২০১৪ বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য ছিলেন তিনি। রয়েছেন ইউরো ২০১৬ দলেও। কিন্তু ব্রাজিলের সেই টিম আর ফ্রান্সের এ বারের টিমের মধ্যে বিস্তর ফারাক দেখছেন জেরোম বোয়াতেং। বিশেষ করে পোল্যান্ড ম্যাচে নিষ্ফলা ড্রয়ের পরে আক্রমণে এতটাই তফাত চোখে পড়ছে তাঁর যে, টিমমেটদের প্রতি সতর্কবাণী ছুড়ে দিচ্ছেন জার্মান ডিফেন্ডার। বলে দিচ্ছেন, হয় আক্রমণ আরও ধারালো করো। না হলে দেশে ফেরার ব্যাগ গোছাতে শুরু করো!
বৃহস্পতিবার রাতে পোল্যান্ডের সঙ্গে ০-০ ড্র করায় যে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির নকআউট আশা একেবারে শেষ হয়ে গেল, বলা যাবে না। গ্রুপে তাদের শেষ ম্যাচ নর্দার্ন আয়ার্ল্যান্ডের বিরুদ্ধে। যে ম্যাচের ফল পোল্যান্ড-ইউক্রেন ম্যাচের ফলাফলের সঙ্গে এক হলেই জার্মানি শেষ ষোলোয় পৌঁছে যাবে। যদি না তারা শেষ ম্যাচে হেরে যায়।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দারুণ অস্বস্তিকর নয়। কিন্তু তবু সেন্টার-ব্যাক বোয়াতেংয়ের চিন্তা যাচ্ছে না। বরং তিনি বলে দিচ্ছেন, ‘‘ম্যাচটা যে শেষ পর্যন্ত ড্র করতে পেরেছি, তাতে আমাদের খুশি হওয়া উচিত। কারণ আক্রমণে আমরা একটাও ওয়ান অন ওয়ান ডুয়েল জিততে পারিনি। তেমন ভাবে কোনও মুভমেন্টই ছিল না। যা করেছি, সেটা মোটেও যথেষ্ট নয়,’’ বলে বোয়াতেং আরও যোগ করছেন, ‘‘আমাদের গোলে আরও শট নিতেই হবে। ফাইনাল থার্ড পর্যন্ত ঠিকঠাক পৌঁছে যাচ্ছি আমরা। কিন্তু তার পরে যদি আমরা বিপক্ষের রক্ষণ ভাঙতে না পারি, তা হলে আমরা বিপজ্জনক টিম হব কী করে? এই ব্যাপারটা কিন্তু আরও ভাল করতেই হবে। না হলে ইউরোয় বেশি দূর যেতে পারব না।’’
শুধু বোয়াতেং নন। একই কথা মনে হচ্ছে মিডফিল্ডার টনি ক্রুজেরও। যিনি বলে দিচ্ছেন, ‘‘আমাদের মধ্যে একটা কিছুর অভাব ছিল। বলটা নিজেদের কাছে রাখতে পারিনি। রক্ষণে আমরা ভাল করেছি। পোল্যান্ড হয়তো একটা বড় সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু আক্রমণটা আমাদের ঠিকঠাক হচ্ছে না।’’ যার সেরা উদাহরণ সম্ভবত মারিও গটজে। কাপ ফাইনালে গোল করা জার্মান স্ট্রাইকার বৃহস্পতিবার এতই ম্যাড়ম্যাড়ে ছিলেন যে, তাঁকে নিয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় তীব্র নিন্দা শুরু হয়ে গিয়েছে। সাধারণত ফলস নাইন হিসেবে খেলেন গটজে। কিন্তু পোল্যান্ড ম্যাচে তাঁর ‘ফ্লপ শো’ দেখে কোনও কোনও বিশেষজ্ঞ দলে তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছেন। কেউ কেউ আবার আফসোস করছেন যে, এই টিমে যদি একটা মিরোস্লাভ ক্লোজে থাকতেন!
