অ্যাডিলেডের আকাশও যখন গেরুয়া। রবিবার।
আরে ভাই এ তো আজব ছেলে!
এত দিন বিদেশের মাঠে কোন ক্রিকেটারের কতটা আধিপত্য, এ জাতীয় লেখা থাকলেই সাংবাদিকরা আমার আর লর্ডসের রেফারেন্স টেনে লেখা শুরু করতেন।
কিন্তু আজকের পর তো এ সব বদলে যাবে দেখছি। বদলাতেই হবে। উপায় নেই।
এ বার থেকে বিদেশের কোন মাঠে কোন প্লেয়ারের মাস্তানি সবচেয়ে বেশি বললেই লোকে বিরাট আর অ্যাডিলেড ওভালের কথা বলবে। সত্যি স্বীকার করছি, আমার অসম্ভব গর্ব হচ্ছে আজ বিরাটের পারফরম্যান্স দেখে। অস্ট্রেলিয়ার ও রকম একটা ঐতিহাসিক মাঠ, সেটাকে তো দিল্লির পশ্চিম বিহারের কোনও প্র্যাকটিস মাঠের পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে ফেলেছে বিরাট। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে টেস্ট ম্যাচে দুটো আর এ দিন পাকিস্তানের সঙ্গে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই সেঞ্চুরি। এটা একটা অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স।
এর পর ওর বিষয়ে একটাই কথা বলতে ইচ্ছে করছে যা মুম্বইয়ের ময়দানে আমরা প্রায়ই বলে থাকি। ইয়ে কড়ক বান্দা হ্যায়!
আর শুধু বিরাট নয়, আজকের পর দেখবেন টিম ইন্ডিয়াও কিন্তু কড়ক হয়ে গিয়েছে। আমি এখনও ফেভারিট বলব না, কিন্তু সেমিফাইনাল দেখতে পাচ্ছি এটা আজই বলে দিতে পারি। হঠাত্ করে আজকের পর এই টিমটাই কিন্তু ছন্দে এসে গেল। জোশ এসে গেল বডি ল্যাঙ্গোয়েজে। শেষের দিকে ইন্ডিয়ার শরীরী ভাষায় আগ্রাসনটা কিন্তু আমার চোখ এড়ায়নি। এবং মনে রাখবেন, এ দিন অন্য ম্যাচে জিম্বাবোয়েকে একেবারে দুরমুশ করতে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকা। পরের রবিবারও ধোনিরা জিতে গেলে আমি অন্তত আশ্চর্য হব না।
সকলেই জানেন, ধোনির ক্যাপ্টেন হওয়ার পেছনে একটু হলেও আমার হাত ছিল। সেই সময় আমি ছিলাম সিলেকশন কমিটির চেয়ারম্যান। যে দিন পুরো ভারত ধোনির ক্যাপ্টেন্সির প্রশংসা করে, সে দিন মুম্বইয়ের ফ্ল্যাটে বসে কোথাও আমি অসম্ভব খুশি হই। অদ্ভুত তৃপ্তি হয়। আমি কিন্তু যখন ধোনিকে ইন্ডিয়া ক্যাপ্টেন করেছিলাম, সেই সময় ঝাড়খণ্ড টিমেরও ক্যাপ্টেন ছিল না এমএসডি। সেখান থেকে আজকের দিনটা দেখলে বোঝা যায়, কেন ওকে ক্রিকেটবিশ্বের সেরা ক্যাপ্টেন বলা হয়। কী ক্যাপ্টেন্সিটাই না করল আজ এমএসডি! একটা বোলিং চেঞ্জও ভুল ছিল না, প্রতিটা ফিল্ডিং সাজানো নিখুঁত ছিল।
এই জয়ের পর পরের ম্যাচটা এক সপ্তাহ পরে কেন, এটা নিয়ে দেখলাম অনেকেই কথা বলছে। তাদের বক্তব্য, বড্ড বেশি গ্যাপ লাগছে দুটো ম্যাচের মধ্যে। এতে নাকি মোমেন্টাম চলে যেতে পারে। দায়িত্ব নিয়ে বলছি, একেবারে বাজে কথা বলছে ওরা। ওরা কি জানে না, পঁচাশিতে বেনসন অ্যান্ড হেজেস টুর্নামেন্টে প্রত্যেকটা ম্যাচের পর আমরা চার-পাঁচ দিনের গ্যাপ পেতাম? বিশ্বাস করুন, অস্ট্রেলিয়ার অত বড় বড় মাঠে একটা ওয়ান ডে ম্যাচে শরীরের উপর প্রচুর ধকল যায়। এবং এটাও মনে রাখবেন, এই টিমটা নভেম্বরের শেষ থেকে অস্ট্রেলিয়াতেই রয়েছে।
