গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
হ্যারি কেন পারলেন। জোড়া গোল করে দলকে জেতালেন। লিয়োনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপে, আর্লিং হালান্ডদের সঙ্গে বিশ্বকাপের সোনার বুটের লড়াইয়ে ঢুকে পড়লেন। কিন্তু পারলেন না ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। পারলেন না গোল করতে। পারলেন না সুযোগ কাজে লাগাতে। ফলে সমস্যায় পড়ল পর্তুগাল। কঙ্গোর বিরুদ্ধে ড্র করল তারা। দিনের বাকি দুই ম্যাচেও ফল হল। ঘানার কাছে হারল পানামা। প্রথম বার বিশ্বকাপ খেলতে নেমে কলম্বিয়ার কাছে হারল উজবেকিস্তান।
লিয়োনেল মেসি, আর্লিং হালান্ড, কিলিয়ান এমবাপে— এই মুহূর্তে বিশ্ব ফুটবলে যাঁদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়, তাঁরা প্রত্যেকেই বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে গোল পেয়েছেন। মেসি তো হ্যাটট্রিকও করেছেন। ফলে বুধবার রোনাল্ডো কী করেন সে দিকে অনেকেরই নজর ছিল। প্রথম দিনই তাঁরা হতাশ হয়ে পড়লে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। রোনাল্ডো আগাগোড়া যা খেললেন তাতে তাঁকে প্রথম একাদশে জোর করে রাখা হচ্ছে কি না, সেটা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।
কাতার বিশ্বকাপে রোনাল্ডোর সঙ্গে তৎকালীন পর্তুগালের কোচ ফের্নান্দো সান্তোসের ইগোর লড়াই নিয়ে চর্চা হয়েছিল। রোনাল্ডোকে প্রথম একাদশে রাখতেন না সান্তোস, যা নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। বিশ্বকাপের পর চাকরিও যায়। পর্তুগালের কোচ হওয়ার পর রবার্তো মার্তিনেজ় ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর দল হবে রোনাল্ডোকে ঘিরেই। তাই দলে একাধিক নেতা থাকা সত্ত্বেও ৪১ বছরের রোনাল্ডো প্রথম একাদশে তো ছিলেনই, তাঁর হাতেই উঠেছিল অধিনায়কের আর্মব্যান্ড। খেলার শেষে রোনাল্ডো নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে দেখতে পারেন, আদৌ নিজের জায়গার প্রতি সুবিচার করতে পারছেন তো?
এ দিন হাতে গুণে বলা যাবে, ক’টি বল ধরেছেন তিনি। না একটি ভাল সুযোগ তৈরি করতে পেরেছেন, না বাকিদের করে দেওয়া সুযোগ কাজে লাগাতে পেরেছেন। দ্বিতীয়ার্ধে যে দু’টি বল রোনাল্ডোর উদ্দেশে বাড়িয়েছিলেন ফ্রান্সিসকো কনসেসাও, তার অন্তত একটি থেকে গোল করা অবশ্যই উচিত ছিল। রোনাল্ডো দু’বারই বলে ঠিকঠাক পা লাগাতে পারেননি। হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন।
বস্তুত, রোনাল্ডোর নিজস্ব কৌশল নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বয়সের কারণে তিনি আগের মতো উইংয়ে খেলতে পারেন না বা দৌড়তে পারেন না ঠিক আছে। কিন্তু বল কাড়ার ন্যূনতম প্রয়াসও করতে দেখা যাবে না? এক সময় মনে হচ্ছিল পর্তুগাল খেলছে দশ জনে। রোনাল্ডোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। না তাঁকে দেখা গেল নীচে নেমে আসতে। না দেখা গেল প্রতিপক্ষের পিছনে ধাওয়া করতে। এমন ফুটবলারকে তা হলে মাঠে রেখে কাজ কী, যাঁকে প্লেটে ধরে গোলের বল সাজিয়ে দিতে হবে!
পর্তুগালের হাতে অনেক ভাল ফুটবলার, বিশেষ করে মিডফিল্ডার রয়েছে। ব্রুনো ফের্নান্দেজ়, ভিটিনহা, বের্নার্দো সিলভারা নিজেদের ক্লাবে নায়কের মর্যাদা পান। তাঁরা একসঙ্গে হলে কতটা ধ্বংসাত্মক ফুটবল খেলে পর্তুগাল, সে দিকে নজর ছিল। কিন্তু সেই জুটি, সেই বোঝাপড়া গোটা ম্যাচে তৈরি হল কোথায়? প্রত্যেকেই নিজের মতো করে খেললেন। ভিটিনহা গোটা ম্যাচে প্রচুর পরিশ্রম করেছেন। খেলা তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। অথচ তাঁকে ম্যাচের শেষ দিকে তুলে নেওয়া হল। আর রেখে দেওয়া হল রোনাল্ডোকে!
