FIFA World Cup 2026

বিশ্বকাপে অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্স! এই দলকে রুখবে কে? একের পর এক প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে কী ভাবে এগোচ্ছেন এমবাপেরা

মাঠে নেমে স্বপ্নের ফুটবল খেলছেন কিলিয়ান এমবাপে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসেরা। এই দলকে কে রুখবে? কোনও খুঁত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না ফ্রান্সের।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬ ০৯:৩৩
Share:

এমবাপেকে (মাঝে) জড়িয়ে ধরে উল্লাস দুই সতীর্থ উপামেকানো (বাঁ দিকে) ও ওলিসের। ছবি: রয়টার্স।

ফ্রান্স কি অন্য কোনও বিশ্বকাপে খেলছে? বাকিরা যেখানে ছোট দলগুলিকে হারাতেও হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে ফ্রান্সের সামনে কেউ দাঁড়াতে পারছে না। সে নরওয়ে হোক বা সুইডেন। ব্রাজ়িল, কানাডা, নরওয়ে শেষ মুহূর্তের গোলে কোনও রকমে জিতেছে। মরক্কো ও প্যারাগুয়েকে টাইব্রেকারে জিততে হয়েছে। বিদায় নিয়েছে জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস। সেখানে অপ্রতিরোধ্য দেখাচ্ছে কিলিয়ান এমবাপেদের। কোন জাদুতে সকলকে মুগ্ধ করছে ফ্রান্স? কেন এতটা অপ্রতিরোধ্য দেখাচ্ছে তাদের?

Advertisement

‘ফেভারিট’-এর মতোই খেলছে ফ্রান্স

এ বারের বিশ্বকাপেও ফেভারিট তকমা নিয়ে নেমেছে ফ্রান্স। নামবে না কেন। ২০১৮ সালের চ্যাম্পিয়ন। ২০২২ সালের রানার্স। গত ১২ বছরে বিশ্বফুটবলে সবচেয়ে ধারাবাহিকতা দেখিয়েছে তারা।

গ্রুপ পর্বে সেই ছবিটাই দেখা গিয়েছে। তিন ম্যাচই জিতেছে ফ্রান্স। তারা বাদে আর দু’টি দলের এই কীর্তি রয়েছে। আর্জেন্টিনা ও মেক্সিকো। গ্রুপ পর্বে সবচেয়ে বেশি ১০ গোল করেছে তারা। নেদারল্যান্ডস ও জার্মানিও ১০টি করে গোল করেছে। তবে তারা এখন অতীত। বিশ্বকাপের বাইরে। ফ্রান্স তরতর করে এগোচ্ছে।

Advertisement

সুইডেনের বিরুদ্ধে ২৫ শট

রাউন্ড অফ ৩২-এ যে দলের বিরুদ্ধে ফ্রান্স নেমেছিল সেই সুইডেনের দলে সাত জন ফুটবলার এমন ছিলেন, যাঁরা প্রিমিয়ার লিগে প্রথম একাদশে খেলেন। তার পরেও এমবাপেদের থামাতে পারেনি সুইডেন। তাদের গোল লক্ষ্য করে মোট ২৫টি শট নিয়েছে ফ্রান্স। তার মধ্যে ১২টি গোলে ছিল। বিশ্বকাপের কোনও ম্যাচে এর থেকে বেশি শট একটি ম্যাচেই নিয়েছিল ফ্রান্স। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে শেষ ষোলোয় প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে। ৩৭টি শট মেরেছিলেন জিনেদিন জ়িদানেরা। সে বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন কিন্তু হয়েছিল ফ্রান্সই।

দলের ‘এমভিপি’ এমবাপে

এই ফ্রান্স দলের প্রাণভোমরা এমবাপে। দলের ‘মোস্ট ভ্যালুয়েবল ফুটবলার’ তিনি। তাঁর কাছেই গোলের জন্য তাকিয়ে থাকেন দিদিয়ের দেশঁ। নিরাশ করেন না এমবাপে। করেননি সুইডেনের বিরুদ্ধেও। প্রথম শট পোস্টে লাগলেও হতাশ হননি। জোড়া গোল করেছেন। চলতি বিশ্বকাপে সোনার বুটের লড়াইয়ে মেসির সমান ৬ গোল এমবাপের। বিশ্বকাপে ১৮ ম্যাচে ১৮ গোল করে ফেলেছেন তিনি। ম্যাচ প্রতি একটি করে গোল। এই রেকর্ড আর কারও নেই।