এই গ্যাপগুলো প্রচুর সাহায্য করবে ভারতকে এই টুর্নামেন্টে। এই বিশ্রামটা দরকার। এতে ওদের মন আর শরীর দুটোই তাজা থাকবে। আমি টিমের কর্তা হলে টিমকে বলতাম, দু’দিন শুধু রিল্যাক্স করো। আমি শিওর, রবি যখন আছে তখন আজ দুর্দান্ত পার্টি করবে ছেলেরা। সেটাই করা দরকার।
এই বিশ্রামটা এ রকম একটা হাই টেনশন ম্যাচের পর অবশ্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ। তার পর দু’দিন টিমের উচিত হালকা জিম করা, সাঁতার কাটা, ঘুমনো আর টিভিতে আজকের ম্যাচের হাইলাইটস দেখা। ব্যাট-বল হাতে তুলুক আবার বুধবার। এখানে আর একটা কথা আপনাদের জানিয়ে রাখি। এটা আমার মনের গোপন কথা, যা আপনাদের না বলে পারছি না।
পঁচাশির বেনসন অ্যান্ড হেজেস টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে কিন্তু আমরা পাকিস্তানকেই হারিয়েছিলাম। কী করব বলুন, ক্রিকেটার তো, সংস্কার থাকবেই।
আর আজ জেতার পর থেকেই সেই দিনটার কথা খালি মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে এ বারও সেই অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম ম্যাচে হারালাম পাকিস্তানকে। সে বারের মতো এ বারও ফাইনাল সেই মেলবোর্নেই।
কে জানে!!! মন কিন্তু স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।
... দেখুন ভাই রেকর্ডটা কোনও না কোনও দিন ভাঙবেই। টানা সারা জীবন তো আর পাকিস্তানকে বিশ্বকাপে হারিয়ে যাওয়া যাবে না। বা এমন নয় যে পৃথিবীতে যত দিন জীবন থাকবে তত দিন পাকিস্তান বিশ্বকাপে হারাতে পারবে না ভারতকে। আর একটা কথা বলি দু’দেশের সামগ্রিক ওয়ান ডে রেকর্ড যদি দেখেন, পাকিস্তান অনেক বেশি জিতেছে। ওয়ান ডে রেকর্ডে আমাদের চেয়ে ওরা অনেক ভাল। শুধু বিশ্বকাপে পারছে না। আমার মনে হয় একটা বড় কারণ হল ওদের সেই সোনার টিম আর নেই। বিশেষ করে ভাল অলরাউন্ডার নেই আব্দুর রজ্জাকের মতো। তাই আমি ৬-০ নিয়ে উচ্ছ্বাসে ভেসে যেতে চাই না।
মহেন্দ্র সিংহ ধোনি
... আমি জানি না এই ০-৬ রেকর্ডটা কী ভাবে ব্যাখ্যা করব? আমার কাছে কোনও উত্তর নেই। এটুকু বলতে পারি, ভারত খুব পেশাদারি ক্রিকেট খেলেছে। ধবন আর কোহলি যে ভাবে ব্যাট করেছে সেটা দারুণ প্রশংসনীয়। একেই বলে পেশাদারিত্ব। আমরা সেটা পারিনি। আমাদের ব্যাটসম্যানদের বিরাটদের থেকে শিক্ষা নিতে হবে যে ছাড়লে চলবে না। এই উইকেটে ৩০১ করে যেটা উচিত ছিল। কিন্তু এর বেশি এখন যদি ভারত-পাক রেকর্ড নিয়ে ভাবতে বসি, সামনে এগোতে পারব না। এখনও টুর্নামেন্টের অনেক বাকি।
মিসবা-উল-হক
আমার বাড়ির সামনে কিছু সমর্থক জড়ো হয়ে উত্সব করছে... উফ! যদি ওদের সঙ্গে আমিও যোগ দিতে পারতাম!
সচিন তেন্ডুলকর