India Wins ICC T20 World Cup 2026

সমালোচিত, নিন্দিত, বন্দিত! বিশ্বজয়ের রাতে ‘গম্ভীর’ বিপ্লব, তারকাহীন ভারতীয় ক্রিকেটই এখন নিউ নর্মাল

টানা দ্বিতীয় বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতার পাশাপাশি রাতারাতি ভারতীয় ক্রিকেটে নিঃশব্দে ঘটে গিয়েছে একটি বিপ্লব। এই বিপ্লব ঘটিয়েছেন গৌতম গম্ভীর, যিনি গত দু’বছরে ভারতের কোচ হিসাবে সমালোচিত হয়েছেন, নিন্দিত হয়েছেন, এখন বন্দিত হচ্ছেন।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২৬ ১৯:০১
Share:

ভারতের কোচ গৌতম গম্ভীর। — ফাইল চিত্র।

৮ মার্চ, ২০২৬। ভারতের ক্রিকেটের ইতিহাসে এই দিনটি লেখা থাকবে টানা দ্বিতীয় বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে নজির গড়ার জন্য। লেখা থাকবে না কী ভাবে এই দিনে রাতারাতি ভারতীয় ক্রিকেটে নিঃশব্দে ঘটে গিয়েছে একটি বিপ্লব, যা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না বটে। তবে সেই বিপ্লবের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। আর কেউ নন, এই বিপ্লব ঘটিয়েছেন গৌতম গম্ভীর, যিনি গত দু’বছরে ভারতের কোচ হিসাবে সমালোচিত হয়েছেন, নিন্দিত হয়েছেন, এখন বন্দিত হচ্ছেন।

Advertisement

বিপ্লবটি কী?

ভারতীয় ক্রিকেট দল এই প্রথম একটি বিশ্বকাপ জিতল, যেখানে তথাকথিত কোনও তারকা নেই। অর্থাৎ এই ভারতীয় দলের নাম করলে চট করে চোখের সামনে কোনও একজন নির্দিষ্ট ক্রিকেটারের নাম ভেসে আসবে না। বরং একাধিক ক্রিকেটার বা গোটা দলের কথাই মনে হবে। এই বিপ্লবটিই নিঃশব্দে ঘটিয়ে দিয়েছেন গম্ভীর।

সূর্যকুমার যাদবের কথাই ধরা যাক। ব্যাট হাতে ফর্মে না থাকলেও নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে বিশ্বকাপ জেতানোর পুরো কৃতিত্ব তাঁর। কিন্তু তিনি কপিলদেব, মহেন্দ্র সিংহ ধোনি বা রোহিত শর্মা নন। এমনকি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় বা বিরাট কোহলির কাছাকাছিও আসবেন না। কখনও তিনি কোনও আইপিএল দলকে নেতৃত্ব দেননি। ৫০ ওভার বা টেস্ট দলের সদস্য নন।

Advertisement

হার্দিক পাণ্ড্য। একসময় নজর কেড়ে নিতেন বিভিন্ন কারণে। এখন সবার সঙ্গে মিশে গিয়েছেন। যা করেন নিঃশব্দে। কখন যে দলকে জিতিয়ে চলে যাবেন কেউ জানেন না।

জসপ্রীত বুমরাহ। ভারতীয় বোলিংয়ের সচিন তেন্ডুলকর। সূর্য নিজেই বলেছেন, তিনি জাতীয় সম্পদ। এমন এক বোলার যা একটি প্রজন্মে এক বারই আসে। তিনিও এমন আড়ম্বরহীন জীবনযাপন করেন যে চট করে চোখে পড়বেন না।

এঁদের প্রত্যেকেই কোনও না কোনও সময়ে বড় নামের ছায়ায় ঢাকা পড়ে গিয়েছেন। আর নয়। এই ভারতীয় দলে আর কোনও ক্রিকেটারই দলের চেয়ে বড় নয়। তাই ফাইনালে সঞ্জু স্যামসনের ৮৯ বা বুমরাহের ৪ উইকেট, কেউ কারও চেয়ে কম যায় না।

এই দলে আলোচনা হয় একজনকে নিয়েই। তিনি গৌতম গম্ভীর। এই দল তাঁর তৈরি করা চ্যাম্পিয়ন দল, যার ধারেকাছে তারকা সংস্কৃতির কোনও জায়গা নেই। গম্ভীর শুধু এই বিপ্লবের অংশীদার নন, এই বিপ্লব তৈরি করার কারিগর। তিনি বীজ পুঁতেছেন, তিনিই পচা বীজ নির্মূল করেছেন এবং তিনিই দু’বছর ধরে জল দিয়ে গাছকে বড় করে তুলেছেন।

