গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর প্রথম ট্রফি জিততে ব্রাজ়িলের লেগেছিল ২৮ বছর। তার পর ১২ বছরের মধ্যে তিন বার বিশ্বকাপ জেতে তারা। আবার ২৪ বছর পর ট্রফি জেতে। সেই ট্রফি এসেছিল আমেরিকাতে। বেবেতো, রোমারিয়ো, মাজ়িনহোদের দলের সেই কীর্তি এখনও অমলিন।
ঘটনাচক্রে, শেষ বার ব্রাজ়িলের ঘরে বিশ্বকাপ এসেছিল ২০০২-এ। তার পর ঠিক ২৪ বছর কেটেছে। পাঁচ বারের বিশ্বজয়ীরা আবার ট্রফির দাবিদার হিসাবে খেলতে নামছে আমেরিকায়। গত দু’টি বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছিল ব্রাজ়িল। এ বার সমর্থকেরা নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। তার একটা কারণ যদি হয় দলের কোচ, দ্বিতীয় কারণ প্রতিভাবান ফুটবলারদের ভিড়। বিশ্বকাপের আগে ব্রাজ়িল দলের বিশ্লেষণ করল আনন্দবাজার ডট কম।
কার্লো আনচেলোত্তি ফ্যাক্টর— বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাফল্যের সঙ্গে কোচিং করিয়েছেন আনচেলোত্তি। পাঁচ বার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন। তবে প্রথম বার লাতিন আমেরিকায় কোচিং করাতে গিয়েছেন। দেশীয় কোচের গোঁড়ামি ছেড়ে ইটালীয় আনচেলোত্তির উপরেই ভরসা রেখেছে ব্রাজ়িল। মহাতারকাদের অহংকার এবং ধুরন্ধর বুদ্ধি— আনচেলোত্তি এগিয়ে থাকবেন এ রকম অনেক কারণে। রিয়াল মাদ্রিদে ভিনিসিয়াসদের থেকে সেরাটা বার করে এনেছেন। তাঁর কোচিং দক্ষতা প্রশ্নাতীত।
বিশ্বমানের উইঙ্গার এবং প্রতি আক্রমণের ক্ষমতা— দলে একাধিক বিখ্যাত নাম না থাকলেও ভিনিসিয়াস এবং রাফিনহার মতো খেলোয়াড় থাকায় ব্রাজ়িলের ট্রানজ়িশন প্লে চমকে দিতে পারে বিপক্ষকে। বিপক্ষের ফুলব্যাককে নাস্তানাবুদ করার দক্ষতা রয়েছে দু’জনেরই। গতিতেও পরাস্ত করতে পারবেন তাঁরা।
গোলকিপিংয়ে গভীরতা— খুব কম দলের হাতেই গোলকিপিংয়ে এত ভাল বিকল্প রয়েছে। অ্যালিসন বেকার, এদেরসন নিজেদের ক্লাবে প্রথম পছন্দের গোলকিপার। দু’জনের অভিজ্ঞতাই প্রচুর। শট থামানো বা বল বিতরণ, সব বিভাগেই তাঁরা এগিয়ে থাকবেন।
মজবুত রক্ষণ— সেন্ট্রাল ডিফেন্সে মারকুইনহোস এবং গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েসের বোঝাপড়া খুবই ভাল। শারীরিক এবং কৌশলগত দিক থেকে তারা বিপক্ষকে চাপে ফেলে দেবেন। বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা সেন্ট্রাল ডিফেন্স রয়েছে ব্রাজ়িলের।
ভাল মানের ফুলব্যাকের অভাব— রবার্তো কার্লোস, কাফু, মার্সেলোর মতো ফুটবলার নেই। ফলে ফুলব্যাকে ব্রাজ়িলের সোনালি দিনও আর নেই। আলেক্স সান্দ্রো বা দানিলোর মতো ফুটবলারের উপরেই ভরসা করতে হবে, যাঁরা নিয়মিত ফুলব্যাকে খেলেন না। উপরে উঠলে দ্রুত নীচে নামার ক্ষমতা তাঁদের নেই।
নির্দিষ্ট ৯ নম্বর না থাকা— এক সময় ৯ নম্বর, অর্থাৎ নিখুঁত স্ট্রাইকারের পজিশনে রোনাল্ডো ছাড়া কাউকে ভাবা যেত না। এখনকার ব্রাজ়িল দলে সেই জায়গায় খেলার মতো ফুটবলার নেই। ম্যাথেউস কুনহা, এনদ্রিক এবং ইগর থিয়াগোকে দিয়ে কাজ চালাতে হবে। না হলে নির্ভর করতে হবে মিডফিল্ডারদের উপরে।
মিডফিল্ডে গঠনগত সমস্যা— আনচেলোত্তি অতি আগ্রাসী ফুটবলে বিশ্বাস করেন। সে ক্ষেত্রে রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার কাসেমিরো এবং ব্রুনো গিমারায়েসের উপরে শারীরিক ধকল পড়তে পারে। যদি দ্রুত নীচে নামতে না পারেন, তা হলে দুই সেন্টারব্যাক একা হয়ে যাবেন। ব্রাজ়িলও গোল হজম করবে।
এনদ্রিক এবং পরবর্তী প্রজন্ম— এই বিশ্বকাপে উদীয়মান তারকা হতে পারেন এনদ্রিক, ইগর থিয়াগো, রায়ানেরা। অতীত প্রজন্মের ছায়া কাটিয়ে বেরোনোর বিশ্বমঞ্চে হাজির হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তাঁদের মধ্যে।
উত্তর আমেরিকার সমর্থন— প্রায় ২৮ লক্ষ ব্রাজ়িলীয় থাকেন উত্তর আমেরিকায়। ফলে ব্রাজ়িল যেখানেই খেলতে যাক, সমর্থনের অভাব হবে না। নিউ ইয়র্ক এবং মায়ামিতে প্রচুর ব্রাজ়িলীয় খেলা দেখতে মাঠে ভিড় করবেন। ফলে ‘হোম অ্যাডভান্টেজ’ পাবে ব্রাজ়িল।
ঐতিহাসিক চক্র— আমেরিকায় শেষ যে বার বিশ্বকাপ হয়েছিল, ব্রাজ়িল ট্রফি জিতেছিল ২৪ বছরের খরা কাটিয়ে। ২০২৬-এ আবার বিশ্বকাপ আমেরিকায়। ব্রাজ়িলও শেষ বার ট্রফি জিতেছে ঠিক ২৪ বছর আগে।
নেমার এবং চোট-আঘাত— শেষ মুহূর্তে ২৬ জনের দলে ঢুকেছেন নেমার। তবে চোট রয়েছে তাঁর। ফলে প্রথম ম্যাচ না-ও খেলতে পারেন। প্রতিযোগিতার মাঝে নেমার চোট পেলে সমস্যা বাড়বে। নেমারকে নিয়ে বাড়তি আলোচনা হলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বাকি ফুটবলারদের উপরে।
প্রাক-বিশ্বকাপ চোট— বিশ্বকাপের আগেই ব্রাজ়িল দলের একাধিক ফুটবলার চোটের কবলে। রদ্রিগো, এস্তেভাও, এদের মিলিতাওরা প্রতিযোগিতা থেকে পুরোপুরি ছিটকে গিয়েছেন। তিন জনেই প্রতিভাবান। এঁদের অনুপস্থিতি ভোগাতে পারে ব্রাজ়িলকে।
যোগ্যতাঅর্জন পর্বের ভয়— বিশ্বকাপের যোগ্যতাঅর্জন পর্বে সবচেয়ে খারাপ সময় গিয়েছে ব্রাজ়িলের। তারা আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, কলম্বিয়ার কাছে হেরেছে। সেই হারের ক্ষত বিশ্বকাপেও থাকতে পারে। যদি গ্রুপ পর্বে মরক্কোর মতো দলের বিরুদ্ধে তারা খারাপ খেলে, তার প্রভাব পড়তে পারে বাকি ম্যাচগুলিতে।