দুরন্ত গতি এমবাপের। তিনি বল ধরলে রক্ষণ কেঁপে যায়। যে গতিতে তিনি এগোন, তা দেখে অবাক লাগে। সেই গতিতেই ড্রিবল করতে করতে এগোন তিনি। এই গতিতে এমন পায়ের কুঁচির কাজ থাকলে তাঁকে আটকাবে সাধ্য কার। সেই কারণেই হয়তো এমবাপে ডাগআউটে ফেরার সময় তাঁকে ‘বাও’ করেছেন কোচ দেশঁ। বোঝা যাচ্ছে, ফরাসি তারকায় মুগ্ধ কোচও।

দলের ‘এমআইপি’ ওলিসে

এমবাপে যদি ‘মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার’ হন তা হলে এই ফ্রান্স দলের ‘মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট ফুটবলার’ হলেন ওলিসে। কেন তিনি এ বার বালোঁ দ্যর-এর দৌড়ে রয়েছেন তা বোঝা যাচ্ছে। এই দলটাকে খেলাচ্ছেন ওলিসে।

সুইডেন ম্যাচে সেন্টার ব্যাকের কাছ থেকে বল পেয়েছেন ওলিসে। কখনও ডান দিকে উসমান দেম্বেল, কখনও বাঁদিকে ব্যাডলি বার্কোলাকে বল দিয়েছেন। আবার কখনও সামনে এমবাপেকে বল দিয়েছেন। আবার কখনও নিজেই ঢুকে পড়েছেন গোল করতে। সুইডেনের বিরুদ্ধে তাঁর ভলি গোলে ঢুকলে তা এই বিশ্বকাপের সেরা গোল হত। দেখে মনে হচ্ছিল, মেটলাইফ স্টেডিয়ামের প্রতিটি ঘাস তাঁর চেনা। চোখ বন্ধ করেও খেলতে পারবেন সেখানে।

গোটা ম্যাচে ৯৩ বার বলে টাচ করেছেন ওলিসে। তাঁর টাচ ম্যাপ দেখাচ্ছে, গোটা মাঠ জুড়ে খেলেছেন তিনি। ২০২৪ সালের অলিম্পিক্সে ওলিসেকে কোচিং করিয়েছেন ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি। তিনিই বলেছেন, “যদি এমবাপে ফ্রান্সের মোস্ট ভ্যালুয়েবল ফুটবলার হয়, তা হলে ওলিসে এই দলের মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট ফুটবলার। ওকে ছাড়া চলবে না। যে ভাবে ও খেলাটা দেখে তা অন্যদের থেকে আলাদা। অনুশীলনে ও এমন কিছু করে, যা দেখে আপনি ভাববেন, ওহ, এই ছেলেটা অন্য গ্রহ থেকে এসেছে।”

প্রিমিয়ার লিগে ম্যাঞ্চেস্টার সিটির হয়ে নজর কাড়া রায়ান শেরকিকেও খেলাতে পারছেন না দেশঁ। তাঁর জায়গা নিয়েছেন ওলিসে। কোচকে ভরসা দিচ্ছেন তিনি।

ফ্রান্সের তরুণ মাঝমাঠ

ফুটবলে বলা হয়, মাঝমাঠ যাদের দখলে থাকে, তাদের জেতার সম্ভাবনা বেশি। ফ্রান্স সেটাই করে দেখাচ্ছে। মাঠমাঠ দখলে রাখছে। ওলিসে ছাড়াও বার্কোলা ও ডেজ়িরে ডুয়েও দেখাচ্ছেন, কেন তাঁদের উপর এত ভরসা দেখাচ্ছেন কোচ দেশঁ। ওলিসের বয়স ২৪। বার্কোলার ২৩। ডুয়ের ২১। তাঁদের গতি রয়েছে। স্কিল রয়েছে। দেশঁ এই তিন জনকে তাঁর দলের অক্সিজেন বলেন। সত্যিই, ফ্রান্সকে নতুন জীবন দিচ্ছেন তাঁরা।