গম্ভীর একটি দর্শনে বিশ্বাস করেন, ভাল গাছের দিকে তাকিয়ে থাকতে গিয়ে গোটা অরণ্যকে ভুলে যেয়ো না। এই দর্শন তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন গোটা দলের মধ্যে। সে কারণেই গম্ভীরের মন্তব্য, “আমি মনে করি, আগে দল। পরে নিজের সাফল্য। আপনি যদি ৯৬ রান থেকে ১০০ করতে চার বল খেলেন, তা হলে আপনি দলের ২০ রানের ক্ষতি করলেন। ওই চার বলে চারটে ছক্কা হতে পারত। তাই যদি কেউ ৯৬ রান থেকে ছক্কা মারতে গিয়ে আউট হয় তাতে আমার কোনও দুঃখ নেই। ওই ৯৬ আমার কাছে শতরানের সমান। এই দর্শন দলের সকলকে দিয়েছি। আমি ভাগ্যবান, দলের সকলে সেটা মেনেছে। আমরা সে ভাবেই খেলি। সকলেই দলকে আগে রাখে।”

অতীতে ভারতের বিশ্বকাপজয়ী দলের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে থাকত অধিনায়কদের নাম। ‘কপিলস ডেভিলস’, ‘ধোনিস আর্মি’, এ সব নাম সমর্থকেরাই দিয়েছেন। আর হয়তো সেই জিনিস দেখা যাবে না। ভারতের এই ক্রিকেট দল এখন এশিয়ার আঙিনা ছাড়িয়ে বিশ্বে পদার্পণ করেছে। ফুটবলের মতো এই দলেও কোচই শেষ কথা। তিনিই কৌশল ঠিক করেন, ক্রিকেটারদের বেছে নেন। পাশে আছেন অজিত আগরকর, যিনি গম্ভীরের মতোই খেলোয়াড়দের ক্ষমতা বা জনপ্রিয়তায় বিশ্বাস করেন না। বিশ্বকাপ জেতার পর গম্ভীর বলেছেন, “আশা করছি, এ বার সাজঘর নিয়ে জল্পনা বন্ধ হবে। সাজঘরের পরিবেশ ভাল ছিল বলেই আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। বার বার সাজঘর নিয়ে কথা হয়েছে। আমাকে নিয়ে কথা হয়েছে। লেখালিখি হয়েছে। সমাজমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। আমি অবশ্য কাউকে জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করিনি। সাজঘরের ওই ৩০ জনের বাইরে কাউকে আমার জবাবদিহির প্রয়োজন নেই।”

উদাহরণ রয়েছে হাতের সামনেই। শুভমন গিল। গত বছর কার্যত একার হাতে ইংল্যান্ডে গিয়ে সিরিজ় ড্র করিয়েছিলেন শুভমন। ‘একার হাতে’, এই শব্দবন্ধই পছন্দ নয় গম্ভীরের। তাঁর কাছে সেই সিরিজ়ে বুমরাহের ১৪টি উইকেটও সমান গুরুত্বপূর্ণ। টেস্ট এবং এক দিনের দলের অধিনায়ক মানেই নামের জোরে টি-টোয়েন্টি দলে ঢুকে যাবেন, এমন আর চলবে না। টি-টোয়েন্টি দলে সহ-অধিনায়ক করে একটি সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কাজে লাগাতে পারেননি শুভমন। পত্রপাঠ বাদ দেওয়া হয়েছে। বিকল্প হিসাবে যাঁকে নেওয়া হয়েছে, তিনি বিশ্বকাপের সেরা ক্রিকেটার হয়েছেন।

গত বছর ওভাল টেস্ট চলাকালীন সাংবাদিকদের সঙ্গে গল্পগুজব করছিলেন গম্ভীর। সে সময়ই তিনি নিজের কোচিং সত্ত্বার বেশ কিছু উদাহরণ দিয়েছিলেন। জানিয়েছিলেন, সব সময় একটিই বই সঙ্গে রাখেন। ভগৎ সিংহের আত্মজীবনী। ভগৎ সিংহের আদর্শ যিনি ছিলেন, সেই কর্তার সিংহ সরাভার কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন ভারতের কোচ। জানিয়েছিলেন, কী ভাবে সরাভাকে ইতিহাস ভুলে গিয়েছে। গম্ভীর চান না, তাঁর দলে কোনও ক্রিকেটার কম অথচ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও ইতিহাস তাঁকে ভুলে যাক। দীর্ঘ দিন ধরে ভারতের ক্রিকেট যে ভাবে বড় নামের ছায়ায় ঢাকা পড়ে থাকত, তা থেকে অবশেষে দলকে বার করে আনতে পেরেছেন তিনি।