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
পর্তুগালের রক্ষণে এক সময় পেপে দাপিয়ে খেলেছেন। সঙ্গে থাকতেন রিকার্ডো কার্ভালহো। এ দিন দু’জনেই মাঠে ছিলেন। পেপে ছিলেন ভিআইপি বক্সে। কার্ভালহো পর্তুগালের ডাগআউটে। দূর থেকে তাঁরা ভাবতেই পারেন, এ কোন দল! ডান দিক থেকে ভেসে আসা ক্রসে যখন ইয়োনে উইসা হেড করছেন, তখন তাঁকে কেউ আটকাননি। ধারেকাছেই ছিলেন না কেউ। স্কুল পর্যায়ের গাফিলতি দেখা গেল পর্তুগালের রক্ষণে। রেনাতো ভেগা এবং টমাস আরাউখোর বোঝাপড়ার অভাব বার বার দেখা গিয়েছে।
কঙ্গোর কৌশল ছিল একটাই— ঘর বাঁচিয়ে আক্রমণে যাও। তারা জোর দিয়েছিল রক্ষণে। শুরুতেই ছ’মিনিটের মাথায় জোয়াও নেভেস যে ও রকম একটা গোল করে দেবেন, তা কঙ্গো ভাবতে পারেনি। পেদ্রো নেতোর ক্রসে আচমকা লাফিয়ে নিখুঁত হেডে বল জালে জড়ান নেভেস। এর পর কঙ্গো আরও সতর্ক হয়ে যায়। দীর্ঘদেহী ডিফেন্ডারেরা এরিয়াল বল পর্তুগালকে ছুঁতে দিচ্ছিলেন না। সেট পিস, কর্নার, সব দিকেই সমস্যা হচ্ছিল পর্তুগালের। বাধ্য হয়ে তারা ছোট কর্নার নেওয়া শুরু করে। তাতেও সাফল্য পায়নি। কারণ পাসের মাধ্যমে গোলের রাস্তা খোলার পথও বন্ধ করে দিয়েছিল কঙ্গো।
একদম শেষে নামানো হল আগের বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা গন্সালো রামোসকে। কনসিসাও এলেন বিরতিতে। নামানোই হল না সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডার জোয়াও ফেলিক্সকে। শুধু রোনাল্ডো নন, পর্তুগালের কোচ মার্তিনেজ়ের দল নির্বাচন নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন থাকছে। পর্তুগালের এই সোনালি প্রজন্ম বিশ্বকাপে হতাশ করলে তাঁর অবস্থাও হতে পারে সান্তোসের মতোই।
চলতি বিশ্বকাপে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো বাদে মোটামুটি সব বড় তারকা ফুটবলারই গোল করেছেন। চোখ ছিল হ্যারি কেনের দিকেও। হতাশ করলেন না ইংল্যান্ডের অধিনায়ক। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে মরসুমটা ভাল গিয়েছে তাঁর। দেশের জার্সিতেও এই ম্যাচটা স্মরণীয় করে রাখলেন। দু’টি গোল এল তাঁর থেকে। একটি করে গোল জুড বেলিংহ্যাম এবং মার্কাস রাশফোর্ডের।
ডালাসে প্রথমার্ধেই হয় চার গোল। দু’বার পিছিয়ে পড়েও ম্যাচে সমতা ফিরিয়ে ক্রোয়েশিয়া। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যান্ডের আগ্রাসী ফুটবলের সামনে দাঁড়াতে পারেনি তারা। আট মিনিটের মাথায় লুকা মদ্রিচ বক্সে ফাউল করেন নোনি মাদুয়েকেকে। রেফারি পেনাল্টির নির্দেশ দেন। কেনের প্রয়াস ক্রোয়েশিয়া গোলকিপার ডোমিনিক লিভাকোভিচ বাঁচিয়েও দেন। তবে সেই প্রয়াস বাতিল হয়ে যায়। কারণ কেন শট মারার আগেই লিভাকোভিচ গোললাইন ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। দ্বিতীয় প্রয়াসে কেন গোল করতে ভুল করেননি।
এর পর খেলায় ইংল্যান্ডের দাপট ক্রমশ বাড়তে থাকে। বলের নিয়ন্ত্রণ থেকে গোল লক্ষ্য করে শট, সবেতেই তারা এগিয়ে ছিল। কিন্তু ক্রোয়েশিয়াও ছেড়ে কথা বলছিল না। থেকে থেকে আক্রমণে উঠছিল তারা। সেই আক্রমণ থেকেই দুরন্ত শটে গোল করেন মার্তিন বাতুরিনা। প্রথমে পেতার সুসিচ ধোঁকা দিয়ে মাটি ধরিয়েছিলেন জন স্টোনসকে। তাঁর নিখুঁত পাস পেয়ে বক্সের বাইরে থেকে মারা জোরালো শটে গোল করেন বাতুরিনা।
পাঁচ মিনিট পরে দ্বিতীয় গোল করেন কেন। ডেক্লান রাইসের কর্নার থেকে হেডে বল জালে জড়ান। এ ক্ষেত্রেও ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণ দায়ী। কেন এমনিতেই এরিয়াল বলে শক্তিশালী। হেডও করেন দুর্দান্ত। তা হলে তাঁকে কর্নারের সময় ফাঁকা রেখে দেওয়া হল কেন ? ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপে ১০টি গোল করে ফেললেন কেন। যুগ্ম ভাবে শীর্ষে গ্যারি লিনেকারের সঙ্গে। এ বার সমতা ফেরাতে সময় নেয়নি ক্রোয়েশিয়া। চার মিনিট পরে ইভান পেরিসিচের পাস থেকে গোল করেন পেতার মুসা।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
দ্বিতীয়ার্ধে পুরোপুরি পাল্টে যায় ইংল্যান্ডের খেলা। যে ইংল্যান্ড প্রথমার্ধে কিছুটা সতর্ক হয়ে খেলছিল, দ্বিতীয়ার্ধে তারাই আক্রমণের ঝড় বইয়ে দেয় ক্রোয়েশিয়ার অর্ধে। বিরতির দু’মিনিট পরে গোল করেন বেলিংহ্যাম। ডান প্রান্তে বল পেয়ে একাই টেনে নিয়ে গিয়ে লিভাকোভিচকে পরাস্ত করেন তিনি। ইংল্যান্ডের ওই আগ্রাসনের সামনে দিশা খুঁজে পায়নি ক্রোয়েশিয়া। তারা ক্রমশ কুঁকড়ে যেতে থাকে। আরও কয়েকটি সুযোগ পেয়েছিল ইংল্যান্ড। কাজে লাগাতে পারলে ব্যবধান বাড়ত।
ইংল্যান্ডের ওই ঝড় দীর্ঘ ক্ষণ স্থায়ী হয়নি। দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি থেকে আবার পাল্টা আক্রমণ করতে থাকে ক্রোয়েশিয়া। কিন্তু নিজেদেরই ভুলে গোল পায়নি তারা। উল্টে বেঞ্চ থেকে নেমেই গোল করেন রাশফোর্ড। বুকায়ো সাকার পাসটিও ছিল অনবদ্য।
বলের দখল থেকে শুরু করে গোল লক্ষ্য করে শট, সবই বেশি ছিল পানামার। কিন্তু কাজের কাজটাই করতে পারল না তারা। গোল করতে পারল না। একেবারে শেষ মুহূর্তে সেটাই করে দেখাল ঘানা। ৯০ মিনিটেও দু’দল ০-০ ছিল। দেখে মনে হচ্ছিল, খেলা ড্র হবে। সংযুক্তি সময়ের একেবারে শেষ মিনিটে গোল করেন ঘানার সেলেব ইরেনকি। ১-০ গোলে ম্যাচ জিতে নেয় ঘানা।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
এ বারই প্রথম বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল এশিয়ার এই দেশ। কিন্তু কলম্বিয়ার সামনে দাঁড়াতে পারল না তারা। প্রথমার্ধের শেষ দিকে গোল করে কলম্বিয়াকে এগিয়ে দেন ড্যানিয়েল মুনোজ়। দ্বিতীয়ার্ধে সমতা ফেরায় উজবেকিস্তান। গোল করেন আব্বোসেবেক ফায়জুলায়েভ। ৫ মিনিট পর আবার কলম্বিয়াকে এগিয়ে দেন লুইস দিয়াজ়। খেলা শেষ হওয়ার এক মিনিট আগে লাতিন আমেরিকার দলের হয়ে তৃতীয় গোল করেন জেমিনটন ক্যাম্পাজ়। ৩-১ গোলে জেতে কলম্বিয়া।
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।