তবে এ সবের মধ্যেও দুই জার্মান তারকা টিমের এই পারফরম্যান্স নিয়ে দুশ্চিন্তায় নেই। তাঁদের একজন ফ্রাঞ্জ বেকেনবাউয়ার। কোচ এবং প্লেয়ার হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ী জার্মানির এই কিংবদন্তি ‘বিল্ড’ পত্রিকায় নিজের কলামে লিখেছেন, ‘গ্রুপের দ্বিতীয় ম্যাচে কেউ নিজেদের পুরোটা নিংড়ে দেয় না। এখনও পুরো ইউরো পড়ে আছে। তার জন্য শক্তি বাঁচিয়ে রাখা দরকার। তা ছাড়া বাকি টিমের সঙ্গে আমাদের টিমের একটা তফাত আছে। আমরা একমাত্র টিম যাদের উন্নতি করার প্রচুর ক্ষমতা আছে।’
অন্য জন, জার্মানির বর্তমান কোচ জোয়াকিম লো। পোল্যান্ডের মিলিক দুটো দারুণ সুযোগ না ফস্কালে, বা রবার্ট লেভানডস্কিকে বারবার জেরোম বোয়াতেং আটকে না দিলে যে তাঁর টিমের ভাগ্যে লজ্জার রাত অপেক্ষা করে থাকতে পারত, মানতে চান না লো। ড্র করে জার্মান কোচ বলেছেন, ‘‘এই পয়েন্টটা নিয়ে আমাদের খুশি থাকতে হবে।’’ সঙ্গে যোগ করেছেন, ‘‘আক্রমণে আমাদের কাছে খুব বেশি সমাধান ছিল না। উইঙ্গাররা প্রচুর দৌড়েছে। তবে আমি সবচেয়ে বেশি সন্তুষ্ট ডিফেন্স নিয়ে। গোটা টিম খুব ভাল খেলেছে। খুব বেশি কাউন্টার-অ্যাটাক করতে দিইনি। যে বিভাগে পোল্যান্ড বেশ শক্তিশালী। দ্বিতীয়ার্ধে ওরা পরিষ্কার একটা সুযোগ পেলেও ওটা বাদ দিলে ম্যানুয়্যাল ন্যয়ারকে আর কোনও শট বাঁচাতে হয়নি।’’
তবে তাঁদের আক্রমণে যে সমস্যা রয়েছে, সেটা মানতেই হয়েছে লো-কে। ‘‘আমরা খুব বেশি সুযোগ তৈরি করতে পারিনি। খেলায় গতির প্রচণ্ড অভাব ছিল। কোনও সময়ই গতিটা বাড়াতে পারিনি। অ্যাটাকে বারবার ছন্দপতন হচ্ছিল, যার মুহূর্তের মধ্যে দশ জন পোলিশ প্লেয়ার বলের পিছনে চলে আসছিল। এই খেলা আমি আশা করিনি। নিজেদের স্বাভাবিক স্টাইলটা ব্যবহারই করা গেল না,’’ আফসোস বিশ্বজয়ী কোচের।
ব্রাজিল বিশ্বকাপের টিমের সঙ্গে এ বারের ইউরোর জার্মানির একটা মিল খুঁজে পাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা— সেন্টার-ফরোয়ার্ড এবং ফুলব্যাকের অভাব। ফিলিপ লামকে পিছনে ঠেলে, ৩৫-এর ক্লোজেকে খেলিয়ে দু’বছর আগে সমস্যার সমাধান করেছিলেন লো। এ বার সেই লামও নেই, সেই ক্লোজেও নেই। যে বিপক্ষ ভাল ডিফেন্ড করতে পারে, তাদের বিরুদ্ধে গোল আসবে কী করে?
বিশ্বকাপে প্রশ্নের উত্তরটা খুঁজতে হয়নি লো-কে। ইউরো প্রথমেই তাঁর হাতে কঠিন প্রশ্নপত্র ধরিয়ে দিল!