ভারতের কোচ হিসাবে গম্ভীর যেটা ঠিক মনে করেছেন, সেটাই করেছেন। সে বিরাট কোহলি বা রোহিত শর্মাকে টেস্ট থেকে সরিয়ে দেওয়াই হোক বা শুভমনকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়া। কোহলি, রোহিতের সমর্থকেরা লাগাতার আক্রমণ করেছেন গম্ভীরকে। এক সময় ক্লান্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছেন। যে ধারাভাষ্যকারদের গম্ভীর দু’চক্ষে দেখতে পারেন না, তাঁরা তুলোধনা করেছেন। দেশের মাটিতে দু’টি টেস্ট সিরিজ় সেই আগুনে আরও ঘি দিয়েছে। অনেক সময় মনে হয়েছে, এই সমালোচনা তো সঠিকই। ধীরে ধীরে বোঝা গিয়েছে, তারকা সংস্কৃতির অবসান ভারতীয় ক্রিকেটে ‘নিউ নর্মাল’।

গম্ভীর জেদি। ব্যর্থ হোন, চারদিকে বিস্তর সমালোচনা হোক, তিনি নিজের জায়গা থেকে নড়বেন না। ইংল্যান্ডে তিনি শত সমালোচনা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন সুন্দরকে খেলিয়ে গিয়েছেন। বাইরে রেখেছেন কুলদীপ যাদবকে। দিল্লির পেসার হর্ষিত রানাকে নিয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুললেও গম্ভীর তাঁকে তিন ফরম্যাটেই খেলিয়েছেন। এখন পারফরম্যান্স দিয়ে আস্থার প্রমাণ দিচ্ছেন গম্ভীর। অভিষেক শর্মা টানা তিনটি ম্যাচে শূন্য করলেও ভরসা রেখেছেন গম্ভীর। শুভমনকে বাদ দিয়ে সঞ্জুকে নেওয়ার পর অনেকেই খেপে গিয়েছেন। গম্ভীর ভরসা রেখেছেন সঞ্জুর উপর। প্রত্যেকেই কোনও না কোনও সময়ে দাম দিয়েছেন কোচের আস্থার। গম্ভীর বলেছেন, “আমরা কখনও মনে করিনি সঞ্জু খারাপ ফর্মে ছিল। ওর ব্যাটে রান হচ্ছিল না। তাই একটু বিশ্রাম দিয়েছিলাম। অফ স্পিনারের বলে অভিষেক খেলতে পারছিল না বলে সঞ্জুকে ফেরানো হয়নি। আমরা চেয়েছিলাম, টপ অর্ডারে দুই বাঁহাতির সঙ্গে এক ডানহাতিকে জুড়ে দিতে। সেই কারণে সঞ্জুকে নেওয়া হয়েছে। এর অন্য কোনও কারণ নেই।”

দু’বছর আগের একটি ঘটনার কথা অনেকেই হয়তো জানেন না। তখনও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু হয়নি। আইপিএল চলাকালীন ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের তৎকালীন অধিনায়ক রভমান পাওয়েল এসে গম্ভীরকে অনুরোধ করলেন, বিশ্বকাপে সুনীল নারাইনকে খেলানোর জন্য তিনি যেন রাজি করান। নারাইনের সঙ্গে গম্ভীরের সুসম্পর্কের কথা পাওয়েল জানতেন। পাওয়েলের প্রশ্নে গম্ভীর প্রথম আঁতকে উঠলেও পরে নারাইনের সামনে প্রশ্নটা রেখেছিলেন। বোর্ডের উপর ক্ষিপ্ত থাকা নারাইনের জবাব ছিল, “খেলতেই পারি। যদি তুমি ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের কোচ হও।” দু’জনেই হেসে উঠেছিলেন। সে বার গম্ভীরের কোচিংয়ে কেকেআর চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ় বিশ্বকাপ জিততে পারেনি।

ক্রিকেটজীবনে গম্ভীরের সম্পর্কে এক ভারতীয় কোচ প্রায়শই বলতেন, “ও ভাল অমিতাভ বচ্চন। ভারতীয় ক্রিকেটের অ্যাংরি ইয়ং ম্যান।” কোচিং জীবনে গম্ভীর বরাবর পিছিয়ে থাকা, ভুল করতে থাকা ক্রিকেটারদের পাশে থেকেছেন। ঠিক যে চরিত্রে পুরনো দিনের সিনেমায় অমিতাভকে দেখা যেত।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement