ছবি: এপি।
ভারতের ইনিংসের তখনও কয়েক ওভার বাকি।
ক্যামেরা প্যান করে দর্শকের মুখে গেল। এক তরুণীর চোখ থেকে অঝোরে জল পড়ছে, দুটো হাত তখনও প্রার্থনার ভঙ্গিতে তোলা।
শেষ পর্যন্ত হাজার পঁচিশেক মানুষ এই চোখের জল নিয়েই মাঠ ছাড়লেন। কান্নাই সঙ্গী হল আরও একবার। এমন কান্না একেবারে নতুন কিছু নয়। ২০১২-র এশিয়া কাপ ফাইনালে, ২০০৯-এর ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টের ফাইনালে কিংবা এই সেদিন, বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল শেষে এমন কান্নাকে সঙ্গী করতে হয়েছে।
তবে সে সব দিনের সঙ্গে রবিবার রাতের এই কান্নার একটা পার্থক্য চোখে পড়ল আজ সকাল হতেই। এবার কান্নায় আর কোনও ক্ষোভ জড়িয়ে নেই, কোনও গালিগালাজ নেই, এমনকী কোনও শোকও নেই। এবার পুরো বাংলাদেশ জুড়ে একটা ‘কমন সুর’ হল- এই পরাজয় শোক নয়, আমাদের শক্তি।
ফেসবুক বন্ধুদের কথাবার্তা থেকেই এই সুরটা অনুমান করা যাচ্ছিল। সকালে বাংলাদেশের জাতীয় দলের প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদকে ফোন করতেই তা আরও স্পষ্ট টের পাওয়া গেল। একটু ম্লান কণ্ঠে তিনি বলছিলেন, “দেখুন, জিতে গেলে তো ভালই লাগত। আমরা তেমন ব্যাটিং করেছিলাম বলেই আমার মনে হয়। শেষ পর্যন্ত জিততে পারিনি। আমাদের প্র্যাকটিক্যাল হতে হবে। ভারত অনেক শক্তিশালী দল। তাদের কাছে এই হারটা নিয়ে শোক করার কিছু নেই। আমরা বরং টি-টোয়েন্টিতে নিজেদের একটা শক্তি বলে প্রমাণ করতে পেরেছি। এক দিন পরই আমাদের বিশ্বকাপ। আমি মনে করি, এই টুর্নামেন্টে ফাইনালে ওঠার ভেতর দিয়ে যে অর্জন হল, শেষের হারের কথা না ভেবে, সেটাকেই আমরা শক্তিতে পরিণত করতে পারি।”
এই ‘শোক নয়, শক্তি’ স্লোগান নিয়ে সোমবার সকালে বাংলাদেশ দল ভারতের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। দিল্লি থেকে ভাড়া করা বিমানে দুপুরের পর মাশরাফিরা পৌছাবেন ধর্মশালায়। সেখানে বাংলাদেশ খেলবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ভেতর থেকে পাওয়া স্বাধীনতার পর এই ১৬ কোটি মানুষের দেশ আর কখনও কোনও বিষয় নিয়ে এক হতে পারেনি। রাজনীতি, সংস্কৃতি থেকে শুরু করে সাহিত্য-সঙ্গীতেও হাজার রকম মত, হাজার রকম পথ। সেখানে গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে এক ও অদ্বিতীয় শক্তি হয়ে উঠেছে ক্রিকেট। যাকে কেন্দ্র করে সত্যিই এক হতে পারে বাংলাদেশ।
সেই ক্রিকেটে একটা টুর্নামেন্টের ফাইনালে, তাও আবার এশিয়া কাপের ফাইনালে আরেকটা হারের শোকটা অনেক তীব্রও হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চায়ের দোকান, ফুটপাত থেকে শুরু করে ফেসবুক— সব জায়গায় এ বার শোকটা অনেকটাই উবে গিয়েছে। জায়গা নিয়েছে একটা প্রতিজ্ঞা ও তৃপ্তি।
আগের রাতে ম্যাচ হারের পরই মাশরাফি ড্রেসিংরুমের সামনে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, তাঁরা এই ফাইনালে ওঠাটাকে কিভাবে কাজে লাগাতে চান। তার কাছে এটা অনেক বড় আত্মবিশ্বাস ফেরানোর একটা উপলক্ষ। আরও বলেন, “ফাইনালে হারটা আমাদের একটা কষ্ট তো দিয়েছেই। মানুষের জন্য ট্রফিটা জেতা দরকার ছিল। কিন্তু জিততে না পারায় সব শেষ হয়ে গেছে এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। আমরা এখান থেকে অনেক কিছু পেলাম। সাব্বির, রিয়াদ, তাসকিন, আল আমিনদের নিয়মিত পারফরম্যান্স পাওয়া গেল। সবচেয়ে বড় কথা, টি-টোয়েন্টিটা আমরা শিখে ফেলেছি বলে মনে হচ্ছে।”
গত প্রায় বছর দেড়েক ধরে বাংলাদেশ দল ওয়ানডেতে যেমন দুরন্ত ক্রিকেট খেলছে, তেমনেই বাজে কাটছিল টি-টোয়েন্টিটা। জিম্বাবোয়ের বিপক্ষেও তিনটে ম্যাচ হারতে হয়েছে এই সময়ে। বারবারই কোচ-ক্যাপ্টেন বলছিলেন, তাঁরা আসলে এই টি-টোয়েন্টির মানসিকতাটা শিখে উঠতে পারেননি।
ফারুক একগাল হেসে সেই কথাটাই বড় করে বলছিলেন আজ, “আমরা এই এশিয়া কাপ শুরুর আগে কে কল্পনা করেছিল যে, ফাইনাল খেলব! আমরা নিজেরাই তো ভাবতে পারছিলাম না যে, এই ফরম্যাটে আমরা লড়াইটা দিতে পারব। সেখানে দু’টো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দলকে বের করে দিয়ে ফাইনালে উঠেছি আমরা। এর চেয়ে বড় শক্তি কী হতে পারে বলুন।”
একটু এক ফাঁকে বাংলাদেশি কোনও একটা ক্রিকেট সমর্থকদের ফেসবুক গ্রুপে ঢুঁ মেরে এলে বাস্তবটা বুঝতে পারবেন।
এক বছর আগেও বাংলাদেশের কোনও পরাজয় মানেই শাপশাপান্তই ছিল ফেসবুকের মূল সুর। কখনও নিজেদের খেলোয়াড়দের বলি বানানো, কখনো প্রতিপক্ষের দোষ ধরা। আজ সকাল থেকে এই ব্যাপারটাই সবচেয়ে বেশি বদলে গিয়েছে মনে হল।
শত শত মেসেজ আসছে, যেখানে লেখা-ওয়েল ডান।
রীতিমতো ইভেন্ট বানিয়ে ছেলেদের পরাজয়ে সমবেদনা জানাচ্ছেন লোকে। সেই সাথে পরিষ্কার বলে দিচ্ছেন, আমরা পাশে আছি।
বাংলাদেশের ধারাবাহিক ভাবে এই জিততে শেখার সবচেয়ে বড় অর্জন বোধহয় এটাই— দর্শকদেরও একটু পরিণত হয়ে ওঠা।
আরও পড়ুন...