সুইডেনের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় গোল করেছেন বার্কোলা। তাঁর গতি দুই সুইডিশ ডিফেন্ডারকে মাটি ধরিয়েছে। ফ্রান্সের এই মাঝমাঠের খেলায় মুগ্ধ সুইডেনের সবচেয়ে বড় তারকা জ্লাটান ইব্রাহিমোভিচ। তিনি বলেছেন, “বাকিরা খুনি মানসিকতা নিয়ে খেলে। কিন্তু ওলিসের কাছে সব সমস্যার সমাধান রয়েছে। শুধুমাত্র জিনিয়াসরাই সেটা পারে।”

২০২২ সালের ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হারের পর হুগো লরিস, রাফায়েল ভারান, আঁতোয়া গ্রিজ়ম্যান, অলিভিয়ের জিরুরা চলে গিয়েছেন। তাঁদের জায়গায় এসেছেন তরুণ তুর্কিরা। সুইডেনের স্ট্রাইকার ভিক্টর গয়কেরেসও ধরতে পারেননি ফ্রান্সের খেলা। তিনি বলেন, “ওরা নিজেদের মধ্যে জায়গা বদল করে খেলে। এক জায়গায় থাকে না। নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া দুর্দান্ত। জানে কে, কোথায় থাকবে। কে, কাকে বল দেবে। ওদের আটকানো সত্যিই কঠিন।”

দেশঁর স্মরণীয় বিদায়

এ বারের বিশ্বকাপের পরেই অবসর নেবেন দেশঁ। তিনি অধিনায়ক ও কোচ হিসাবে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন। দেশঁর বিদায় স্মরণীয় করে রাখতে চান এমবাপেরা। বিশ্বকাপের মাঝেই নিজের মাকে হারিয়েছেন দেশঁ। মায়ের শেষকৃত্য করে আবার দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। সুইডেনের বিরুদ্ধে প্রথম গোল করেই দেশঁর দিকে ছুটে গিয়েছেন এমবাপে। জড়িয়ে ধরেছেন। এটাই বুঝিয়ে দিচ্ছে, কোচের জন্য খেলছেন তাঁরা। কোচকে ট্রফি দেওয়ার জন্য লড়ছেন।

সুইডেনের কোচ গ্রাহাম পটারও ফ্রান্সকে দেখে মুগ্ধ। খেলা শেষে তিনি বলেছেন, “এর থেকে ভাল দল আমি দেখিনি।” ফ্রান্সের হয়ে ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী প্যাট্রিক ভিয়েরার মতে, এই দলের সঙ্গে একমাত্র তাঁদের বিশ্বজয়ী দলের তুলনা করা যায়। তবে বিচার করলে এমবাপেরাই খানিকটা এগিয়ে থাকবেন। ইংল্যান্ডের প্রাক্তন ফুটবলার ইয়ান রাইট বলেছেন, “আমার মনে পড়ছে না, শেষ বার বিশ্বকাপে কোন দলকে এতটা দাপট দেখাতে দেখেছি। ওদের কে আটকাবে?”

কঠিন প্রতিপক্ষ পড়লে বিপদ

ফ্রান্সের এই বিশ্বকাপে একটাই সমস্যা হতে পারে। গ্রুপ পর্ব থেকে এখনও পর্যন্ত সে রকম বড় দলের বিরুদ্ধে খেলতে হয়নি তাদের। কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর বিরুদ্ধে পড়তে পারে ফ্রান্স। তার পরে স্পেন, পর্তুগাল বা ক্রোয়েশিয়ার চ্যালেঞ্জ সামলাতে হতে পারে। ফাইনালের আগে অবশ্য ব্রাজ়িল, আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে খেলবে না ফ্রান্স। তবে নকআউটে সামনে কঠিন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কি এই খেলাটাই দেখাতে পারবেন এমবাপেরা? যদি পারেন, তা হলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া থেকে এই দলকে আটকাবে কে?

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement