লিয়োনেল মেসি। —ফাইল চিত্র।
তিন বছর আগেই কি এ বারের বিশ্বকাপ জেতার ছক কষে ফেলেছিলেন লিয়োনেল মেসি? এ বার তিনি যা খেলছেন, তাতে সেই প্রশ্নই বার বার উঠে আসছে। দু’ম্যাচে পাঁচ গোল করে ফেলেছেন মেসি। একের পর এক ম্যাচ জিতছে আর্জেন্টিনা। অপ্রতিরোধ্য দেখাচ্ছে তাদের। দলের এই সাফল্যের নেপথ্যে কি মেসির এক চাল?
২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ জেতার সময় ফ্রান্সের ক্লাব প্যারিস সঁ জরমঁ-এ খেলতেন মেসি। বিশ্বকাপের পরেই সেই ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি শেষ করেন। ২০২৩ সালে যোগ দেন আমেরিকার মেজর লিগ সকারের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে। তাতে এক দিকে যেমন আমেরিকায় ফুটবলের প্রচার হয়েছে, তেমনই লাভবান হয়েছেন মেসিও।
দলের কোচ লিয়োনেল স্কালোনি বলছেন, “যত দিন চাইবে নিজের সেরা ফর্মে থাকে লিয়ো। গত ২০ বছর ধরে ও এটাই করছে।” ফ্রান্সের তারকা থিয়েরি অঁরি আবার মেসিকে এই গ্রহের মানতে নারাজ। তিনি বলছেন, “লিয়ো সকলের থেকে আলাদা। ও সম্পূর্ণ এক আলাদা বিষয়। ও এই গ্রহের নয়।”
এটি নিঃসন্দেহে মেসির শেষ বিশ্বকাপ। দু’দিন পরেই ৩৯ বছরে পা দেবেন তিনি। কিন্তু এক বারও তা দেখে মনে হচ্ছে না। এখনও আর্জেন্টিনার প্রধান চালিকাশক্তি তিনি। আলজেরিয়া ম্যাচের পর ফুটবল বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্সি লালাস বলেছেন, “আমাদের তো এই দৃশ্য গা সওয়া হয়ে গিয়েছে। আর্জেন্টিনায় মেসিই একটা সিস্টেম। ওই প্রধান পরিকল্পনা। ওই গোটা দলকে চালায়। বাকিরা শুধু ওকে অনুসরণ করে।”
তিন বছর আগে মেসির আমেরিকা যাওয়ার নেপথ্যে কয়েকটি কারণ ছিল। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ, ধকল সামলানো। ইউরোপের ক্লাবে খেললে এক মরসুমে অন্তত ৫০টি ম্যাচ খেলতে হয়। মেজর লিগ সকারে সংখ্যাটা অনেক কম। ম্য়াচ বেছে খেলতে পারেন মেসি। তাঁকে সেই স্বাধীনতা দিয়েছে ডেভিড বেকহ্যামের ক্লাব। দেবে না-ই বা কেন। যে ক্লাব মেসি আসার আগে কোনও ট্রফির ধারেকাছে পৌঁছোতে পারেনি, সেই ক্লাবই মেসির হাত ধরে দু’বছরে দু’টি ট্রফি জিতে গিয়েছে।
ধকল কমিয়ে কী ভাবে সফল হওয়া যায় সেটা মেসি আগেই দেখিয়েছেন। যত দিন বার্সেলোনায় ছিলেন, ক্লাবের হয়ে অত্যধিক ম্য়াচ খেলতে গিয়ে দেশকে সাফল্য দিতে পারতেন না। সকলে বলতেন, মেসি বার্সাতেই সুন্দর। আর্জেন্টিনার জার্সিতে না। সেই মেসিই পিএসজি গিয়ে ধকল খানিকটা কমিয়েছিলেন। তার ফসল ২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ জয়। আমেরিকায় গিয়ে সেই ধকল আরও খানিকটা কমিয়েছেন তিনি।
মেসি নিজে অবশ্য বলছেন, বিশ্বকাপে খেলা তাঁর কাছে সবচেয়ে বেশি আনন্দের। এ বারের বিশ্বকাপের আগে লিয়ো বলেন, “আমি খেলতে ভালবাসি। প্রতিযোগিতা ভালবাসি। আরও একটা বিশ্বকাপ খেলতে নামছি। এর থেকে বেশি আনন্দ আর কিছুতে পাই না। গোটা কেরিয়ার জুড়ে যে ভাবে নিজেকে তৈরি করেছি, এখনও সেটাই করছি।”
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
শুধু নিজে মায়ামিতে যাননি মেসি, সেখানে নিয়ে এসেছেন আর্জেন্টিনার আর এক সতীর্থ রদ্রিগো ডি পলকে। এই দলের ডি পলের থেকে ভাল তাঁকে কেউ বোঝে না। গোটা মরসুম একসঙ্গে খেলেন। সেই বোঝাপড়া বিশ্বকাপেও দেখা যাচ্ছে। আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে মেসির প্রথম গোল ডি পলের ডিফেন্সচেরা পাস থেকেই। মাঠে দু’জনের বোঝাপড়া চোখে পড়ছে। তাতে দলের আক্রমণ আরও ভাল হচ্ছে।
ডি পল জানিয়েছেন, তাঁরা বিশ্বকাপের অনেক আগে থেকে নিজেদের তৈরি করেছেন। আর্জেন্টিনার ফুটবলার বলেন, “আমরা প্রতিদিন কঠোর অনুশীলন করেছি। তার ফল পাচ্ছি। লিয়োকে দেখে ওর বয়স বোঝা যাচ্ছে না। মাঠে নেমে একই রকম মজা করে খেলছে। ওর খেলা দেখতেও ভাল লাগে।”
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
স্পেনেরই এক কিংবদন্তি রাফায়েল নাদালের উপর নির্মিত একটি সিরিজ় দেখে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন মেসি। তিনি বলেছেন, “নাদালের সঙ্গে আমি একমত। যত দিন মনে হবে খেলতে পারব, তত দিন খেলব।” এখনও সেই মানসিকতা রয়েছে মেসির। এখনও মাঠে নেমে প্রতিপক্ষকে একাই শেষ করে দিচ্ছেন। এখনও আর্জেন্টিনাকে টানছেন। তবে তার নেপথ্যে রয়েছে এক সিদ্ধান্ত। তার ফসল তুলছে আর্জেন্টিনা। মেসির হাতে ধরেই আরও এক বার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছে তারা।