবে। এত বছর পর শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরের অন্তরঙ্গ পরিবেশে যে ভাবে হাসতে হাসতে দু’জনে সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বলেছেন, তা দর্শকদের তাঁদের আরও কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছে। দু’জনেই তাঁদের শৈশবের বিভিন্ন না-পাওয়ার কথা বলেছেন। বুঝিয়ে দিয়েছেন সেই অভিজ্ঞতাগুলো কী ভাবে তাঁদের ব্যক্তিত্ব ও ক্যারিয়ার তৈরি করতে সাহায্য করেছে। সর্বোপরি কী ভাবে পরস্পরকে বুঝতে সাহায্য করেছে সেই সব অভিজ্ঞতা, তা নিয়ে অত্যন্ত খোলাখুলি ও আত্মপর্যালোচনামূলক কথা বলেছেন। অবাক লাগে, তাঁদের দীর্ঘ টেনিসজীবনের যে কোনও মুহূর্তের কথা এখনও হুবহু মনে আছে। এমনকি, প্রতিপক্ষের খেলায় ঠিক কোন জায়গায় খামতি ছিল, সেগুলিও তাঁরা নিখুঁত ভাবে মনে রেখেছেন।
তবে টেনিস কোর্টে দু’জনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এতটাই বিশদ দেখানো হয়েছে যে, কখনও কখনও মনে হতে পারে, এর ফলে তাঁদের ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মানবিক দিকটি কিছুটা আড়ালে থেকে গিয়েছে। এখনকার মানবিক সম্পর্কের চেয়ে অতীতের লড়াইয়ের দিনগুলিতেই বেশি সময় ব্যয় করেছে। একটি ভারসাম্য থাকা উচিত ছিল। তথ্যচিত্রের খুঁত বলতে এটুকুই।
তবু কী ভাবে দু’জনে এমন এক আজীবনের বন্ধন গড়ে তুললেন, যা দেখে মনে হবে তাঁরা দুই বোন? জীবনের কোন পর্যায়ে এসে এভার্ট এবং নাভ্রাতিলোভা পরস্পরকে কেবল প্রতিযোগী বা বাধা হিসেবে না দেখে সহমর্মীর চোখে দেখতে শুরু করেছিলেন? চলচ্চিত্রটি যখন এই প্রশ্নের উত্তর দেয়, তখন সব কিছু এক সুতোয় মিলে যায়।
কোর্টে আলাপচারিতায় মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা (বাঁ দিকে) ও ক্রিস এভার্ট। —ফাইল চিত্র।
এই তথ্যচিত্রটিতে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সেটি হল মেয়েদের টেনিসকে ঘিরে থাকা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। দেখানো হয়েছে আমেরিকার ক্রীড়াজগতের নিষ্ঠুর দ্বিমুখী নীতি। এভার্ট এক সময় অজস্র ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনের মুখ ছিলেন, সেই সময়ে কার্যত তিনিই ছিলেন গোটা আমেরিকার মুখ। দেখানো হয়েছে, শুধু খেলার জন্যই নয়, বরং সমাজের বেঁধে দেওয়া সৌন্দর্যের সংজ্ঞার সঙ্গে কী ভাবে পুরোপুরি মিলে গিয়েছিলেন এভার্ট। অন্য দিকে শক্তিশালী ও পেশিবহুল শারীরিক গঠনের অধিকারী অভিবাসী খেলোয়াড় নাভ্রাতিলোভাকে সব সময় ট্যাবলয়েডগুলির তীব্র কটূক্তির শিকার হতে হত। সংবাদমাধ্যম বর্ণবাদী ও জেনোফোবিক উপায়ে তাঁর আমেরিকান জীবনযাত্রাকে এমন ভাবে তুলে ধরত, যেন তিনি নাটক করছেন। কী ভাবে নাভ্রাতিলোভার সমকামী (লেসবিয়ান) পরিচয়কে সামনে আনার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল তারা, সেটিও দেখানো হয়েছে এই তথ্যচিত্রে।
পরিচালক গিটলিটজের অন্যতম মাস্টারস্ট্রোক হল, বন্ধু থেকে শত্রু এবং তারপর আবার বন্ধু হয়ে যাওয়া দু’জনকে একসঙ্গে একই সোফায় বসিয়ে তাঁদেরই কিছু পুরোনো ম্যাচ দেখানো। এই ম্যাচগুলি তাঁরা গত ৪০ বছরেও দেখেননি। কিন্তু ম্যাচের ফলাফল আগে থেকে জানা সত্ত্বেও তাঁদের প্রতিক্রিয়া চমৎকার এবং সাবলীল ছিল। এবং তাঁরা নিজেদের খেলা দেখে সাধারণ দর্শকের মতোই সমান উত্তেজনা অনুভব করছিলেন। পরিচালককে বোধ হয় এখানে তাঁর অভিনেতাদের বিশেষ নির্দেশ দিতে হয়নি। সবটাই হয়েছে আবেগের আপন গতিতে। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নিজের জন্য উল্লাস করতে করতে এভার্ট তো বলেই ফেলেছেন, “কে জিতেছে জানা সত্ত্বেও ম্যাচটা দেখতে গিয়ে কতটা রোমাঞ্চ হচ্ছে!”
‘ক্রিস অ্যান্ড মার্টিনা: দ্য ফাইনাল সেট’ হল বন্ধুত্বের এক জটিল ও চিত্তাকর্ষক গল্প এবং সত্যিকারের ‘স্পোর্টসম্যানশিপ’ বা খেলোয়াড়সুলভ প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক অনন্য উদাহরণ। যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা পুরো টেনিস খেলাটিকে এক নতুন রূপ দিয়েছিল। কিন্তু জীবন যখন দু’জনকে প্রায় একই সময়ে সবচেয়ে বড় এবং কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে, তখন তাঁরা সেটিকে আর কোনও প্রতিযোগিতার পর্য়ায়ে নিয়ে যাননি। বরং সেটিকে পরস্পরের পাশে আরও বেশি করে থাকার একটি সুযোগ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তাই কে বেশি উইম্বলডন জিতেছেন বা কার গ্র্যান্ড স্ল্যাম বেশি, তথ্যচিত্রের শেষে এসে তার আর কোনও গুরুত্ব থাকে না।